তৃতীয়

অলংকরণ: আরাফাত করিম

স্বপ্নে কেউ কি কখনো নিজের চেহারা দেখতে পায়? খুব সম্ভবত পায় না। কিন্তু কদিন ধরে আমি পাচ্ছি। একটা ছোট স্পেসশিপের শিল্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে আমার চেহারা। সেখানে তিনটি চোখ, তিনটি কান আর তিনটি শুঁড়। ডান পাশের শুঁড়টা আবার এক দিকে হেলে আছে। কিছু একটা বলতে যাব, ঠিক এ সময় শেষ হয়ে যায় স্বপ্নটা। চোখ খুলি আমি।

আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। তবে এখন আপনা থেকে না খুললেও কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেও খুলতে হতো। অ্যালার্ম বাজতে আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি। আমার স্ত্রী পাশ থেকে ঘুম জড়ানো চোখে তাকিয়ে আছে। আমার কাঁধে হাত রাখল আলতো করে। চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি যে কী জিজ্ঞেস করতে চলেছে ও।

‘আমরা কি আসলেও যাচ্ছি?’

‘হ্যাঁ,’ বলে ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম।

‘সবার নজর এড়িয়ে আমরা স্পেসশিপটায় চড়তে পারব?’

‘আরে, সবাই ভাববে আবারও টেস্ট ফ্লাইটের জন্য যাচ্ছি। কেউ দেখবে মিশন কন্ট্রোল রুমে যাওয়ারও দরকার মনে করবে না।’

‘আমার না খুব ভয় করছে।’

ভয় যে আমার করছে না, তা নয়। কিন্তু সব কথা তো আর বলা যায় না। ‘এত চিন্তা কোরো না তো। সব পরিকল্পনামাফিকই হবে।’

‘আমাদের আর কোনো কিছু সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই?’

‘না, যা যা দরকার, সবকিছু আমি স্পেসশিপে আগেই রেখে এসেছি। তা ছাড়া গার্ডের চোখ এড়িয়ে ভেতরে কিছু নেওয়াও যাবে না। তুমি আর বাচ্চারা এমন ভাব ধরবে, যেন আমাকে বিদায় জানাতে চলেছ।’

‘তোমার প্রতিবেশীরাও বিদায় জানাতে যাচ্ছে দেখে ভ্রু কুঁচকাবে না?’

‘সেই ঝুঁকিটা নিতেই হবে,’ জবাব দিলাম।

পাশের ঘর থেকে বাচ্চাদের হুটোপুটির শব্দ কানে এল। ওরা অবশ্য সত্যিটা জানে না। ভাবছে আমার স্পেসশিপ চালনা দেখতে চলেছে। জানে না, আর কখনো ফিরে আসবে না এখানে।

প্রথম দিকে সিদ্ধান্তটা নিতে অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। কিছুদিনের মধ্যেই আবারও যুদ্ধ শুরু হবে। এবারে একটু এদিক-সেদিক হলে পুরো গ্রহটাই যে ধ্বংস হবে, সেটা জানা কথা। এখন পালিয়ে গেলে অন্য কোনো গ্রহে আবারও নতুন করে শুরু করা যাবে সব কিছু। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিরে। কাপড় পরে নিচে নামলাম পরিবারের সবার সঙ্গে নাশতা করার জন্য।

‘আর তো বেশিক্ষণ নেই, তা–ই না, বাবা?’ আমার ছেলে জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, বাবা,’ বললাম।

একটা বাটি পড়ে গেল আমার সহধর্মিণীর কম্পমান হাত থেকে। নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল ও।

‘কী হয়েছে, মা?’ আমার মেয়ে বলল।

‘কিছু নয়, আম্মু,’ বলল আমার স্ত্রী। ‘জুসটুকু খেয়ে নাও। তোমার বন্ধুরা চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে।’

অলংকরণ: আরাফাত করিম

খানিক বাদে বেল বেজে উঠল। উঁকি দিয়ে দেখলাম, বাইরে আমাদের প্রতিবেশীরা অপেক্ষা করছে তাদের গাড়িতে।

‘তালা দিয়ে যাব?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘লাভ আছে কোনো?’ মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে বলল আমার স্ত্রী।

জনশূন্য রাস্তা ধরে ঢিমেতালে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি। প্রবেশপথের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সবাইকে সাবধান করে দিলাম আরও একবার। ‘কেউ একটা কথাও বলবে না।’

নতুন স্পেসশিপটার টেস্ট পাইলট আমি। গার্ড অনেক দিনের চেনা। ‘আমার পরিবার আর কয়েকজন বন্ধু সঙ্গে এসেছে স্পেসশিপ চালানো দেখবে বলে,’ বললাম।

‘কোনো সমস্যা নেই,’ বলে হাত নেড়ে আমাদের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিল গার্ড।

ওই তো দেখা যাচ্ছে স্পেসশিপটা। নিচু হয়ে কিছু মাটি তুলে নিয়ে পকেটে রাখলাম। একবার পেছন দিকে ঘুরে দেখে নিলাম শেষবারের মতো।

এলিভেটরটা শব্দ করে থেমে গেল। দরজা খুললে আমরা পা রাখলাম স্পেসশিপের ভেতরে। আমরা এখন মাটি থেকে কতটা উঁচুতে, তা দেখে মুখ হাঁ হয়ে গেল বাচ্চাদের।

‘ওদের কি এখনই বলা উচিত নয়?’ আমার স্ত্রী জানতে চাইল। ‘ওদেরও জানা উচিত যে এই দেখাই শেষ দেখা।’

‘হ্যাঁ, বলো। আর লুকিয়ে কী হবে।’

নির্ধারিত সুইচে চাপ দিতেই চালু হয়ে গেল রকেটগুলো। কাঁপা কাঁপা হাতে কন্ট্রোল বাটনটা ঘোরাচ্ছি, এ সময় খেয়াল করলাম যে উপস্থিত সবার চোখ আমার দিকে। কালবিলম্ব না করে পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিলাম। একবার কেঁপে উঠল গোটা স্পেসশিপ। এরপর উঁচুতে উঠতে থাকলাম আমরা। গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে।

আমি বাদে সবাই সজল চোখে তাকিয়ে আছে বাইরে।

নির্ধারিত সিটটায় এলিয়ে পড়লাম এবার।

‘আমরা কোথায় চলেছি, সেটা জানা আছে তোমার?’ আমার প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল। ছোটবেলা থেকেই পাশাপাশি বাড়িতে থেকে আসছি আমরা। সম্পর্কটা এখন ভাইয়ের মতো।

সামনে ঝুঁকে একটা চার্ট দেখালাম ওকে। ‘হ্যাঁ,’ ইচ্ছা করেই গলায় উৎফুল্ল ভাব আনার চেষ্টা করে বলি। ‘এই ছোট গ্রহটা দেখতে পাচ্ছ? একটাই চাঁদ এর।’

‘এটা? সূর্য থেকে তৃতীয়?’

‘হ্যাঁ,’ বললাম। ‘সূর্য থেকে তৃতীয়। আমি পৃথিবী বলে ডাকি এটাকে।’

(বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে)