এটা তার কততম জাগরণ?
আজও চারপাশে সেই একই, প্রায় অচেনা একটা জগৎ ঝুলে আছে যেন, অসম্ভব শুভ্র-সফেদ। সাদাতেও যে কখনো চোখ ঝলসে যায়, এখানে না এলে তুমি বুঝতে না। প্রতিবার, তোমার প্রতিটা নতুন জাগরণে, চোখ ধাঁধানো স্মৃতি কাটিয়ে, কোঁচকানো চোখ স্বাভাবিক হয়ে আসার অনেকক্ষণ পরে, একটু একটু করে তোমার ঝুলন্ত চেতনাও জেগে উঠতে শুরু করে, মস্তিষ্ক সচল হয়—তুমি তখন দেখতে শুরু করো, চারপাশটা কী অসম্ভব সাদা! পুরো সাদা একটা জগৎ! এটা কি কোনো ঘর, না গহ্বর—না অন্য কিছু? তারপর তুমি শুধু দেখো, সাদার মধ্যে আরও সাদা জড়াজড়ি করে থাকা টিউবের মতো বিশাল বিশাল কতগুলো জার। ভেতরটা পূর্ণ থলথলে তরলে। তখনই তুমি মনে করতে পারো, টিউবসদৃশ এ রকম একটা জঠরেই শুয়ে আছ তুমি। মাতৃগর্ভের মতো এ জগৎ থেকেই জড়াজড়ি করে থাকা অন্য জঠরগুলোও দেখতে পাও, আরও ঘুমন্ত মানুষ। আরও। কতকাল ধরে তারা এ অবস্থায় আছে? তোমার স্মৃতিতে এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। আরও অনেক কিছুরই উত্তর তোমার জানার সীমার মধ্যে নেই। জেগে ওঠার পর তোমার মাথাটা নিরলম্ব ফাঁকাই থেকে যায় শুধু।
একটা স্বপ্নদৃশ্যের মতো কিছু ব্যাপার ঘটে এরপর। একটা খুব মায়াময় কিন্তু অসম্ভব দূরের একটা কণ্ঠ তোমার কাছে জানতে চায়, ‘তুমি কি ফিরতে চাও? মনস্থির হলো?’
তুমি জবাব না দিয়ে তখন একটা মুখ মনে করো, আর তার অনুষঙ্গে আরেকটা দৃশ্য চোখের সামনে ঘোড়দৌড়ের মতো ছুটে আসে। প্রতিবারই আসে। সাপের মতো কুচকুচে কালো একটা রাস্তা, বহুদূর চলে গেছে। কিশোরীর দোলানো বেণির মতোও। ওই কালো বেণির গা বেয়ে তীব্রবেগে ছুটছে একটা গাড়ি, টয়োটা আইএসটি। নামটা কেমন, তোমার মনে আছে এখনো! ওটা তোমার খুব পছন্দের গাড়ি ছিল। সমীর চালাচ্ছিল। হ্যাঁ, সমীর; কী যে সুপুরুষ! ইউনির সেই প্রথম দিন থেকেই যার সঙ্গে তোমার গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গিয়েছিল, আজ এই মাতৃগর্ভে ঝুলন্ত অবস্থায় আধোচেতনেও সমীরকে ভেবে তুমি কেঁপে ওঠো। সেই আদি রোমহর্ষ। সেই চেনা স্পর্শ। দুর্ঘটনাটা কীভাবে ঘটে, মনে নেই তোমার। শুধু একটা তীব্র ব্রেক কষার শব্দের স্মৃতি আমুল গেঁথে আছে মস্তিষ্কে, তোমার সমগ্র চেতনায়। এই, আর কোনো যন্ত্রণা নেই, কোনো দুঃখ-বেদনা নেই। সব ভুলিয়ে দিয়েছে এরা। কিন্তু তারপরও, সমীর ঠিক তীব্র এক পুরুষ হয়ে বসে আছে তোমার মাথায়। তাই প্রতিবার জেগে উঠলে তোমার মনে হয়, এবার সমীর নিশ্চয়ই সাড়া দিয়েছে তোমার ডাকে। তুমি এত করে বার্তা দিচ্ছ, সমীর সাড়া দেবে না! আর সমীর ছাড়া তো তুমি ফিরবেও না। স্থির সংকল্প তোমার: ফিরে যদি যেতেই হয়, তাহলে সমীরের কাছেই ফিরবে তুমি। সাত জনমের পরেও যদি অপেক্ষার কিছু থাকে, তুমি সে অপেক্ষাও করবে।
সেদিন গাড়িতে তোমরা তিনজন ছিলে—তুমি, সমীর আর ওর এক কাজিন। কালো একটা মেয়ে। সেদিনই প্রথম পরিচয়। একেবারে সাদামাটা চেহারা। তবে খুব হাসে মেয়েটা, খলবল করে। ভালোই লেগেছিল মেয়েটাকে তোমার। খুব একটা কথাবার্তা হয়নি।
তারপরই মনে পড়ে সেই বীভত্স দৃশ্যটা—অদৃশ্য মনিটরের পর্দায় প্রতি জাগরণে দৃশ্যটা যেন ফিরে ফিরে আসবেই: একটা ওল্টানো গাড়ি আর রক্তাক্ত তিনটা শরীর। এই দৃশ্যটাই বারবার তোমাকে এখানে আসার কারণ মনে করিয়ে দেয় যে তুমি আর তোমার সেই চেনা পরিচিত জগতে নেই। তুমি ঝুলে আছ, হয়তো অযুত-নিযুত বছর দূরের কোনো গ্রহান্তরে। কিংবা কোনো অজানায়, কে জানে! ঝুলে আছ, এটাই সত্য!
আজকের কণ্ঠস্বরটা সেই মায়াময় কণ্ঠ না। এই কণ্ঠও নরম, কিন্তু কোথায় যেন একটা ক্লান্তির আভাস আছে এর গলায়। দীর্ঘ জীবনের ক্লান্তি। কে জানে, কত প্রশ্নের উত্তরই তো তোমার কাছে নেই!
‘তুমি ফিরতে তৈরি?’ এরও সেই একই প্রশ্ন।
‘সমীর কী চায়?’ তুমি বরারের মতোই জানতে চাও।
‘তোমার আবেদন পৌঁছানো আছে...জবাব আসেনি কোনো।’
‘ওহ্! ও আমাকে খুঁজছে না!’ হতাশা ঘিরে ধরে তোমাকে। ‘আমি সমীরকে এত করে চাইছি! সমীরের কোনো সাড়া নেই! কেন?’
ও প্রান্ত থেকে কোনো জবাব আসে না।
‘দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে ও আমাকে বেশি ভালোবাসত। আমি নিশ্চিত ও-ও আমাকে খুঁজছে।’
ও প্রান্ত থেকে এবারও নীরবতা। তোমার মনে হলো আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ শুনলে।
‘তোমরা ওকে খুঁজে পাচ্ছ না?’
‘পেয়েছি। তাকে তোমার কথা জানানো আছে।’ পুরোনো, নির্বিকার জবাব।
‘তাহলে?’
ও প্রান্ত থেকে আর কোনো জবাব এলো না। পর্দাটা যেন ঝপ করে চোখের সামনে থেকে সরে গেল।
সমীর আসে না। কিন্তু তোমার সঙ্গে খুব আগ্রহ নিয়ে যোগাযোগ করে অন্যরা, ওই কৃত্রিম কণ্ঠটা তখন খুব আনন্দের গলা করে হাসে, নতুন নতুন সাক্ষাত্প্রার্থীর খবর জানায় তোমাকে। আর আশা করে, নতুন এই সাক্ষাত্প্রার্থীদের মধ্য থেকে কাউকে নিশ্চয় তুমি পছন্দ করে নেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই তোমার পছন্দ হয় না এবং এই একই খেলা চলতেই থাকে। বারবার। যেন অনন্তকাল ধরেই চলছে। তুমি একবার করে জেগে ওঠো আর প্রতিবার কৃত্রিম কণ্ঠের সঙ্গে প্রায় এই একই রকম কথা হয় তোমার, তারপর কণ্ঠধারী আরও নতুন নতুন সাক্ষাত্প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। বেশির ভাগ সময়ই তুমি ওই হাঁ-হুঁ করে যাও লোকগুলোর সঙ্গে, ফলে একবারের বেশি দ্বিতীয়বার আর কেউ আসে না। শুধু একজন ছাড়া। তবে কারও কারও সঙ্গে একটা-দুটোর বেশি কথা কখনো-সখনো হয়ও, তুমি অস্বীকার করবে না, কিন্তু সেসব কথা কোথাও পৌঁছায় না। ফলে শেষ পর্যন্ত কারোর সঙ্গেই ফেরার ব্যাপারে তুমি সম্মতি দাও না। কারণ, এরা কেউই আসলে সমীরের বিকল্প হতে পারে না। তবে ওই যে বললে এদের মধ্যে একটা লোক, প্রায় প্রতিবারেই সাক্ষাত্প্রার্থীদের মধ্যে হাজির থাকে। তোমাকে জাগানো হলে, দেখো অবধারিতভাবে সাক্ষাত্প্রার্থীদের মধ্যে নাছোড় লোকটা আছেই। আজও, যথারীতি হাসি হাসি মুখ করে সে অপেক্ষায় আছে। অবশ্য অনেক দিন ধরে আসছে বলে এই লোকের সঙ্গেই তোমার সবচেয়ে বেশি কথা হয়। ছোটখাটো একটা লোক, দার্শনিক চেহারা। তবে হাসিখুশি, কথায় কথায় হাসে। এ এসেই এক–দুই কথার পর একটা করে কৌতুক বলবেই। তারপর নিজে নিজেই হাসতে থাকবে। তুমি তখন চুপচাপ লোকটার হাসির শব্দ শোনো। ভালোই লাগে। কিন্তু তখনই, সমীর তোমার সামনে এসে দাঁড়ায়, সমীর হাসত প্রাণ খুলে। ও হাসলে মনে হতো পুরো মুখ ওর উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। পুরো পৃথিবী হাসছে। তখন আর এ লোকটাকে ভালো লাগে না।
আজও লোকটার পালা যখন এল, তার পুরো অবয়ব পরিষ্কার হয়ে উঠল সাদার সাগরে। চেহারা তার সেই একই রকম আছে। তবে আজ এসেই সে হাসল না। কেমন অন্যমনস্ক। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে একবার জোর করে হাসল সামান্য। বিষণ্ন বিষন্ন।
‘কী, আজ আপনার কৌতুক নেই? সব বলে ফেলেছেন?’ তুমি হেসে জিজ্ঞেস করলে।
ম্লান হাসল সে। মাথা নাড়ল।
‘আচ্ছা, আজ আমি একটা বলি। আমার পরিচিত একজন বন্ধু, ধরুন, তার নাম ছিল সমীর। ও একটা কৌতুক বলত...আমাকে বলত, “মিরা, এই ধরো, তুমি আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছ, তখন আমরা খুব বুড়োবুড়ি। তুমি এসে কড়া নাড়লে আমার দরজায়, ঠক ঠক।” ভেতর থেকে সমীর, জিজ্ঞেস করল, “কে কড়া নাড়ে?” আমি মিরা তখন বাইরে থেকে বলি, “আমি, আমি...” সমীর তখন বলে, “কে, কে তুমি, আমি তোমাকে মনে করতে পারছি না...আমি কাউকে মনে করতে পারছি না... মেয়ে, তুমি জানো না! হাজার বছরের বুড়োর কোনো স্মৃতি থাকে না, মনে রাখতে চাইলেও সে কাউকে মনে করতে পারে না, তুমি কে? কী যেন নাম বললে?”...আশ্চর্য কী জানেন, এই ডার্ক জোকসটা বলে সমীর কাঁদত, সত্যিকার অর্থেই বুক ভাসিয়ে কাঁদত ও। কেন বলতে পারেন?’
ভদ্রলোক কোনো জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে রাখে। অনেকক্ষণ চুপচাপ। তারপর হঠাৎ হু হু করে কাদতে শুরু করল সে।
‘আপনি কাঁদছেন কেন? হাসি পেল না!’
জবাব না দিয়ে চোখ মুছল সে। বলল, ‘আমি আর আসব না। আর দেখা হবে না।’
ঘরবাড়িগুলো চেনা আবার অচেনাও। তোমার স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে, যতটা পারা যায় দ্রুত মিলিয়েও নিচ্ছ তুমি: একটার পর একটা চেনা ঘরবাড়ি, গাছপালা, রাস্তা—কত কী! দেখে নিজের অজান্তেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছ তুমি। ইউনিভাসির্টি এলাকা পেরোনোর সময় তোমার প্রগলভতায় পক্বকেশী দু-একজন শিক্ষক মহাশয় চোখেমুখে বিরক্ত কিংবা বিস্ময় নিয়ে তাকাল। জবাবে তুমি মুখ টিপে হেসে দ্রুত পা চালাও। আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না, স্যার, বিড় বিড় করে বলো আর জোরে জোরে কদম চালাও।
এখন তুমি প্রায় সমীরদের পাড়াটার কাছে পৌঁছে গেছ। তবে রমনা পার্কের অংশটা পেরোনোর সময় তুমি প্রথমটা ধাক্কা খেলে, এই পার্ক তোমার চেনা সেই পার্ক নয়। এটা এখনও প্রায় একটা জঙ্গল। কোনার দিকের চার্চটার নির্মাণকাজ অবশ্য শেষের দিকে! বুকটা তখুনি ধড়ফড় করতে শুরু করল তোমার।
কোন সময়ে ফেরানো হয়েছে তোমাকে? এই সময়ে তো তোমার বাবারও বোধ হয় জন্ম হয়নি! তাহলে?
সেগুনবাগান পুরো এলাকাটাই প্রায় এখনো জঙ্গলাকীর্ণ। ডাক্তার টিপি বোসদের বাড়িটা অবশ্য চিনলে। গাড়িবারান্দায় তার ছোট সাইকেল রিকশার চাকার মতো সরু চাকাঅলা গাড়িটাও আছে। ডাক্তার সাহেবের পাশের বাড়িটা রসিক বাবুর হওয়ার কথা। হ্যাঁ, এ বাড়িও আছে। এই লোকের মৃত্যুর পর তার নিজের বাড়িতেই তাকে পোড়ানো হয়েছিল। দাহ দেখতে যাবে বলে বায়না ধরেছিলে তুমি আর তোমার ছোট ভাই, এর আগে মড়া কীভাবে পোড়ায়, দেখোনি কখনো। কিন্তু তোমার মা কিছুতেই যেতে দিল না। জোর করে তোমাকে ও তোমার ছোট ভাইকে পড়ার ঘরে বন্দী করে রাখল। রসিকবাবুর দাহের বর্ণনা তুমি পরে অবশ্য শুনেছিলে সমীরের কাছ থেকে। রসিকবাবুকে পোড়ানোর সময় নাকি পোড়ানোর একপর্যায়ে রসিকবাবু চিতা ছেড়ে প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল, পর্যাপ্ত কাঠের জোগান না থাকলে নাকি এ রকম হয়—সমীরের বিশেষজ্ঞ মতামত ওটা। মড়া পোড়ানোর সময় নাকি আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল (এটাও সমীরের ভাষ্য), মৃতের নাভিটা নাকি বিকট শব্দ করে প্রায় পটকা ফাটার মতো আওয়াজ করে ফোটে। সমীরের কথা তুমি বিশ্বাস করোনি। সমীরের সবকিছু নিয়ে রসিকতা করার বদভ্যাস ছিল। তবে তোমার মায়ের কাছ থেকে অনেক বছর পরে শুনেছিলে, রসিকবাবুর দাহের আগুনের শিখা নাকি তোমাদের বাড়ি থেকেও দেখা গেছে। তোমাদের বাড়িটা তৈরি হয়েছিল তিরিশ কি চল্লিশ সালের দিকে। তোমার বাবা কলকাতা থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছিল। সেই সুবাদেই তোমাদের সেগুনবাগানে বসবাসের শুরু। সমীরের বাবা ছিল মেডিকেল কলেজের ডাক্তার। সে সময়ে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি নিয়ে, পাশাপাশি প্রতিবেশী হয়ে নির্বিঘ্নে থেকেছে সবাই, হিন্দু-মুসলিম নিয়ে কারও কোনো সমস্যা ছিল না। মায়ের কাছেই শুনেছ। সে জন্যই সমীরের ব্যাপারে অন্তত তোমাদের পরিবারে থেকে কখনো কোনো আপত্তি ওঠেনি।
সমীরদের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতে পৌঁছাতে তোমার সন্ধ্যাই নামল। শীতকাল। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। তার ওপর সেগুনবাগানের সর্বত্রই একটা ছাড়া ছাড়া ভাব, মাত্রই এখানে বসতি গড়ে উঠছে। কাজেই লোকজন আসবে কোত্থেকে! পাশেই কোনো একটা জঙ্গল থেকে শিয়াল ডেকে উঠল। তারপর আরও একটা। এরপর চারপাশ থেকে সমস্বরে ডাকতে শুরু করল। তোমার শৈশবের সময়টায় হলে তুমি নিশ্চিতই ভয় পেতে। এখনকার কথা অবশ্য আলাদা। এখনকার কেউ হলেও ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু তোমার সত্যিই একটওু ভয় লাগল না। আসলে যে জীবন থেকে তোমার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, তাতে এখনই এত জলদি মানবীয় সব গুণাবলি তোমার মধ্যে ফিরে আসার কথা নয়। আর ভয় পেলেও তা আমলে নেওয়ার সময়ও তোমার এখন নেই। তোমার মাথায় শুধু একটা চিন্তাই ঘুরছে: তুমি যে সময়ে ফিরেছ, সমীরকেও কি এই একই সময়ে ফেরানো হয়েছে? যুক্তি বলে, তারও এই সময়েই ফেরার কথা। কিন্তু একটা অনিশ্চয়তার কামড় তোমার মনের মধ্যে তীব্র কাঁটা হয়ে ক্রমাগত খচখচ করেই চলেছে। ওকে কি ভুল সময়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে? সমীরের সঙ্গে যদি সময়ের আগুপিছু হয়ে যায়! তাহলে? একদা তুমি যে সময়ে জন্মেছিলে, বড় হয়েছিলে, স্পষ্টত সেই সময়ে তোমাকে ফেরত পাঠানো হয়নি। চারপাশের সবকিছু তোমাকে চোখে আঙুল দিয়ে সেটা দেখিয়ে দিচ্ছে, তুমি তোমাদের (সমীর আর তোমার) সময়ের চেয়েও অনেকটা অতীতে উজিয়ে চলে এসেছ, প্রায় জনবসতীহীন সেগুনবাগানই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তবে সামান্য একটা আশার আলো তুমি এখনো দেখতে পাও, দুর্ঘটনার পর একই সময়ে, একই সঙ্গে তোমাদের প্রস্থান হয়েছিল, এই জগৎ থেকেই। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই সে অনুযায়ী তোমাদের ফেরার সময়কালও একই হওয়ার কথা। তোমার কাছে এ মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত, বড়জোর পার্থক্য এতটুকু হতে পারে: এখানে না হোক, এই সময়েই সমীরকে হয়তো অন্য কোথাও ফেরানো হতে পারে। তাতে সমস্যা নেই। তুমি ঠিক ওকে খুঁজে বের করে নিতে পারবে।
সমীর ফিরেছে, এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিত। আর তোমার মতো সমীরও নিশ্চয়ই খুঁজছে তোমাকে। তোমায় ছাড়া সমীরের কি নিজেকে কল্পনা করতে পারার কথা! তোমার বেলায় এটা যেমন সত্যি, সমীরের বেলায়ও এটাই সত্যি, সমীরও হয়তো পাগলের মতো খুঁজছে তোমাকে কিংবা তুমি ওর খোঁজে ওদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হবে, সেই অপেক্ষায় আছে। এই চিন্তায় তুমি কদমের গতি আরও বাড়িয়ে দিলে। সমীর ছাড়া এ পৃথিবীতে তুমি থাকবে না। কিছুতেই না।
কারণ, তুমি জানো, আজ, যখন তোমাকে পরিপূর্ণভাবে জাগিয়ে তোলা হলো, সেই পরিচিত কৃত্রিম কণ্ঠটা অদ্ভুত বিষণ্ন গলায় যখন তোমাকে তোমার ফেরার কথা জানাল, তার সব ব্যাখার পর তোমার সামনে দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠল: তুমি ফিরে যাচ্ছ, এটা যেমন সত্যি, তেমনি কোনো কারণে তুমি দুনিয়া ছেড়ে আবার ফিরে যেতে চাইলে তোমার ফেরার পথও খোলা রাখা হয়েছে। তবে সেটা হবে খানিকটা ভিন্ন রকমের ফেরা। তোমাকে আর আগের জায়গায় ফেরানো হবে না। তোমাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে অন্য, আরেক কোনো স্তরে, ভিন্ন আরেক জগতে। এবং সেটাই হবে তোমার শেষ গন্তব্য। ওখান থেকে আর কোথাও যাওয়া যাবে না। ওটাই হবে তোমাদের মতো প্রত্যাগতের স্থায়ী ঠিকানা। তার মানে ওখানে ফেরার অর্থ হল জীবনের শেষ, যতি পড়া? কৃত্রিম কণ্ঠের এটাই ছিল শেষ ব্যাখ্যা, তারপর তোমার সামনের পর্দা অন্ধকার হয়ে যায়।
তারপরও তুমি পেছন থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলে, ‘ওটা কি মৃত্যু, সেই জগৎ কি মৃত্যুজগৎ?’
কোনো জবাব আসেনি।
কিন্তু সে মুহূর্তের দোদুল্যমানতা তোমার মনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তারপরই সমীরের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনায় তুমি উচ্ছল-উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলে। উল্টো চোখ ঠাউরানোর মতো করে তুমি বলেছিল, সমীরকে পেলে এখানে কোন দুঃখে তুমি ফিরবে!
সমীরদের বাড়িটাও নির্মাণাধীন। একতলা উঠেছে, দোতলার ছাদের সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে, সঙ্গে কিছু কড়িবর্গা। তোমার খেলার সাথি মণিমালাদের বাড়িটার জায়গা এখনো ফাঁকা মাঠ মতন, সঙ্গে কিছু ঝোপঝাড়। তার মানে মণিমালারা আসবে আরও পরে। থমকে দাঁড়ালে তুমি। বুক ঢিপ ঢিপ করা ফিরে এল আবার, প্রতি পদক্ষেপে তা প্রবল থেকে আরও প্রবলতর হতে থাকল। সন্ধ্যা বাতি জ্বলছে বাড়িটায়, তীক্ষ্ণ চোখ করে তাকিয়ে রইলে তুমি। এই বুঝি সমীর বেরিয়ে এল।
সমীর বেরিয়ে এল ঠিক। দীর্ঘ একটা ছায়া।
এবং আমূল চমকালে তুমি। তোমার সমীর। সমীরই তো! মাত্র কয়েক হাত দূরে!
সমীরের সেই বড় বড় পা ফেলে হাঁটার ভঙ্গি, একটু পর পর ডান হাতে কপালের চুল সরানো...সবই সে রকম আছে। এবার প্রায় ছুটতে শুরু করলে তুমি।
বাড়ির চারপাশটা বাঁশ আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ঢোকার জন্য সামনে কয়েক হাত দৈর্ঘ্যের একটা কাঠের গেট।
কাঠের হুড়কো খুলে প্রায় নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকলে। সমীরকে তুমি চমকে দেবে। ভীষণ চমকে দেবে। ঠিক তখুনি! দেখলে আরেকটা ছায়া ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। এক নারীমূর্তি। সে এসেই পেছন থেকেই জড়িয়ে ধরল সমীরকে। তারপর খিল খিল করে একটা হাসির শব্দও কানে এল তোমার । সমীর ঘুরে দাঁড়িয়েছে, দেখলে। এখন কি সে মেয়েটার দিকে ঝুঁকবে? মেয়েটার হাসি আরও উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। আর সহ্য হলো না তোমার।
এই হাসি তোমার চেনা। সেই কালো মেয়েটা।
ফুলবাড়িয়ার রেলস্টেশনটা এই রাতে একদম সুনসান। টিনশেডের এক কোণে একটা স্বল্প পাওয়ারের বাতি জ্বলছে শুধু। একটা কালো ট্রেন ঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার গায়ে মেখে, পেছনে সার সার বগি।
সেগুনবাগান থেকে প্রায় আচ্ছন্নের মতো ছুটে এসেছ তুমি। রাত কতখানি হয়েছে, কোনো হিসাব নেই তোমার। ঘোরগ্রস্তের মতো শুধু ছুটেছই। ছুটতে গিয়ে গায়ের বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, দুবার হোঁচট খেয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল উল্টে ফেলেছ। এখন, এখানে এসে থামার পর তোমার ব্যথা-বেদনা সব ফিরতে শুরু করেছে। তবে এখন আর কান্না আসছে না। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। ভেতরটা শুধু হাহাকারের মতন ফাঁকা।
ফিরতে চাইলে এটাই কৃত্রিম কণ্ঠের নির্দেশিত ট্রানজিট পয়েন্ট। এখানে এক ইঞ্জিনের একটা স্টিম কারকে খুঁজে বের করতে হবে তোমাকে। আগামী সাত দিন এটা কিছু সময় পরপর বিরতি দিয়ে ফিরতি যাত্রী বয়ে নিয়ে যাবে, ওয়ান ওয়ে টিকিটের যাত্রী—যে গন্তব্য থেকে ওই যাত্রীর আর কোনো দিন পৃথিবীতে ফেরা হবে না।
কালো রেলগাড়িটাকে পেরিয়ে আসার পরপরই, এপারে আড়াআড়ি একটা সিঙ্গেল ট্র্যাকের ওপর স্টিম ইঞ্জিনটাকে দেখতে পেলে। অন্ধকারেই ওটার মিশমিশে ধাতব কালো গা যেন অপার্থিব কোনো বস্তুর মতো ঝলসাচ্ছে। চকচকে লোহার পাতের মতো একটা ঝিলিক কোত্থেকে যেন ওটার গায়ে এসে পিছলে পড়ে পড়ে নেমে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। বিদ্যুৎ! তক্ষুনি তুমি টের পাও, তোমার শরীর যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে আসছে। টানা ছোটার ধকল শরীর আর সইতে পারছে না। মন বিবশ হয়ে আছে অনেক আগেই, এবার শরীরও তোমার সেই অসাড়তার কাছে আত্মসমর্পণ করল। রেললাইনের ওপরেই বসে পড়লে তুমি হাত-পা ছড়িয়ে।
বিদায় কখনো এত তীব্র হয়, কিংবা এত করুণ!
তোমার মনে হলো একবার বিলাপ করে যদি কাঁদতে পারতে!
কতক্ষণ এ রকম নিঃসাড়, নিঝুম হয়ে বসে ছিলে, মনে নেই তোমার । একটা কণ্ঠে তোমার আচমকা সংবিৎ ফিরল, প্রায় ধড়মড়িয়ে উঠে বসলে তুমি।
‘একটা কৌতুক অনেকক্ষণ ধরে বলব বলে অপেক্ষা করছি! বলব?’
হাসলে তুমি। এ রকম হাসি তুমি কোনো দিন হাসোনি। হু হু করে কান্না আর হাসি একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে শুরু করল তোমার।