পদার্থবিদ্যা
বিশৃঙ্খলতার আইন
‘বৃহৎ বাড়ির মধ্যে কেবল একটি ঘর বন্ধ। তাহার তালাতে মরিচা ধরিয়াছে, তাহার চাবি কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। সন্ধ্যাবেলা সে ঘরে আলো জ্বলে না। এখানে আর কেহ আসেও না, এখান হইতে আর কেহ যায়ও না। এখানে যেন মৃত্যুরও মৃত্যু হইয়াছে।’ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধরা যাক, অন্য কোনো গ্যালাক্সির অন্য এক গ্রহ। সেখানে বায়ু একেবারেই ক্ষীণ, সারা ঘরে মাত্র এক হাজার অণু ছোটাছুটি করছে। আরও ধরা যাক, ওই গ্রহে অতি ক্ষুদ্র এক প্রাণী বাস করে। প্রতি নিশ্বাসে ওর ফুসফুসে ঢোকে মাত্র ১০টি অণু। এনট্রপির আইন কিন্তু ওকে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। বিশৃঙ্খলতার সুযোগ নিয়ে ১০টি অণুর পক্ষে এই আইন ভেঙে ফেলা তেমন কঠিন নয়!
একটি কাচের পাত্রে পানির মাঝে কয়েকটি ফুলের রেণু রাখা, বোটানিস্ট রবার্ট ব্রাউন মাইক্রোস্কোপ তাক করে তাকিয়ে আছেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, রেণুগুলো এলোমেলোভাবে নড়াচড়া করছে। রেণুর এই নড়াচড়ার নাম দেওয়া হয় ব্রাউনিয়ান গতি। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন প্রথম এর ব্যাখ্যা দিলেন। পানির অণুগুলো এলোমেলো ছোটাছুটি করছে, যখন সবদিক থেকে এরা ফুলের পরাগটিকে সমানভাবে ধাক্কা দিচ্ছে তখন এগুলো স্থির হয়ে বসে আছে। কিন্তু কোনো একদিকের ধাক্কাধাক্কি কম হলেই পরাগটা সেদিকে ছুটছে। আমি যদি পুকুরের পানিতে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, আমার ওপর পানির অণুগুলোর ধাক্কাধাক্কির অসমতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ আমি অনেক বড়, ধাক্কাধাক্কির পরিমাণ অনেক বেশি, ব্রাউনিয়ান গতিতত্ত্ব আমার ওপর খাটবে না, এনট্রপির আইন জয়ী হবে। ধরুন, এক মাঠে মেলা বসেছে, হাজার হাজার লোক এলোমেলোভাবে হাঁটাহাঁটি করছে। আমি মাঠের ওপর একটা লম্বা দাগ দিলাম। তারপর বানালাম এক তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে প্রতি এক মিনিটে দাগটির এপার থেকে ওপারে যত লোক পার হবে, ওপার থেকে এপারে আসবে ততজন লোক। লোকসংখ্যা যত বেশি হবে, চলার গতি এবং দিক যতই এলোমেলো হবে, আমার তত্ত্ব ততই সত্যি হবে। প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলতার মাঝে একধরনের শৃঙ্খলা খুঁজে পাওয়া যায়, এনট্রপির আইন সে কথাই বলে।
রবীন্দ্রনাথের রুদ্ধ গৃহকে পদার্থবিদদের ভাষায় বলা হয় আইসোলেটেড সিস্টেম (Isolated system), যার সঙ্গে বাইরের সব যোগাযোগ ছিন্ন করা হয়েছে। তাপ, আলো, এমনকি একটা অণুও এ ঘরে ঢুকবে না বা ঘর ছেড়ে বাইরে যাবে না। এনট্রপি হলো বিশৃঙ্খলতা আর এনট্রপির সূত্রমতে সময়ের তীর ছোটে শৃঙ্খলতা থেকে বিশৃঙ্খলতার দিকে। ঘরের বইপত্র, জামাকাপড় সাজিয়ে রাখলেন, মেঝে ঝাড়ু দিলেন, কয়েক দিন পর আবার সব একাকার! কতভাবে ঘরের সব সামগ্রী সাজিয়ে রাখা যায়, তার সঙ্গেও এনট্রপির সম্পর্ক আছে। এনট্রপির আইন অনুসারে এমন একটি রুদ্ধ গৃহের বিশৃঙ্খলতা সময়ের সঙ্গে সমান থাকবে অথবা বাড়তে থাকবে, কখনো কমবে না। ধরুন, প্রতিদিন গোপনে এই রুদ্ধ গৃহের ছবি তোলা হয়েছে। এক লাখ বছর পর এই ছবিগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বলে দিতে পারবেন কোনটা আগের আর কোনটা পরের ছবি। এনট্রপির আয়নায় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যেক আলাদা করে দেখা যায়।
ধরা যাক, শুরুতে ঘরের ভেতরে ছিল একটি টেবিল। টেবিলটিকে বেশ স্থায়ী মনে হতে পারে, তবে সময়ের হাত থেকে ওর রক্ষা নেই, এনট্রপির আইন টেবিলটির বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। বায়ুর অণুগুলো টেবিলের সঙ্গে এসে ধাক্কা খাচ্ছে। কয়েকটি অণু একই সঙ্গে টেবিলের একই স্থানে আঘাত করে টেবিলের কয়েকটি অণুকে স্থানচ্যুত করতে পারে। প্রতি মুহূর্তের এই ধাক্কাধাক্কির ফলে লাখো বছরের মধ্যে টেবিলটি ধ্বংস হয়ে যাবে, টেবিলের অণুগুলো বাতাসের অণুর সঙ্গে মিশে যাবে।
তাপ অতি দ্রুত বিশৃঙ্খলতা বাড়াতে পারে, তাপ যত বাড়বে, অণুগুলো ততই জোরে ছুটবে, ধাক্কাধাক্কির পরিণাম ততই ভয়াবহ হবে। তাপমাত্রা অনেক বাড়ালে টেবিলে আগুন লেগে যাবে, টেবিলের অণু ও বাতাসের অণুগুলো মিশে নতুন কিছু অণু তৈরি করবে। টেবিল, বাতাস সবার অণু মিলেমিশে একাকার! বিশৃঙ্খলতার চরম! ধরা যাক, রুদ্ধ গৃহের পাশে আরেকটি রুদ্ধ গৃহ আছে, মাঝে একটি দরজা। দ্বিতীয় রুদ্ধ গৃহ একেবারে শূন্য। মাঝের দরজাটি খুলে দেওয়া হলো। যতক্ষণ দুটি ঘরের বায়ুর তাপ এবং চাপ সমান না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রথম ঘরের অণুগুলো দ্বিতীয় ঘরটিতে ঢুকতে থাকবে। কোনো দিন কি আবার অণুগুলো দ্বিতীয় ঘর খালি করে প্রথম ঘরে ফিরে আসবে? এনট্রপির আইন মতে তা হওয়ার নয়। তবে ঘরটিতে যদি মাত্র পাঁচটি অণু থাকত তাহলে এনট্রপির আইনকে ভাঙা তেমন কঠিন কাজ হতো না!
সমগ্র মহাবিশ্বকে একটি রুদ্ধ গৃহ হিসেবে ধরা যেতে পারে। দেয়াল, দরজা, জানালাবিহীন বিশাল এক রুদ্ধ গৃহ, যার আয়তন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে মহাবিশ্বের এনট্রপি। এই বিপুল মহাবিশ্বে পৃথিবী নামে একটি গ্রহে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। আমাদের শরীরের কোষ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেশ সাজানো গোছানো। জীবনের ছন্দ এলোমেলো নয়। বিশৃঙ্খলতা থেকে এখানে শৃঙ্খলতা সৃষ্টি হয়েছে, ক্ষণকালের জন্য হলেও প্রাণের স্পন্দনে এনট্রপির তির উল্টো দিকে ছুটেছে! মহাবিশ্বে জীবনের সৃষ্টি একটি বিচিত্র ঘটনা। তবে এনট্রপির আইনকে অমান্য করা হয়নি। জীবন তৈরি করতে গিয়ে স্থানীয়ভাবে এনট্রপি যেটুকু কমেছে, মহাবিশ্বের অন্যত্র এনট্রপি বেড়েছে তার চেয়ে বেশি। ফলে মহাবিশ্বের সর্বমোট এনট্রপি কিন্তু কমেনি, বরং বেড়েছে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত