জতুগৃহ

Abdul Gaffar

প্রথম দিন ইফতুর কথা শুনে ভীষণ হাসাহাসি করেছিল জুলিয়া। এমনকি কথাটা নিয়ে দু–একজন বন্ধুর সঙ্গে রসিকতা করতেও ছাড়েনি। কী দুনিয়া পড়ল দেখো দেখি! ছয় বছরের বাচ্চাও সাই ফাই মুভি দেখে এসব আজব আজব কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে। সে নাকি এই পৃথিবীর কেউ নয়। সে নাকি এসেছে অনেক দূরের কোনো অজানা গ্রহ থেকে। জুলিয়ার হাসাহাসি দেখে বাচ্চাটা গম্ভীর হয়ে গেলে রুবি নানু ওকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে বলেছিলেন, ‘তাই তো রে! এই পুতুলের মতো বাচ্চাটা কি আর আমাদের এই পচা পৃথিবীর হতে পারে? আমাদের ইফতু সোনা মনে হয় আসলেই কোনো দূরের এক তারা থেকে এসেছে। সে জন্যই তো ইফতু সোনা এত্ত মিষ্টি আর লক্ষ্মী, তাই না ইফতু?’

রুবি নানুও যে আসলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা–তামাশাই করছেন, সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি ইফতুর একটু একটু হয়েছিল। তাই সে আরও গম্ভীর হয়ে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিল সেদিন। পেছনে মা আর নানুর বিকট হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসছিল তখন। তারপর থেকে প্রায়ই ইফতু নামের গুরুগম্ভীর মিষ্টির দলার মতো বাচ্চাটা একে–ওকে বলতে শুরু করে কথাটা, ‘জানো, আমি কিন্তু তোমাদের এই পৃথিবীর নই। আমি অন্য একটা গ্রহ থেকে এসেছি। যে গ্রহের নাম কেউ জানে না।’

আরেকটু বড় হওয়ার পর জুলিয়া রীতিমতো বিরক্তই হতে থাকল ব্যাপারটা নিয়ে। একদিন নার্সারি স্কুলের টিচার মিস সানজানা ছুটির পর তাকে ডেকে নিয়ে বেশ কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন, ‘দেখুন, আজকাল আপনারা বাচ্চাদের মোটেও বাড়িতে সময় দেন না। বাচ্চারা নানা আজগুবি সিনেমা, কার্টুন দেখে আর গেমস খেলে বড় হচ্ছে। আর তাদের মাথার মধ্যে নানা অবাস্তব চিন্তা ঢুকে পড়ছে। ইফতু এমনিতে খুব শান্ত আর লক্ষ্মী বাচ্চা, কিন্তু তাকে আপনার আরেকটু সময় দেওয়া উচিত। নিজেদের আরামের জন্য দয়া করে সারা দিন টেলিভিশনের সামনে বাচ্চাকে বসিয়ে রাখবেন না।’

টিচারের বক্তৃতা শুনে মুখটুখ লাল করে বাড়ি ফিরেছিল জুলিয়া। জুলিয়া ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের কাজ করে বটে, কিন্তু তার বেশির ভাগটাই বাড়িতে বসেই করা হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে এদিক–ওদিক যেতে হয় ম্যাটেরিয়াল কালেকশনের জন্য। এর বাইরে তার গোটা সময়টাই ইফতুর জন্য। আর মোটেই সে সারা দিন বাচ্চাকে টেলিভিশন আর মোবাইল দিয়ে বসিয়ে রাখে না। সবাই জানে যে জুলিয়া ইফতুকে কোয়ালিটি টাইম বেশ ভালোই দেয়। তারপরও তাকে এসব কথা শুনতে হলো। সে বাড়ি ফিরে টেবিলে বসে ভাত খাওয়ার সময় মিষ্টি করে ইফতুকে বলল, ‘ইফতু, তোমাকে একটা কথা বলব?’

ইফতু ভাত আর মুরগির মাংস দিয়ে মায়ের বানানো ছোট বলগুলোর একটা মুখে পুরে মাথা কাত করে বলল, ‘কী মা?’

‘এই যে প্রায়ই বলো, তুমি এই পৃথিবীর নও, তুমি অন্য গ্রহ থেকে এসেছ—এসব বলার মতো বয়স তো তুমি পার হয়ে এসেছ, তাই না? সামনের মাসে তোমার বয়স আট হবে। আট বছরের বাচ্চারা এসব হাস্যকর আজগুবি কথা বলে? তুমি তো নিজেও জানো যে এসব সত্যি নয়।’

ইফতু আরেকটা বল মুখে পুরে বলল, ‘কে বলেছে সত্যি নয়? সত্যি তো হতেও পারে।’

জুলিয়ার মেজাজটা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয়। ইফতুর মাথার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ছি বাবা, এসব বলে না। তুমি তো আমার পেটের মধ্যে ছিলে, এই এখানে। ওই যে তোমার বন্ধু চুমকির মায়ের পেটটা কেমন বড় হয়ে গেছে, কেন জানো তো? ওর পেটের মধ্যে বাবু আছে একটা, বাবুটা চুমকির ভাই না বোন, বের হলে আমরা জানতে পারব। তুমিও এভাবে আমার পেটের মধ্যে ছিলে। তারপর হাসপাতালে ডাক্তার আমার পেট কেটে তোমাকে বের করেছিল। একটুখানি একটা শরীর ছিল তোমার। ডাক্তার তোমাকে মুছেটুছে পরিষ্কার করে আমার কোলে দিয়েছিল কাপড়ে পেঁচিয়ে। তার পরের দিন আমাদের নিতে এসে তোমার রুবি নানু একটা ছবি তুলেছিল তোমার। ওটাই তোমার প্রথম ছবি। তখন তোমার বয়স এক দিন। এসো, তোমাকে ছবিটা দেখাই।’

জুলিয়া খাওয়া শেষ করে পুরোনো অ্যালবামটা বের করল। ইফতুর কত কত ছবি! জন্মের পর প্রথম ছবি, প্রথম গোসলের ছবি, প্রথম ভাত খাওয়ার ছবি, প্রথম হাঁটার ছবি। প্রথম নববর্ষ, প্রথম ঈদ। প্রথম স্কুলে যাওয়া। দেখতে এখনো ভালো লাগে। ইফতুও মনোযোগ দিয়ে সব ছবি দেখে। জুলিয়া আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দেখলে তো, তুমি আসলে আমার পেট থেকেই জন্ম নিয়েছ। তাহলে কীভাবে আরেকটা গ্রহ থেকে এলে?’

ইফতু অ্যালবামটা বন্ধ করে বলল, ‘এতে কিছুই প্রমাণিত হয় না।’

রাগে মাথাটা দপ করে উঠল জুলিয়ার। মুখটুখ লাল হয়ে গেল একেবারে। গলায় ঝাঁজ এনে বলল, ‘ইফতু! প্লিজ! এসব বাজে কথা আর কখনো বলবে না। সবাই হাসাহাসি করে তোমাকে নিয়ে, বোঝো না তুমি? আজ থেকে আর কক্ষনো এসব কথা বলবে না তুমি।’

ইফতু তার গভীর কালো চোখ দুটো তুলে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে আমার বাবা নেই কেন বলো! এই পৃথিবীতে আমার একজন বাবা থাকার কথা ছিল, তাই না?’

ছেলের কথা শুনে একেবারেই থমকে গেল জুলিয়া। এই প্রশ্নের সম্মুখীন একদিন হতেই হবে, তা তো সে ভালো করেই জানত। তবু কথাটার উত্তর দিতে গিয়ে সেসব গুলিয়ে ফেলল যেন। অথচ কত দিন ধরে ভেবে রেখেছে যে ইফতু প্রশ্নটা করলে সে কী বলবে। সে এবার ইফতুকে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে বলল, ‘নিশ্চয় তোমার একজন বাবা আছে সোনা। তোমার বাবার নাম ছিল রেমি। সে ছিল একজন নামকরা কৃষিবিদ। নতুন প্রজাতির এক রকম পোকা শনাক্ত করে খুব হইচই ফেলে দিয়েছিল তোমার বাবা। ওই পোকাগুলো গম পাকতে না পাকতেই সব গম নষ্ট করে ফেলে। পরপর কয়েক বছর দেশের সব গম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তখন। পোকাগুলো খালি চোখে দেখা যায় না, পাতার শিরার মধ্যে বাসা বাঁধে। তারপর ঘুণের মতো শেষ করে দেয় গাছটাকে। অণুজীবগুলোকে শনাক্ত করার পর সরকার তাকে বিশেষ পুরস্কার দিয়েছিল। কৃষি অধিদপ্তরের বিজ্ঞান গবেষণাগারে তাকে একটা প্রজেক্টের প্রধান করে দিয়েছিল। যাতে সে ওই প্রাণীগুলো থেকে গমগাছ রক্ষা করার কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারে। আর সেটাই হয়েছিল কাল।’

ইফতু গভীর মনোযোগের সঙ্গে কথাগুলো শুনছিল। এবার চোখ বড় বড় করে বলল, ‘কেন মা?’

‘দুষ্টু লোকেরা হিংসে করতে শুরু করে দিয়েছিল। তারা চাইছিল না যে রেমি এতে সফল হোক, তার আরও নামডাক হোক। একদিন তারা রেমিকে গুম করে দেয়।’

‘গুম করা মানে কী মা?’

জুলিয়ার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলাল, ‘মানে তোমার বাবা হঠাৎ হারিয়ে গেল। তুমি তখন আমার পেটে। একদিন ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে রেমি আর বাসায় ফিরল না। আমি সারা রাত অপেক্ষা করে পরদিন পুলিশের কাছে গেলাম। অনেক খোঁজাখুঁজি হলো। কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না।’

সে রাতে ইফতু ঘুমিয়ে পড়লেও জুলিয়ার ঘুম এল না। অনেক দিন পর তার বুকটা কান্নায় ভেঙে যাচ্ছিল। ইফতুকে ধীরে ধীরে সব কথাই বলতে হবে। অপ্রিয় সব সত্য কথা। আহা, বাচ্চাটা কত ছোট। অথচ তাকে কত কঠিন কঠিন সব সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তারপর কয়েক দিন ইফতু এই প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলল না। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল জুলিয়া। কিন্তু বিধি বাম! কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় হোমওয়ার্ক করতে বসে ইফতু আবার বলে উঠল হঠাৎ, ‘মা, আমি জানি বাবা কোথায় চলে গেছে!’

জুলিয়া চমকে উঠল এই কথায়, ‘তাই? কোথায়?’

‘বাবাও আসলে এই পৃথিবীর কেউ নয়। বাবাও আমার মতো অন্য গ্রহ থেকেই এসেছে। তাই বাবা তার আত্মীয়স্বজনের কাছে ফিরে গেছে।’

এ কথা শুনে কাঁদতে শুরু করল জুলিয়া। কী হলো এই ছোট্ট বাচ্চাটার? কী এক আজগুবি চিন্তা তার ছোট্ট মাথার ভেতর গেড়ে বসেছে, যা কিছুতেই যাচ্ছে না? জুলিয়ার কি একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া উচিত?

পরের সপ্তাহে ডা. অর্ণবের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করল জুলিয়া। বিষয়টা এখন আর ঠাট্টা–তামাশার পর্যায়ে নেই। নিশ্চয় ইফতু এক গভীর মানসিক অসুখে ভুগছে। ওর চিকিত্সা দরকার। পুরো ব্যাপারটা ডা. অর্ণবকে খুলে বলার পর সহজ এক সমাধানে পৌঁছালেন তিনি। টেবিলের ওপর কলম ঠুকতে ঠুকতে বললেন, ‘দেখুন মিস জুলিয়া, ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও অস্বাভাবিক নয়। ছেলেটা কখনোই বাবার আদর পায়নি, বাবাকে দেখেওনি কোনো দিন। অথচ তার চারপাশে সবারই বাবা আছে। খুব ছোটবেলা থেকে এর একটা নিজের মতো করে শিশুতোষ ব্যাখ্যা সে বের করেছে। তা হলো, তার বাবা নেই কারণ সে অন্য গ্রহ থেকে এসেছে। সে অন্য বাচ্চাদের মতো নয়। দিনে দিনে এই ব্যাখ্যা তার বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এখন সে আর এই বিশ্বাস থেকে বের হতে পারছে না।’

জুলিয়া বলল, ‘তাহলে আমি কী করতে পারি, বলেন ডাক্তার?’

‘আপনি ওকে ওর বাবার অন্তর্ধানের বিষয়টি আরও আগেই বলতে পারতেন।’

‘ও তো খুব ছোট। এসব বলে আমি ওকে কষ্ট দিতে চাইনি।’

‘কিন্তু সত্য জানা থাকলে ও এ রকম মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করাত না।’

‘এখন আমি কী করব?’

‘আপনি ওকে ওর বাবার কথা বারবার বলুন। বাবার ছবি দেখান। ওর বাবার পরিচিত লোকজনের কাছে নিয়ে যান। ওর বাবা যে সত্যি সত্যি রক্ত–মাংসের মানুষ, এটা ধীরে ধীরে প্রমাণ করুন।’

জুলিয়া গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। ডাক্তার তাকে আশ্বাস দেন, ‘ভাববেন না মিস জুলিয়া। প্রত্যেক বাচ্চারই এমন অদ্ভুত সব ভাবনা আর বিশ্বাস থাকে। সে জন্যই তো তারা বাচ্চা। জানেন, ছোটবেলায় আমার ধারণা ছিল, আমার বয়স বাড়তে বাড়তে আমি একদিন আমার বড় ভাইয়ের সমান হয়ে যাব, কিন্তু বড় ভাইয়ের বয়স একটুও বাড়বে না! হা হা হা।’

অর্ণব মন খুলে হাসতে লাগলেন। কিন্তু জুলিয়ার হাসি পেল না। সে মুখ গোমড়া করে আছে। তা দেখে অর্ণব বললেন, ‘আপনার ছেলেকে আমার কাছে সামনের সপ্তাহে নিয়ে আসবেন। আমি একটু কথা বলে দেখি।’

জুলিয়া বাড়ি ফিরে খুব আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করল যে তার কাছে রেমির একটিও ছবি নেই। সে মনে করতে চেষ্টা করল, কখনো রেমি আর সে কোনো ছবি তুলেছিল কি না। স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে, আর তা ছাড়া রেমির সঙ্গে তার একত্র বসবাস মাত্র চার মাসের, পরিচয়টাও হয়েছিল হঠাৎ করে। একদিন একটা ডিজাইনিংয়ের বই কিনতে গিয়ে দোকানে সে দেখে যে তার কাছে কোনো টাকা নেই। মানে টাকার পার্সটাই আনা হয়নি। খুব বিব্রত হয়ে বইয়ের প্যাকেট ফিরিয়ে দিতে দিতে সে বলেছিল, ‘আরেক দিন এসে নিয়ে যাব। আমি টাকা আনিনি।’ তখনই একটা চশমা পরা ছোটখাটো ছেলে পাশ থেকে বলে উঠেছিল, ‘আমি দিয়ে দিচ্ছি টাকাটা, আপনি পরে দিয়ে দেবেন নাহয়।’

জুলিয়া খুব বিরক্ত হয়েছিল এ কথা শুনে। এসব বাহানা মেয়েরা ভালোই বুঝতে পারে। এবার নিশ্চয় ছেলেটা টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য তার কাছে ফোন নম্বর চাইবে, তারপর মাঝেমধ্যে ফোন করবে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে, আর এভাবে খাতির জমানোর চেষ্টা চলবে। বিরক্ত হয়ে নিষেধ করার আগেই ছেলেটা দোকানিকে টাকাটা পরিশোধ করে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। যাওয়ার আগে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বইটা আপনার আজ খুব দরকার, নিয়ে যান। টাকাটা এই দোকানে পরে রেখে যাবেন। আমি প্রায়ই এখানে আসি, নিয়ে নেব ওদের কাছ থেকে।’

জুলিয়া বোকার মতো দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। বইটা সত্যি ওর খুব দরকার ছিল সেদিন। একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ডিজাইন জমা দেওয়ার সেটাই শেষ দিন। কিন্তু লোকটা এমন আজব কেন? বাড়ি ফিরে কিছুতেই ব্যাপারটা ভুলতে পারছিল না জুলিয়া। পরদিন ছুটে গিয়েছিল দোকানে টাকাটা দিতে। আশা করেছিল, গিয়ে দেখবে সে ওখানে বসে আছে। কিন্তু হতাশ হতে হলো তাকে। লোকটা ওখানে নেই। এরপর কারণে–অকারণে অনেকবার ওই দোকানে গেছে জুলিয়া। আশা করেছিল লোকটাকে ওখানে পাবে। কিন্তু কখনোই পায়নি। এর প্রায় এক মাস পর একদিন হঠাৎ টেলিভিশনে দেখে ওই আজব লোকটাই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সেরা বিজ্ঞানীর পুরস্কার গ্রহণ করছে। সংবাদটা মনোযোগ দিয়ে দেখল সে। পরদিন পত্রিকায় খুঁটিনাটি সব পড়ল। জানতে পারল যে কৃষি অধিদপ্তরে একটা প্রজেক্ট–প্রধান হিসেবে জয়েন করেছে লোকটা। নিজেকে কিছুতেই আটকে রাখতে পারল না জুলিয়া। কী এক অমোঘ আকর্ষণ তাকে লোকটার অফিস পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। আর লোকটা তার অফিসে জুলিয়াকে দেখে খুব সহজ ভঙ্গিতে হেসে বলে, ‘ও আপনি, এসে গেছেন!’ যেন সে আগে থেকেই জানত যে জুলিয়া আসবে।

এই মুহূর্তে কৃষি অধিদপ্তরের সেই অফিস ঘরটাতে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে জুলিয়া। ঘরটা একদম বদলে গেছে। একটুও আগের মতো নেই। একটা নতুন সাইনবোর্ড ঝুলছে ঘরের বাইরে। লেখা: চেরি টমেটো জাত বি ২৫৪ গবেষণা কেন্দ্র। জুলিয়া খোঁজ নিয়ে জানতে পারল যে গমের সেই বিশেষ পোকা নিয়ে প্রজেক্টটা বাতিল হয়ে গেছে। ওই দপ্তরই নেই এখন। রিসেপশনের লোকটা অনেক কাগজপত্র খুঁজে বলে, ‘আসলে প্রজেক্ট বাতিল হওয়ার পাঁচ বছর পর ফাইল–টাইল সব ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে ম্যাডাম। মিস্টার রেমি আহসান? না, তার কোনো ছবি বা তার সম্পর্কে কোনো ইনফরমেশন, কিছুই আর আমাদের কাছে নেই।’

কী আশ্চর্য! রেমির সব স্মৃতিই কি মুছে গেল পৃথিবী থেকে? জুলিয়া ভারি অবাক হলো। আচ্ছা, তার কি কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল? অনেক ভেবেও এ প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেল না জুলিয়া। না, চার মাসের বিবাহিত জীবনে কোনো আত্মীয়স্বজনের কথা শোনেনি জুলিয়া। এখন ভেবে সে খুব অবাক হচ্ছে যে একেবারেই না জেনে কীভাবে এই ছেলেটাকে বিয়ে করেছিল সে তখন! শুধু বিয়েই করেনি, তার সন্তানের মা–ও হয়েছে। জুলিয়া কি আসলেই এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করেছিল আট বছর আগে?

বাড়ি ফেরার সময় মনটা ভারি খচখচ করতে লাগল জুলিয়ার। সে গাড়ির দিক বদল করে ছুটল লেকভিউ হাসপাতালের দিকে। যে হাসপাতালে আট বছর আগে ইফতুর জন্ম হয়েছে। লেবার ওয়ার্ডের ১৭ নম্বর বিছানায় ভর্তি ছিল সে, এখনো স্পষ্ট মনে আছে। যে ডাক্তার তার অপারেশন করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল সাব্বির। লেকভিউ হাসপাতালের ভেতরটাও বেশ পরিবর্তিত হয়ে গেছে, লক্ষ করে জুলিয়া। লেবার ওয়ার্ডটার জায়গায় বসেছে সিসিইউ। চারতলার জায়গায় হাসপাতালটা এখন নয়তলা বিল্ডিং হয়েছে। বেশ ব্যস্ত হাসপাতাল এখন এটা, আগের মতো ছোট নয়। হাসপাতালের রেকর্ড রুমের বুড়োমতো কর্মকর্তা প্রথমে তার কথায় কানই দিচ্ছিলেন না। অনেক অনুনয়–বিনয় করার পর তিনি পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে রাজি হলেন। আট বছর আগের ২৮ ফেব্রুয়ারির রেকর্ডের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল জুলিয়া। ১৭ নম্বর বেডের পেশেন্ট জুলিয়া অধিকারী, বয়স ২৬, এই দিন হাইপারটেনশন আর প্রি–একলাম্পশিয়া নিয়ে লেকভিউ হাসপাতালে ভর্তি হয়। বিকেল চারটার দিকে জুলিয়া অধিকারী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি মৃত সন্তান জন্ম দেয় সেদিন। পরদিন ১ মার্চ সকালে তাকে ডিসচার্জ দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের পরপরই মৃত শিশুটিকে তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।