বহুবাহক জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা

২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকবে। ওই দিন জ্যোতিঃপদার্থবিদেরা একটি উত্স থেকে প্রায় একই সময়ে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেন। ঘটনাটি আগস্ট মাসে ঘটলেও বিজ্ঞানীরা প্রায় দুই মাস সময় নেন এটিকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য। ১৭ই আগস্ট তাঁরা LIGO যন্ত্র দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ অবলোকনের ২ সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত ফের্মি দূরবিন গামা রশ্মি বিস্ফোরণ আবিষ্কার করে। লাইগো ও ফার্মির যৌথ পর্যবেক্ষণ এই উত্সটির অবস্থান খুব সূক্ষ্মভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি। তবে দৃশ্যমান তরঙ্গে সেটাকে খোঁজার জন্য আকাশের একটা এলাকা বেঁধে দেয়। সেই এলাকাটা ছিল পূর্ণচন্দ্রের আয়তন ক্ষেত্রের ১৫০ গুণ বড়। ১০ ঘণ্টার মধ্যে চিলিতে বসানো কার্নেগি মানমন্দিরের ১ মিটার দুরবিনের চিত্রে এই উত্সটি ধরা পড়ে। দেখা যায়, এ ঘটনাটি ঘটেছে আমাদের মোটামুটি কাছাকাছি, ১৩০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, একটি সাধারণ উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিতে, যার নাম NGC 4993।

বিভিন্ন বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ আবিষ্কার

পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ও কয়েক দিন ধরে ঐ উত্স থেকে দৃশ্যমান, অবলোহিত, এক্স-রশ্মি ও বেতার তরঙ্গও নিরূপিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের একে অপরের চতুর্দিকে ঘুরতে ঘুরতে একসময় এদের সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষ থেকে এরা একীভূত হয় এবং সে প্রক্রিয়া থেকে এই মহাকর্ষীয় ও বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গের জন্ম। এই ধরনের ঘটনাকে কিলোনোভা নাম দেওয়া হয়েছে। ১ নম্বর ছবিতে দৃশ্যমান তরঙ্গে তোলা ওই সংঘর্ষের অবস্থানটি লাল তির দিয়ে দেখানো হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে ESO-এর একটি দুরবিন থেকে ছবিটি তোলা। কয়েক দিনের মধ্যেই ওই তারাটি মিলিয়ে গেলেও এর সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা ছিল সূর্যের চেয়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি গুণ বেশি।

ভারী মৌলিক পদার্থের সংশ্লেষণ

দৃশ্যমান তরঙ্গে তারাটি দেখা দিয়েছিল প্রথমে নীল আলোতে, ধীরে ধীরে সেটা লাল হলো। বিস্ফোরণের পর যখন দৃশ্যমান আলো ধুলায় আবরিত হয়ে যায়, তখন অবলোহিত তরঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের সংঘর্ষে r-বা rapid প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হতে পারে। নিউট্রন নক্ষত্রের উপরিভাগে লোহাজাতীয় ভারী মৌলিক পদার্থ থাকে। যদি সেগুলোর নিউক্লিয়াসে দ্রুত নিউট্রন সংযুক্ত করা যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে বেটা (বা ইলেকট্রন) অবক্ষয়ের মাধ্যমে আরও ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি করা সম্ভব। অবলোহিত তরঙ্গের বর্ণালি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই সংঘর্ষে সোনা, প্লাটিনাম, নিওডিমিয়াম, ইউরেনিয়ামের মতো মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের হিসাবে এই ঘটনায় যে পরিমাণ ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি পৃথিবীর ভরের তুলনায় প্রায় ১৬ হাজার গুণ বেশি। শুধু সোনা ও প্লাটিনামের ভরই নাকি পৃথিবীর ভর থেকে ১০ গুণ বেশি।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ওই নিউট্রন নক্ষত্র দুটির সৃষ্টি যখন হয়েছে, তখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র ২ বিলিয়ন বছর। নিউট্রন নক্ষত্রের উপরিভাগের যে লোহা, তা হয়তো সৃষ্টি হয়েছিল ওই সুপারনোভা বিস্ফোরণে। এর ১২ বিলিয়ন বছর পর তারা সৃষ্টি করল পর্যায় সারণির অবশিষ্ট ভারী পদার্থগুলো।

কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ? আমার মতে, যুগপৎ পর্যবেক্ষণের ফলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কার সম্পর্কে যে ন্যূনতম সংশয় ছিল, তা দূর হয়ে গেল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের লাইগো ও ইউরোপীয় VIRGO যন্ত্রের সাহায্যে চারবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মডেল অনুযায়ী সেগুলোর সব কটিই ছিল দুটি বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের ফল। এই কৃষ্ণগহ্বরগুলো সূর্যের ভর থেকে ২০, ৩০ কি ৪০ গুণ বেশি হতে পারে। তাদের সংঘর্ষের স্থান থেকে আমাদের কাছে সেই তরঙ্গের পৌঁছাতে কয়েক শ কোটি বছর লেগেছে। অর্থাৎ যে গ্যালাক্সিগুলোতে ওই ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো আমাদের থেকে অনেক দূরে। যেহেতু কৃষ্ণগহ্বরগুলো নিতান্তই স্থানকালের বক্রতা, সেহেতু সেগুলোর সংঘর্ষ থেকে আমরা কোনো যুগপত্ বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ আশা করি না। কারণ, সে জন্য বস্তুর উপস্থিতি দরকার। তাই ওই চারবার কোনো গামা রশ্মির বিস্ফোরণ দেখা যায়নি। এখানে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার আলোকে মহাকর্ষ তরঙ্গ সম্পর্কে দু-একটা কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

স্থানকাল (বা দেশকাল) কী দিয়ে তৈরি?

সেটা আমরা ঠিক জানি না। তবে এটুকু বলা যায়, এটা এমন কিছু নয়, যা ধরাছোঁয়া যায়। অনেকে মনে করেন, আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে মাধ্যাকর্ষণের ক্ষেত্রকে স্থানকালের জ্যামিতির সমান বলে গণ্য করেছেন। বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ বা আলো এই স্থানকালে নিমজ্জিত এবং ভরের সাহায্যে নির্ধারিত স্থানকালের বক্রতাকে অনুসরণ করে ভ্রমণ করে। অন্যদিকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে স্থানকালের চাদরটিরই ওঠানামা বলে ধরা যায়। একটি ত্বরিণশীল আধানযুক্ত (চার্জযুক্ত) তড়িত্ কণা যেমন বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ (আলো) বিকিরণ করে, প্রায় একইভাবে একটি ভরের অসম গতি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুত্চুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে চারপাশের বস্তুগুলো দেখি। এই বিকিরণ ইলেকট্রনের মাধ্যমে বস্তুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে সেই বস্তু আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয়। কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বস্তু বা ভরের সঙ্গে খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, তাই সেই তরঙ্গ দেখতে পাওয়া দুরূহ।

রৈখিক তরঙ্গ সমীকরণ

প্রায় এক শ বছর আগে আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তাঁর এই মহাকর্ষ তত্ত্ব বেশ কয়েকটি অরৈখিক (Nonlinear) সমীকরণের সমষ্টি, যেগুলোর সমাধান করা বেশ কঠিন। তত্ত্বটি অরৈখিক। অর্থাত্ সমীকরণগুলোর দুটি আলাদা সমাধানের সাধারণ যোগফল বা উপরিপাত (Superposition) সমীকরণের সমাধান দেবে না। প্রকৃতিতে এর অর্থ হলো দুটি বস্তুর সম্মিলিত মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তাদের আলাদা ক্ষেত্রের সাধারণ যোগফল নয়। তাই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সমীকরণ থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সমাধান বের করা বেশ কঠিন। তবে দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের জন্য আইনস্টাইনের সমীকরণগুলোর সরলীকরণ করে বা রৈখিক করে তরঙ্গ সমীকরণে রূপান্তর করা যায়। তারই সমাধান হলো এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গ বক্র স্থানকালে আলোর গতিতে ভ্রমণ করে। যেহেতু মহাবিশ্বের বস্তুসমূহ এই স্থানকালের চাদরের ওপর অবস্থিত, তাই স্থানকালের তরঙ্গে দুটি বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব পর্যায়ান্বিতভাবে বাড়ে ও কমে। এ তরঙ্গ সমাধানের আবার দুটি সমবর্তন (Polarization) দশা আছে-‘প্লাস’ ও ‘ক্রস’। পরের পৃষ্ঠার ২ নং ছবিতে সেটা দেখানো হলো।

তরঙ্গের বিস্তার ছোট

ওপরে আমি স্থানের যে সংকোচন ও বিস্তৃতির কথা লিখেছি, সেটার পরিমাণ বা বিস্তার (Amplitude) খুবই কম। এই বিস্তারের মান ১০-১৮ মিটার, একটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস, এমনকি প্রোটনের ব্যাসের চেয়েও ছোট। এই ধরনের অসম্ভব ছোট স্থানকালের বিস্তার
নিরূপণ করতে গেলে সব ধরনের যান্ত্রিক কোলাহলকে মূল্যায়ন করতে হবে এবং মূল সংকেত থেকে তা বাদ দিতে হবে। আমরা এটাকে প্রেক্ষাপটের কোলাহল বলব। ইংরেজিতে Background noise বলা হয়। কী ধরনের কোলাহল? এর মধ্যে রয়েছেক. কোয়ান্টাম কোলাহল, যেমন স্থানকালের বিস্তার মাপতে যে আলোর ব্যতিচার ব্যবহার করতে হয়, সেই আলোক ফোটনের সময় নিরূপণের ও আয়নাতে ফোটনের কতখানি ভরবেগ স্থানান্তরিত হচ্ছে, সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। খ. আয়নার ওপরের আবরণ (Coating) ও বিভিন্ন যন্ত্রকে ঝুলিয়ে রাখার জন্য ক্যাবল (তার) থেকে তাপীয় বিকিরণ (যেকোনো বস্তুই বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে, এই বিকিরণের পরিমাণ সে বস্তুর তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে)। গ. ভূগর্ভের মাটির ঘনত্ব পরিবর্তনের কারণে ও বহু দূরে চলন্ত গাড়ির প্রভাবে মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রের হেরফের। ঘ. বায়ুচাপের পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের থেকে আলফা সেন্টরাইয়ের যে দূরত্ব, ওইটুকু দূরত্বে এই স্থান বদলেছে মাত্র একটি চুলের প্রস্থের সমান।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গঠন নির্ধারণ: দুটি কৃষ্ণবিবর বা দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের পারস্পরিক পরিক্রমা ও পরবর্তী সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গঠন ঠিক কী হবে, সেটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে গত ২০ বছর। আগেই বলেছি, কোনো বস্তুর অসমান চলন থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উত্পত্তি হতে পারে। দুটি খুব ভারী বস্তু যখন একে অপরের চারদিকে ঘুরতে থাকে, তখন এই চলনকে অসম বলা যেতে পারে। ভারী বস্তু দুটি যখন একে অপর থেকে দূরে থাকে, তখন তাদের থেকে বিকিরিত তরঙ্গকে ওপরে বর্ণিত আইনস্টাইন সমীকরণের রৈখিক সমাধানের মাধ্যমে মডেল করা চলে। কিন্তু সেই বস্তু দুটি যখন খুব কাছাকাছি আসে ও যখন তাদের সংঘর্ষ হয়, তখন সেই তরঙ্গকে মডেল করতে হলে শুধু রৈখিক সমাধানে কাজ হবে না, তখন সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া কম্পিউটারে নম্বর দিয়ে গণনা করতে হবে। শুধু ২০০৫ সালের পরই বিজ্ঞানীরা এই দুরূহ গণনাকে আয়ত্ত করতে পারেন।

৩ নম্বর ছবিতে এ বছরের ১৪ আগস্ট বিজ্ঞানীরা দুটি কৃষ্ণবিবরের সংঘর্ষ থেকে বিকিরিত যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ দেখেন, তার ফলাফল দেখানো হয়েছে (এটি ১৭ আগস্টের কিলোনোভা ঘটনা থেকে ভিন্ন)। ওই ছবির নিচের প্যানেলে LIGO ও VIRGO যন্ত্রের প্রাপ্ত তরঙ্গের ওপর কম্পিউটারে গণনায় তরঙ্গের গঠনকে একই সঙ্গে দেখানো হয়েছে। ওই গঠন থেকেই কৃষ্ণগহ্বরের ভর, দূরত্ব, তাদের কক্ষপথের বিভিন্ন মান বের করা যায়। মাঝখানের প্যানেলটিতে দেখানো হয়েছে কৃষ্ণগহ্বর দুটি একে অপরকে যখন সেকেন্ডে ৩০ বার থেকে ২৫০ বারের মতো প্রদক্ষিণ করে, শুধু তখনই মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে LIGO ও VIRGO যন্ত্রে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এ রকম কিলোনোভা বিস্ফোরণ কি প্রায়ই হয়? এবার আসি ১৭ আগস্টের কিলোনোভা ঘটনায়, যেখানে দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানতেন যে মহাবিশ্বে অনেক জোড়া নিউট্রন নক্ষত্র আছে। ১৯৭০-এর দশকে তাঁরা আমাদের গ্যালাক্সিতে এ রকম একটি জোড়া নিউট্রন নক্ষত্র (যারা পালসারও বটে) আবিষ্কার করেছিলেন, যে দুটি একে অপরের চারদিকে ঘুরছে এবং ক্রমাগত বিদ্যুত্চুম্বকীয় বিকিরণ ও মহাকর্ষীয় বিকিরণের মাধ্যমে শক্তিক্ষরণ করে একে অপরের কাছে আসছে। মহাকর্ষ তরঙ্গ যে আছে এটা হলো তার পরোক্ষ প্রমাণ, এর জন্য জোড়া তারাটির আবিষ্কারক হালস ও টেইলার নোবেল পুরস্কার পান। তবে এই হালস ও টেইলরের পালসার দুটি একে অপরের থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে ছিল। এটা খুব একটা দূরত্ব নয়, চাঁদ পৃথিবী থেকে তিন লাখ কিলোমিটারের মতো দূরত্বে অবস্থিত। কাজেই এটা চাঁদের দূরত্বের পাঁচ গুণ। তবে এদের সংঘর্ষ আগামী ৩০ কোটি বছরে হবে না। অন্যদিকে কিলোনোভা নিউট্রন নক্ষত্র দুটির মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যখন LIGO দেখতে পায়, সে দুটি একে অপর থেকে মাত্র ৩২০ কিলোমিটার দূরে ছিল এবং এরপর ১০০ সেকেন্ড লাগে তাদের একীভূত হতে। নিরূপণের শুরুতে তারা দুটি একে অপরকে সেকেন্ডে ২৪ বার প্রদক্ষিণ করছিল, সংঘর্ষের আগে সেটি সেকেন্ডে প্রায় ৩০০ বার হয়ে দাঁড়াল (ছবি ৪)। কিলোনোভা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এ আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, আমাদের গ্যালাক্সিতে এ রকম জোড়া নিউট্রন সংঘর্ষ প্রতি ১০ হাজার বছরে একটি হয়।

স্বল্পস্থায়িত্বের গামা বিস্ফোরণ

লাইগো যন্ত্রে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ার ১.৭ সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা ফার্মি দুরবিন একটি স্বল্পস্থায়িত্বের (২ সেকেন্ড) গামা বিস্ফোরণ দেখতে পায়। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন, স্বল্পস্থায়িত্বের গামা বিস্ফোরণ দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়। লাইগো যন্ত্রের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেল যে এই ঘটনাটি ঘটেছে দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে। দুটি পর্যবেক্ষণই মিলে গেল। তবে এত কাছের একটি গ্যালাক্সি থেকে গামা বিস্ফোরণের উজ্জ্বলতা আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, এ রকম সংঘর্ষের পর গামা রশ্মির যে জেট তৈরি হয়, সেটাকে আমরা যদি মুখোমুখি না দেখি, তবে বিস্ফোরণের মাত্রা কম হতে পারে। তাঁরা এই কিলোনোভার একটি মডেল তৈরি করেছেন, ৫ নম্বর চিত্রে সেটা দেখানো হয়েছে। সংঘর্ষের পর গামা জেটটির কিছু সময় লেগেছে ধ্বংসাবশেষ ফুঁড়ে বের হতে, সে জন্য আমরা তাকে ১.৭ সেকেন্ড পর দেখতে পাই। মনে করা হয়, আমরা যদি একটি জেটকে মুখোমুখি দেখতাম, তাহলে গামা বিস্ফোরণের পুরো মাত্রাটা ধরা পড়ত। এই গ্যালাক্সিটি আমাদের কাছাকাছি, তাই জেটের পাশ থেকেও আমরা গামা রশ্মি ধরতে পারলাম।

বহুবাহক জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা

এই আবিষ্কার বেশ কয়েকটি ভাবী কথনকে প্রমাণ করল। ১. দুটি নিউট্রন নক্ষত্র একে অপরকে প্রদক্ষিণ করলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, ২. দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে যে উচ্চশক্তিসম্পন্ন জেট তৈরি হয়, সেখান থেকে অল্প সময়ের জন্য গামা রশ্মি সৃষ্টি হয়, ৩. এই সংঘর্ষে ভারী মৌলিক পদার্থ, যেমন সোনা, প্লাটিনাম ও ইউরেনিয়ামের মতো পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ৪. ১৩০ মিলিয়ন (১৩ কোটি) আলোকবর্ষ দূর থেকে আলো ও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একে অপরের দুই সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীতে পৌঁছেছে। এর মানে হলো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ একই গতিতে ভ্রমণ করে, যেটা কিনা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বেরই একটি অনুষঙ্গ। এভাবে শুরু হলো বহুবাহক (Multimessenger) জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা। সেখানে যুগপত্ভাবে বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও মহাজাগতিক কণা (Cosmic ray) পর্যবেক্ষণ করা হয়।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপণ প্রক্রিয়া

দুটি লম্ব বাহুর মধ্যে ব্যতিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই বাহু দুটির সামান্য পরিবর্তন লাইগো যন্ত্র ধরতে পারে। দুটি লাইগো যন্ত্রের একটি লুইজিয়ানায় এবং আরেকটি চার হাজার কিলোমিটার দূরে ওয়াশিংটন স্টেটে অবস্থিত। এদের চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাহু দুটি একে অপরের সঙ্গে লম্বভাবে অবস্থিত।

লাইগোতে একটি লেজার রশ্মিকে একটি আধা স্বচ্ছ কাচের মধ্য দিয়ে দুটি লম্ব অংশে ভাগ করা হয় এবং রশ্মি দুটি ওই বাহু দুটিতে ভ্রমণ করে। এই রশ্মি দুটিকে আবার পুনরায় মিলিত করা হয়, যখন তারা বাহু দুটির শেষে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। যদি দুটি বাহুই একই দৈর্ঘ্যের হয়, তবে তরঙ্গ দুটির শীর্ষ দুটি (অথবা সবচেয়ে নিচু অংশ দুটি) একে অপরের ওপর পতিত হয়ে গঠনমূলক ব্যতিচার করবে। অর্থাত্ তাদের মিলিত ফল আরও উঁচু হবে (অথবা আরও নিচু হবে)। আলোকে বিচ্ছুরণ থেকে মুক্ত রাখতে ও তার গতিকে এক রাখতে ওই বাহুগুলোর টিউবের মধ্যে ভ্যাকুয়াম অবস্থা বজায় রাখা হয়।

যদিও প্রতিটি বাহু মাত্র চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের, ফ্যাব্রি-পেরো (Fabri-Perot) পদ্ধতিতে ২৮০ বার (বা আরও বেশি) পুনরায় প্রতিফলনের ফলে কার্যত একেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১২০ কিলোমিটার (বা তার থেকেও বেশি) হতে পারে। ফলে যে ব্যতিচার হয়, তা দিয়ে দুটি বাহুর মধ্যে দৈর্ঘ্যের পার্থক্য একটি প্রোটনের ব্যাসের ১/১০০০ বা ১/১০,০০০ শতাংশ হলেও সেটা ধরা যেতে পারে।

কিন্তু আলোক তরঙ্গ নিজেই কি স্থানকালের বিচ্যুতির অধীন নয়? প্রশ্ন উঠতে পারে, আলোক তরঙ্গকে ব্যতিচারের জন্য কী করে ব্যবহার করা সম্ভব, যদি তাদের নিজেদেরই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সংকোচন বা বৃদ্ধি হয়। আসলেই আলোক তরঙ্গকে ব্যবহার করা যেত না, যদি লম্ব বাহু দুটির প্রতিটি একইভাবে বাড়ত কিংবা সংকুচিত হতো। কিন্তু আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে সমবর্তনের ফলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একদিকে দেশকালের দৈর্ঘ্য যেমন বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে (অর্থাত্ লম্ব দিকে) তেমনভাবেই সংকোচন করে (ছবি ২)। এর ফলাফলটা দুটো ছবি দিয়ে বোঝানো সম্ভব।

৬ নম্বর ছবিতে আমরা দেখিয়েছি, দুটি লম্ব বাহুতে দুটি তরঙ্গ, যখন কোনো মহাকর্ষ তরঙ্গ নেই। দেখাই যাচ্ছে যে এখানে দুটি তরঙ্গের দশা (phase) একই এবং এদের মিলিত করলে আমরা গঠনমূলক ব্যতিচার পাব।

এবার মনে করা যাক, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের জন্য স্থানকালের বিচ্যুতি হচ্ছে। আমরা আগেই বলেছি, এর ফলে স্থান একদিকে সংকুচিত হয়, অন্যদিকে বর্ধিত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, পুরো বাহুটার দৈর্ঘ্যের হেরফের হয় এবং যেহেতু আলো স্থানকালে নিমজ্জিত, সেহেতু তারও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হেরফের হবে। ৭ নম্বর ছবির ওপরের প্যানেলে আমরা দেখেছি যে, একটি বাহুর প্রসারণ ঘটছে, ফলে সেই বাহুতে চলমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়েছে। অন্যদিকে লম্ব বাহুটির সংকোচনের ফলে সেই বাহুর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রথম বাহুটির তুলনায় কমেছে। দেখাই যাচ্ছে যে এই দুটি তরঙ্গকে যখন মেলানো হবে, তখন তাদের দশা এক হবে না এবং তাদের গঠনমূলক ব্যতিচার হবে না, অর্থাত্ একটি তরঙ্গের শীর্ষ অন্য তরঙ্গের শীর্ষের সঙ্গে মিলবে না। একটি শীর্ষের আগমন সময় অন্য শীর্ষের আগমন সময় থেকে ভিন্ন হবে। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্য ছবিতে আমরা এই প্রক্রিয়াকে একটু বাড়িয়ে দেখিয়েছি।

চাপানো আলো

লাইগো যন্ত্রে বিজ্ঞানীরা খুবই চমকপ্রদ একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইছেন, যা কিনা প্রকৃতিতে উপস্থিত কোয়ান্টাম ভ্যাকুম বিচলনের প্রভাবকে এড়াতে পারবে। একে চাপানো (squeezed) আলো বলা যেতে পারে। আমরা জানি, শূন্যতার মধ্যেও ক্রমাগতই কণা সৃষ্টি হয়, যাদের অস্তিত্ব নিরূপণের আগেই তারা প্রতিকণার সঙ্গে মিলিত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু ওই স্বল্প সময়ের অস্তিত্বে তারা লাইগোর আয়নার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা লেজারের এমন আলো তৈরি করছেন, যার ফলে ওই ধরনের প্রভাব থেকে এই এক্সপেরিমেন্টকে মুক্ত করা যেতে পারে।

এর ফলে শূন্যস্থানে যে ফলাফল পাওয়া যাবে, লাইগোর ফলাফল তার থেকেও ভালো হবে। কিন্তু এই জটিল আলোচনাটি ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিয়ে আপাতত এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কাহিনির সমাপ্তি টানছি।