একটি কাচের টুকরোর ওপর এক ফোঁটা পানি আছে। এর দৈর্ঘ্য এক ইঞ্চির চার ভাগের এক ভাগের মতো। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এই পানির ফোঁটাকে দুই হাজার গুণ বড় করে দেখব আমরা। এখন পানির ফোঁটাটি হয়ে যাবে ৪০ ফুট চওড়া। একটা বড়সড় ঘরের সমান। এই ৪০ ফুট চওড়া পানির ফোঁটাকে এখন কাছ থেকে বেশ মসৃণ দেখাবে। একটু লক্ষ করলেই দেখব, পানির ওপর প্রায় ফুটবলের সমান কিছু সাঁতরে বেড়াচ্ছে (শিরোনাম ছবি)। এগুলো হলো প্যারামেসিয়া (Paramecia)। প্যারামেসিয়া একধরনের এককোষী অণুজীব।
আমরা পানিকে এবার আরও দুই হাজার গুণ বিবর্ধিত করব। এতে পানির ফোঁটার দৈর্ঘ্য হবে ১৫ মাইল। এবার কিন্তু পানিকে আর আগের মতো মসৃণ লাগবে না। পৃষ্ঠের দিকে তাকালে মনে হবে যেন দূরে কোনো স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়া লাখ লাখ মানুষের ভিড়। এবার এই ভিড়কে আরও স্পষ্ট করে দেখার জন্য আমরা আরও ২৫০ গুণ বড় করব। এবার আমরা নিচের ছবির মতো কিছু একটা দেখতে পাব। এই ছবিতে পানিকে ১০০ কোটি গুণ বড় করে দেখানো হয়েছে। এখানে বড় কালো বৃত্তগুলো হলো অক্সিজেন পরমাণু আর সাদা ছোট বৃত্তগুলো হাইড্রোজেন পরমাণু।
এই ছবিতে বেশ কিছু কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এখানে পরমাণুদের দেখানো হয়েছে স্পষ্ট প্রান্তযুক্ত। বাস্তবে পরমাণুদের এমন কোনো প্রান্ত নেই। আঁকার সুবিধার জন্য ছবিটিকে দ্বিমাত্রিকভাবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই কণিকাগুলো ত্রিমাত্রিক পরিসরে ছোটাছুটি করে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি অক্সিজেন পরমাণুর সঙ্গে দুটি করে হাইড্রোজেন পরমাণু জোড়া লেগে আছে। পরমাণুদের এমন ছোট ছোট গ্রুপকে আমরা অণু বলি।
এই ক্ষুদ্র কণিকাগুলো সব সময় ছোটাছুটি, লাফালাফি এবং একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে। তাই ছবিটিকে স্থির মনে না করে গতিশীল বা চলন্ত কল্পনা করুন। আরও একটি জিনিস এখানে ছবি এঁকে বোঝানো সম্ভব নয়, সেটি হলো এই ক্ষুদ্র কণিকাগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে শক্ত হয়ে লেগে থাকে। অর্থাত্ এরা একে অন্যকে আকর্ষণ করে। তাই দেখে মনে হয়, এরা যেন আঠার মতো লেগে আছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমরা যদি এই অণুগুলোকে চেপে ধরি, তাহলে এরা খুব বেশি কাছাকাছি আসতে চাইবে না। বেশি কাছে নিয়ে গেলে এরা একে অন্যকে বিকর্ষণ করবে।
পরমাণুগুলোর ব্যাসার্ধ ১ সেন্টিমিটারের ১০ কোটি ভাগের ১ ভাগের সমান। এই দৈর্ঘ্যকে বলে ১ Å (angstrom) বলা হয়। পরমাণুর আকার মনে রাখার জন্য আরও সহজ একটি উপায় আছে। আমরা যদি মাঝারি আকারের কোনো আপেলকে আমাদের পৃথিবীর সমান বড় করি, তবে আপেলের মধ্যে থাকা প্রতিটি পরমাণুর আকার হবে আসল আপেলটির সমান।
আমরা দেখেছিলাম, পানির অণুগুলো সব সময়ই ছোটাছুটি করে। এই ছোটাছুটিকে আমরা বলি তাপ। তাপ হলো কোনো পদার্থের অণুদের মোট শক্তির একটি গড় মান। যদি কোনো পদার্থের অণুগুলো খুব দ্রুত ছোটাছুটি করে, তাহলে বুঝতে হবে যে ওই পদার্থের তাপমাত্রা বেশি। তাই তাপ বাড়ানো হলে অণুদের ছোটাছুটি বেড়ে যায়। আমরা যখন পানিকে উত্তপ্ত করি, তখন পানির অণুদের ছোটাছুটির পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে অণুদের মধ্যকার ফাঁকা স্থানের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ জন্যই তাপ দিলে পানির আয়তন বাড়ে। আমরা যদি পানিকে আরও অনেক উত্তপ্ত করি, তাহলে অণুদের গতিশক্তি এতটাই বেড়ে যাবে যে অণুগুলোর আকর্ষণশক্তি আর অণুগুলোকে একত্রে ধরে রাখতে পারবে না। ফলে পানি বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করবে। ২ নম্বর ছবিতে বাষ্প দেখানো হয়েছে।
আগের ছবিতে পানির অণুগুলোকে পাশাপাশি জোড়া লাগা অবস্থায় দেখানো হয়েছিল। ওটা ছিল তরল পানির ছবি। এই ছবিতে জলীয় বাষ্প দেখানো হয়েছে। কিন্তু আগের ছবির মতো এই ছবিতেও বেশ কিছু জিনিস ভুল আছে। কারণ, সাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপে এটুকু জায়গার মধ্যে কোনো পানির অণু থাকার কথা নয়। কিন্তু ছবিতে আড়াইটি অণু দেখানো হয়েছে। আঁকার সুবিধার জন্য হাইড্রোজেন পরমাণুর মধ্যকার কোণকে এখানে ১২০ ডিগ্রি দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই কোণ ১০৫০৩'। আর হাইড্রোজেন পরমাণুর থেকে অক্সিজেন পরমাণুর কেন্দ্র পর্যন্ত দূরত্ব ০.৯৫৭ Å।
জলীয় বাষ্প আসলে একরকম গ্যাস। গ্যাসের অণুগুলো আলাদা। আর তারা অবিরাম ছোটাছুটি করে। ফলে আমরা যে পাত্রে কোনো গ্যাস রাখব, তারা সেই পাত্রের দেয়ালে ধাক্কা মারতে থাকবে। এভাবে প্রতি মুহূর্তে ধাক্কা খাওয়ার ফলে দেয়ালে ঠেলা দেওয়ার মতো একটি বল সৃষ্টি করে। এই ঠেলা দেওয়া বলকে আমরা গ্যাসের চাপ বলি। এবার আমরা যদি গ্যাসীয় পদার্থকে উল্টো চাপ প্রয়োগ করি, তবে এই গ্যাসের অণুদের মধ্যকার দূরত্ব কমে যাবে। আমরা যত বেশি চাপ দেব, গ্যাস তত কম জায়গার মধ্যে এঁটে থাকবে। অর্থাত্ চাপ প্রয়োগ করলে গ্যাসের আয়তন কমতে থাকবে।
এবার আমরা পানির তাপমাত্রা কমাতে থাকব। ফলে অণুদের গতিশক্তি কমতে থাকবে। অর্থাত্ অণুগুলো আগের তুলনায় কম ছোটাছুটি করবে। কিন্তু তাপমাত্রা আরও কমানো হলে অণুগুলো আর ছোটাছুটি করতে পারবে না। শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রায় পানির অণুদের কী অবস্থা হয় সেটা নিচের চিত্রে দেখানো হয়েছে। এ সময় পানির অণুগুলো একটা ছাঁচের মধ্যে আটকে পড়ে যায়। এই অবস্থাকে আমরা বলি ‘বরফ’। বরফের এই চিত্রও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ, এখানে অণুগুলোকে দ্বিমাত্রিক হিসেবে আঁকা হয়েছে। কিন্তু গুণগতভাবে এটা ঠিকই আছে। এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তরল পানির অণুগুলো চলাচল করত। কিন্তু এখানে পানির প্রতিটি অণু একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে আটকে আছে। ফলে সব অণু মিলে একটি দৃঢ় কাঠামো তৈরি করেছে। আমরা যদি বরফের কোনো এক প্রান্তের কিছু অণুকে টানাটানি করতে থাকি, তাহলে অন্য প্রান্তের অণুগুলো আমাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। ফলে পানি একটি নির্দিষ্ট আকার নিয়ে থাকবে। কিন্তু তরল পানির ক্ষেত্রে যদি আমার এভাবে টানাটানি করি, তাহলে অণুদের এলোমেলো ছোটাছুটির কারণে কাঠামো সহজেই ভেঙে যাবে। ফলে আমরা পানির ভেতরে ইচ্ছা করলেই আমাদের হাত ঢুকিয়ে দিতে পারব। এ জন্যই পানি হলো তরল, আর বরফ কঠিন।
কঠিন ও তরল এই দুই অবস্থার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো কঠিন অবস্থায় অণুগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে। একে ক্রিস্টালাইন অ্যারে (Crystalline Array) বলা হয়। ৪ নম্বর ছবিতে বরফের অণুদের বিন্যাস সঠিকভাবে দেখানো হয়নি। সঠিকভাবে দেখানো হলে ছবিটিকে প্রতিবার ৬০ ডিগ্রি ঘোরালে ছবিটি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। অর্থাত্ সঠিকভাবে ত্রিমাত্রিক চিত্র আঁকলে অণুগুলো সুষম ষড়ভুজাকার বিন্যাস তৈরি করবে (৪ নম্বর ছবির মতো) বরফের এই ষড়ভুজাকার বিন্যাসের জন্যই তুষারকণার সব সময় সুন্দর ছয়পার্শ্বযুক্ত নকশা সৃষ্টি করে।
পানির অণুগুলো যখন বিন্যস্ত হয়ে বরফ তৈরি করে, তখন অণুগুলোর মধ্যে অনেক ফাঁক থাকে। তাই পানি বরফ হয়ে গেলে তার আয়তন বেড়ে যায়। আর আয়তন বেড়ে গেলে কমে যায় ঘনত্ব (এ জন্যই বরফ পানিতে ভাসে)। এই বরফ যখন গলে যায়, তখন এই ফাঁকের ভেতর অনেক অণু ঢুকে যেতে পারে। ফলে আয়তন আবার কমে আসে।
৪ নম্বর ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে, পানির (বরফ) কাঠামো ফাঁপা। কিন্তু অন্যান্য পদার্থের ক্ষেত্রে কিন্তু এমন হয় না। কঠিন অবস্থায় সাধারণত পদার্থের অণুগুলো আঁটসাঁটভাবে অবস্থান করে। আর তাপ পেয়ে গলে গেলে চলাচল করতে থাকে অণুগুলো। ফলে আরও বেশি জায়গা দরকার হয়। তাই অন্যান্য পদার্থের ক্ষেত্রে কঠিন থেকে তরল হলে আয়তন বৃদ্ধি পায়।
মজার বিষয় হলো, কঠিন পদার্থের অণুগুলো দৃঢ় কাঠামোতে সাজানো থাকলেও সেগুলো কিন্তু স্থির নয়। তারা তাদের অবস্থান ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু নিজের অবস্থানে থেকেও তারা প্রতিনিয়ত কাঁপতে থাকে। আর কাঁপতে থাকার মানেই হলো তাদের তাপ আছে। আমরা চাইলেই কোনো কঠিন পদার্থের তাপ বাড়াতে বা কমাতে পারি। পরম শূন্য তাপমাত্রায় পরমাণুদের এই কম্পন সর্বনিম্ন হয়। কিন্তু কখনোই এই কম্পন একদম থেমে যায় না।
লেখক: ফার্মাসিস্ট
সূত্র: রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘ফাইনম্যান লেকচার অন’ অবলম্বনে
*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তা জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত