প্রকৃতির ভাষা বুঝতে হলে, গণিতের ভাষা বুঝতে হবে —মুস্তাফা আমিন, মহাকাশবিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফা আমিন একজন স্বনামধন্য মহাকাশবিজ্ঞানী। তাঁর প্রধান গবেষণার বিষয় ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু। এই অদৃশ্য ও রহস্যময় পদার্থ কীভাবে কাজ করে, সেটাই তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন। ডার্ক ম্যাটারের ভর, চার্জ এবং স্পিন নিয়ে তাঁর বেশ কিছু গবেষণা রয়েছে। ড. আমিন বিশ্বাস করেন, ডার্ক ম্যাটার কণা সম্ভবত তরঙ্গের মতো আচরণ করে। ভারতের সুরাটে জন্মগ্রহণ করা ড. আমিন পড়াশোনা শুরু করেন স্থাপত্য নিয়ে। পরে তাঁর আগ্রহ বদলে যায় এবং তিনি পদার্থবিজ্ঞানে মনোযোগ দেন। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি এবং কেমব্রিজে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন তিনি। বিজ্ঞান যাত্রায় স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং তাঁর পিএইচডি উপদেষ্টা রজার ব্ল্যান্ডফোর্ড ছিলেন বড় অনুপ্রেরণা। বৈবাহিক সূত্রে ঢাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুল বাড্ডা টকস ইন ম্যাথ অ্যান্ড ফিজিকস নামে বৈজ্ঞানিক আলাপে অংশ নিতে এসে তিনি মুখোমুখি হন বিজ্ঞানচিন্তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদ হোসেন

বিজ্ঞানচিন্তা:

আজকের অনুষ্ঠানের বিষয় ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু। এই অনুষ্ঠান নিয়ে আপনার পরিকল্পনা এবং কেন আপনি এই বিজ্ঞান বক্তৃতা সিরিজে অংশ নিচ্ছেন, সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

ড. আমিন: আমাকে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করেছেন আমার এক সহকর্মী নাবিল ইকবাল। এমআইটিতে পোস্টডক করার সময় আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি তখন সেখানে স্নাতক শিক্ষার্থী ছিলেন। আমি জানতাম, নাবিল বাংলাদেশের মানুষ। আমি যখন বাংলাদেশে আসি, তখন তাঁকে ইমেইল করে এখানকার কিছু মানুষের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা বলি। তিনি আমাকে হাসিব স্যারের (প্রফেসর সৈয়দ হাসিবুল হাসান চৌধুরী, গণিত বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। হাসিব স্যারের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁরা জানতে চান, আমি এখানে এসে বক্তৃতা দিতে আগ্রহী কি না।

বিষয়টি আমার জন্য দারুণ ছিল। শিক্ষার্থীরা এই বিজ্ঞান বক্তৃতা সিরিজটি আয়োজন করছে, যা সত্যিই চমৎকার উদ্যোগ। আমি তাদের আগের অনলাইন অনুষ্ঠানগুলো দেখেছি। আমার কাছে সেটা অসাধারণ বলে মনে হয়েছে। আমি এখানে বক্তৃতা দিতে পেরে খুবই আনন্দিত। আমার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। বাংলাদেশে আমার শ্বশুরবাড়ি থাকায় আমি প্রায়ই এ দেশে আসি। আমি জানতে চাই, এখানে কী গবেষণা চলছে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কী নিয়ে কাজ করছেন।

বিজ্ঞানচিন্তা:

এই বিজ্ঞান বক্তৃতা তো ডার্ক ম্যাটার নিয়ে। এ সম্পর্কে বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় ও সংক্ষেপে কিছু বলুন।

ড. আমিন: ১৯৩০-এর দশক থেকে আমরা জানি—আপনি, আমি এবং নক্ষত্রের মতো সবকিছু যে পদার্থ দিয়ে গঠিত, তা মহাবিশ্বের মোট ভরের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আসলে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ পদার্থই এমন কিছু, যা আমরা দেখতে পাই না। এই অদৃশ্য পদার্থকেই আমরা ডার্ক ম্যাটার বলি। ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি আমরা অন্য মহাজাগতিক বস্তুর নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারি।

১৯৩০ সালে ফ্রিটৎ জুইকি নামে এক বিজ্ঞানী বিভিন্ন গ্যালাক্সির চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরকে ঘিরে কীভাবে ঘুরছে, সেটা দেখছিলেন। সেখানে তিনি লক্ষ্য করেন, গ্যালাক্সিগুলোর গতি অস্বাভাবিকভাবে অনেক বেশি। এই গতির ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারছিলেন না। কেন এত দ্রুত গ্যালাক্সিগুলি ঘুরছে, তা জানতেন না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি একটা ধারণা দেন। তাঁর মতে, সেখানে আরও এমন কিছু পদার্থ থাকতে হবে, যেগুলো গ্যালাক্সিগুলোকে এত দ্রুত চলতে বাধ্য করছে। তিনি সেই পদার্থ দেখতে না পেলেও এর নাম দেন ডার্ক ম্যাটার।

অনেক বছর পর, আরও দেখা যায়, গ্যালাক্সির বাইরের অঞ্চলগুলোতে মহাজাগতিক বস্তুগুলো খুব দ্রুত গতিতে চলছে। আমাদের মহাকর্ষের ধারণা এবং আমরা যা দেখতে পাই, তার ভিত্তিতে এই আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। আবারও বিজ্ঞানীদের অনুমান করতে হলো যে সেখানে আরও অদৃশ্য পদার্থ থাকতে হবে। সেগুলোই এসব বস্তুকে এত দ্রুত নড়াচড়া করতে বাধ্য করছে। এই অদৃশ্য পদার্থটিই হলো ডার্ক ম্যাটার।

আমরা দেখেছি, আলো যখন খুব ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে চলে, তখন তার গতিপথ কিছুটা বেঁকে যায়। সেটা ঘটে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী। আমরা পদার্থটি দেখতে পাচ্ছি কি না, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা যদি আলোর বাঁক দেখি তাহলে আমরা অনুমান করতে পারি, সেখানে অন্য কোনো পদার্থ আছে। একে বলা হয় মহাকর্ষীয় লেন্সিং। মহাবিশ্বের দিকে তাকালে আলোর এই বক্রতা অনেক জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু আলোর এই বক্রতার পেছনের কারণ যে পদার্থটি, তা আমরা দেখতে পাই না। সেই অদৃশ্য পদার্থটিকে ডার্ক ম্যাটার বলা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা মহাবিশ্বের প্রথম পরমাণু গঠিত হওয়ার সময়ের আলো এখনও দেখতে পারি। এই আলোকরশ্মিকে বলা হয় কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড। এই আলোতে কিছু বিশেষ প্যাটার্ন দেখা যায়। এই প্যাটার্ন আজ আকাশে আমরা যা দেখি, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার জন্য আমাদের আবারও ধরে নিতে হবে যে সাধারণ পদার্থের বাইরেও আরও অনেক পদার্থ আছে। সেসব আমরা দেখতে পাই না। কারণ সেগুলো আলোর সঙ্গে কোনোভাবে মিথস্ক্রিয়া করে না। এসব অদৃশ্য পদার্থই হলো ডার্ক ম্যাটার।

সবশেষে, ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ডার্ক ম্যাটার একটি বাস্তব পদার্থ। এটি কোনো পরীক্ষা বা কিছু পর্যবেক্ষণের ফল নয়। সব বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, এমন পদার্থ আসলেই আছে। আমরা হয়তো এটি দেখতে পারি না। তবে এই পদার্থ পরমাণু দ্বারা গঠিত হতে পারে না। ডার্ক ম্যাটার যদি পরমাণু দ্বারা গঠিত হতো, তাহলে প্রথম পরমাণু গঠিত হওয়ার সময় থেকেই এর আলো আমাদের কাছে ভিন্ন ধরনের হতো।

বিজ্ঞানচিন্তা:

তাহলে আপনি কি এই ধরনের পদার্থকে অদৃশ্য পদার্থ বা অন্য কিছু বলেন?

ড. আমিন: আমার মনে হয়, সাধারণত আমরা এই পদার্থটিকে ডার্ক ম্যাটার বলেই চিনি। যতদূর আমরা জানি, এটি আলোর সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়া করে না। তাই এটি প্রায় অদৃশ্য।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার নিজের সম্পর্কে বলুন।

ড. আমিন: আমার জন্ম ভারতের গুজরাটের সুরাট শহরে। সেখানে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। এরপর ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসি। প্রথমদিকে আমার স্নাতক বিষয় নিয়ে খুব অনিশ্চিত ছিলাম। এরপর আমি স্থাপত্যবিদ্যায় পড়া শুরু করি। শিল্পকলা ও স্কেচিংয়ের প্রতি আগ্রহী হওয়ায় স্থাপত্যবিদ্যা বেছে নিয়েছিলাম।

কিন্তু কলেজে প্রথম দিনে কী ক্লাস নেব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তখন একজন আমাকে পরামর্শ দেন কোনো একজন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলার জন্য। তিনি অনেক বিষয় জানতেন এবং তিনি ছিলেন বাঙালি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—আমি কি পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী? সে বিষয়ে আমি খুবই কম জানতাম। তবে তিনি বললেন, আমি যদি তাঁর পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস করি, তাহলে গ্রীষ্মকালীন সময়ে চেক প্রজাতন্ত্রে একটি বিদেশি প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারব। ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এমন একটি বিনামূল্যের সুযোগ লোভনীয় ছিল। তাই আমি বললাম, ‘অবশ্যই, আমি এই ক্লাস করব।’

এভাবেই আমি পদার্থবিজ্ঞানে পড়া শুরু করি। যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় আমার কোনো স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল না। তবে, সেই বিদেশে যাওয়ার সুযোগটা ছিল একরকম প্রলুব্ধকর, একরকম ঘুষের মতো। সেটিই আমাকে পদার্থবিজ্ঞানের দিকে নিয়ে এসেছে।

এরপর আমি আমার স্নাতক পড়ার সময় ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটনে গবেষণা শুরু করি। সেখানে ক্লাস ও গবেষণায় ভালো করার পর পিএইচডি করতে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যাই। তখন আমি জানি, আমাকে কী করতে হবে। স্ট্যানফোর্ডে আমার ভবিষ্যৎ তত্ত্বাবধায়ককে মজার মনে হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, তাঁর সঙ্গে কাজ করাটা আনন্দদায়ক হবে।

স্ট্যানফোর্ড থেকে পিএইচডি শেষ করার পর এমআইটিতে প্রথম পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ করি। তারপর যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে করি দ্বিতীয় পোস্টডক। এরপর আবার টেক্সাসে রাইস ইউনিভার্সিটিতে ২০১৫ সালে শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসি।

আমি হাইস্কুলে পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলাম, কিন্তু তখন জানতাম না যে শেষপর্যন্ত এটাই আমার পেশা হবে। আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি আংশিকভাবে আগ্রহী ছিলাম। আমার বড় ভাই আমাকে একবার বলেছিল, পদার্থবিজ্ঞান কঠিন। ছোট ভাই হিসাবে আমি এ বিষয়ে আরও ভালো করতে চেয়েছিলাম।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার শৈশবের কোনো স্মৃতি আছে, যা আপনাকে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হতে উৎসাহিত করেছিল?

বিজ্ঞানচিন্তা হাতে মহাকাশবিজ্ঞানী মুস্তাফা আমিন
ফাইল ছবি

ড. আমিন: কিছু ব্যাপার আমার এখনরও মনে আছে। যেমন আমি যখন ছোট, তখন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয়, আমি জীববিজ্ঞানে কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। আমার মা ডাক্তার। আমার ভাইও ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাইনি, কিন্তু জীববিজ্ঞানে কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। কারণ এই বিষয়টি উপভোগ করতাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নিয়ে পড়াশোনা করিনি।

সম্প্রতি আমার একটি স্মৃতি মনে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। নাম গ্রেট আমেরিকান এক্লিপস। তখন আমার শৈশবের একটা স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছিলাম। আমার শহরেও একটি সূর্যগ্রহণ হয়েছিল, যদিও সেটি পূর্ণগ্রাস ছিল না। মনে পড়ে, এক বন্ধুর সঙ্গে ওয়েল্ডিং গ্লাস দিয়ে সেবার সূর্যগ্রহণ দেখেছিলাম। ব্যাপারটায় আমি খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। জানি না, সেই স্মৃতি আমাকে বিজ্ঞানী হতে উৎসাহিত করেছিল কি না।

সম্ভবত ভারতের শিক্ষকেরা আমাকে আরও শিখতে উৎসাহিত করেছিলেন। আমি যখন উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিলাম, তখন শিক্ষকদের অনেক প্রশ্ন করতাম। কিছু শিক্ষক খুব ধৈর্যশীল ছিলেন, তাঁরা উত্তর দিতেন। তখন আমি জানতাম না যে পদার্থবিজ্ঞান একটি প্রধান বিষয়। জীববিজ্ঞানে যে প্রশ্নগুলো করতাম, তার অধিকাংশ উত্তর ছিল রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে। পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরগুলো আমার কাছে সন্তোষজনক মনে হতো। আমার মনে হয়েছিল, আমরা মানুষ হিসেবে এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারি, যা পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। পদার্থবিজ্ঞান আমাকে কেবল বিস্মিত করেছিল। তখন পদার্থবিজ্ঞান আমার জন্য শুধু কৌতূহল ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এসে বুঝতে পারলাম, পদার্থবিজ্ঞান এমন কিছু, যেখানে আমি পেশা হিসেবে কাজ করতে পারি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার কি শৈশবের কোনো নায়ক বা কোনো বৈজ্ঞানিক লেখক আছেন, যাঁদের কাছ থেকে আপনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন?

ড. আমিন: আমি কারো কথা মনে করতে পারছি না। বড় হওয়ার সময় জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। খুব ভালো ছাত্র ছিলাম আমি। তখন শুধু ক্লাসে প্রথম হতে চাইতাম। অন্য কোনো কারণ ছিল না। তখন আমার ওপর কোনো নির্দিষ্ট লেখকের প্রভাব ছিল না। তবে আমি একটি টিভি শো দেখতে খুব ভালোবাসতাম। বিজ্ঞানবিষয়ক অনুষ্ঠানটি রোববার প্রচার করা হতো। অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করতাম। সেই আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা আমাকে পুরোপুরি মুগ্ধ করত। আমার মনে আছে, এমন কিছু পর্বে রোবট বা আণুবীক্ষণিক চিত্র দেখানো হতো। সেসব আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করত।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার কি কোনো প্রিয় বিজ্ঞানী বা উদ্ভাবক আছেন?

ড. আমিন: অবশ্যই। সম্প্রতি মারা গেছেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁকে আমি সত্যিই শ্রদ্ধা করতাম। তিনি স্টিভেন ওয়াইনবার্গ। স্নাতক পড়ার সময় তাঁর ড্রিমস অব আ ফাইনাল থিওরি বইটি পড়েছিলাম। বইটি আমার ওপর অনেক বড় প্রভাব ফেলেছিল। তখন আমি পরীক্ষামূলক কণা পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় কাজ করছিলাম। তাই অনুভব করেছিলাম, আমি এমন কিছু আবিষ্কার করার অংশ, যা মানবজাতির বিশাল প্রচেষ্টার ফল। বইটি পড়ে আমি সত্যিকারের আবেগ অনুভব করেছিলাম। তিনি শুধু বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারী, ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিকও ছিলেন। তিনি তাঁর চিন্তাভাবনার মাধ্যমে আমাকে সত্যিই প্রভাবিত করেছিলেন।

আমার পিএইচডি উপদেষ্টা রজার ব্ল্যান্ডফোর্ডের কথাও বলতে চাই। আমার ওপর অনেক বড় প্রভাব ফেলেছিলেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি, কোনো গণনা না করেই উত্তর বের করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। তিনি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে থাকতেন না, বরং সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। সবাইকে সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। প্রথম বর্ষের ছাত্র হোক বা নোবেলজয়ী, সবাই তাঁর কাছ থেকে সমান সম্মান পেয়েছে বলে আমার মনে হয়। আমি তাঁর কাছ থেকে অন্যকে সম্মান দেওয়া শিখেছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

বর্তমানে কী নিয়ে গবেষণা করছেন?

ড. আমিন: বর্তমানে আমি যেসব বিষয় বোঝার চেষ্টা করছি, তার মধ্যে একটি হলো ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি কেমন। এই ডার্ক ম্যাটার আসলে কী? আমরা জানি এই পদার্থটা আছে, কিন্তু আসলে এটা কী, তা জানি না। এই পদার্থটা যদি কণা হয়, তাহলে সেই কণার ভর কত? তাদের চার্জ কত? কণাগুলোর ঘূর্ণন কী? আমরা এখনও এসবের কিছুই জানি না।

আমার বর্তমান গবেষণা এখন এই বিষয়গুলো বের করার ওপর কাজ করছে। আমি যে বিষয়টি নিয়ে উৎসাহী, তা হলো ডার্ক ম্যাটারের কণা এতই হালকা যে ডার্ক ম্যাটার তৈরি করতে আমাদের অনেক কণার প্রয়োজন। এই কণাগুলো একে অপরের এতই কাছে থাকে যে, এটি প্রায় একটি তরঙ্গের মতো মনে হয়। এটি পৃথক কণা নয়, বরং তরলের মতো আচরণ করে। ডার্ক ম্যাটার এভাবে আচরণ করে। তাই আপনি গ্যালাক্সির অবস্থান বা নক্ষত্রের নড়াচড়ার প্রেক্ষিতে এটি দেখতে পারেন। আমরা চেষ্টা করছি, এই ধারণা ব্যবহার করে ডার্ক ম্যাটার কণার ভর কী, তা বুঝতে।

ডার্ক ম্যাটারের স্পিন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা এমন কিছু, যা নিয়ে আমরা সম্প্রতি কাজ করছি। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ থেকে ডার্ক ম্যাটারের স্পিন সম্পর্কে কিছু জানা যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি, আদি মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার যেভাবে উৎপন্ন হয়েছিল, তা আজ মহাবিশ্বে এর অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।

বুঝতেই পারছেন, আমি আসলে এখন ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধান কিংবা বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি বা অন্যান্য মহাবিশ্বের মাধ্যমে মানব অন্বেষণ সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?

ড. আমিন: আমার মতে, মানবজাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, আমরা সবসময়ই অভিযাত্রী ছিলাম। আমরা সবসময় আরও বেশি কিছু জানতে চেয়েছি, আরও বেশি কিছু জানার চেষ্টা করেছি। এই অদম্য কৌতুহলই আমাদেরকে আফ্রিকা ছেড়ে এই পৃথিবী অন্বেষণ শুরু করিয়েছিল। আবার সেটাই আমাদের শেষ পর্যন্ত চাঁদে নিয়ে গেছে। আমি মনে করি, মঙ্গলগ্রহে যাওয়া আমাদের জন্য একটি স্বাভাবিক পরবর্তী পদক্ষেপ।

আমরা মঙ্গলে যেতে চাই বৈজ্ঞানিকভাবে মঙ্গলকে বোঝার জন্য। অবশ্য মানবজাতির সেখানে যাওয়া প্রয়োজন কি না, তা আমার জানা নেই। মানুষ হিসেবে, আমি মনে করি আমাদের অন্বেষণ চালিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৈজ্ঞানিকভাবে রোবট পাঠানো কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরও সাশ্রয়ী। তবে আমি মনে করি না, মঙ্গলে একটি রোবট পাঠানো মানুষের কল্পনাকে ততটা আকর্ষণ করে, যতটা একজন মানুষের সেখানে যাওয়ার ঘটনা করে। যদি মানুষের সেখানে যাওয়া নিরাপদ হয়, একটি বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য থাকে, তাহলে আমি মনে করি মঙ্গলে যাওয়া আর এমন অন্বেষণ করা সার্থক।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আমরা এখন দেখতে পাই, বিজ্ঞান দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য রয়েছে। রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হতে চাইছে। আপনি এ বিষয়টি নিয়ে কী মনে করেন? বিজ্ঞানীদের মধ্যকার সহযোগিতা সামগ্রিকভাবে মানব মনের অন্বেষণ বা মানব উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় কি?

ড. আমিন: ঐতিহাসিকভাবে আমরা এমন অনেক কিছু দেখেছি। বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা বলা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিজ্ঞানীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। যুদ্ধের কিছুক্ষণ পরেই বা আগে সহযোগিতা স্থাপনের জন্য কথা বলেছেন। রাজনীতিবিদেরা যুদ্ধ করলেও বিজ্ঞানীরা তখনও কাজ করতেন। একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো, জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের তত্ত্বকে তখন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন সবচেয়ে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন। আইনস্টাইনের ভাবনাকে জনপ্রিয় করে তোলেন তিনিই। যুদ্ধ শেষে তাঁরা এক হয়েছিলেন। আইনস্টাইনের তত্ত্ব যাচাই করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন এডিংটন। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এমনটা দেখা যায়। অনেক বিজ্ঞানী অস্ত্রশস্ত্র তৈরিতে জড়িত ছিলেন, তবে অনেক মানুষ বিজ্ঞানের সহযোগিতার ধারণাটি ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

শিল্পের মতোই বিজ্ঞান দেশভিত্তিক জাতীয় সীমানা, ধর্মীয় সীমানা বা জাতিগত সীমানা দেখে না। বিজ্ঞানই একমাত্র অনন্য উপায়, যার মাধ্যমে আমরা এমন উত্তর খুঁজে পেতে পারি, যা নিয়ে সবাই একমত হবে। আপনি কে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; আপনি যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে আপনার সিদ্ধান্ত সবাই গ্রহণ করবে। বিজ্ঞান কোনোভাবেই কোনো পার্থক্য দেখে না। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা কোথা থেকে এসেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমার মতে, বিজ্ঞান এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগে সমস্যা ছিল আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। এখন, এটি কোনো সমস্যা নয়। আমাদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য রয়েছে এবং এটি আমাদের হাতের মুঠোয়। সমস্যা হলো, সত্য ও মিথ্যা জিনিসের মধ্যে কীভাবে পার্থক্য করা যায়, তা জানা। সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা আমাদের সত্য ও মিথ্যাকে আলাদা করতে সাহায্য করে।

আমাদের একসঙ্গে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করা উচিত। আমাদের অনেক প্রকল্প করতে হবে। এক না হয়ে বিজ্ঞানের কাজ করা যায় না। ইউরোপের সার্নের দিকে তাকান, অনেক দেশ ও জাতি একসঙ্গে মিলেছে সেখানে গবেষণার জন্য। বড় টেলিস্কোপগুলোর দিকে তাকান। অনেক দেশ একসঙ্গে এসব স্থাপন করার কাজে নিয়োজিত। আমরা একসঙ্গে এসব কাজ করি, কারণ তখন এগুলো একটি মানব প্রচেষ্টা। যখন বাংলাদেশের কেউ আকাশের দিকে তাকায়, তখন আমার মনে হয় না আকাশ আমেরিকানদের জন্য আলাদা। আমরা সবাই একই নক্ষত্র দেখি। আমরা সবাই একই জিনিস বোঝার চেষ্টা করি। তাহলে কেন আমরা শক্তি একত্রিত করে একসঙ্গে কাজ করব না? বিজ্ঞান এমন কিছু, যা সত্যিই আমাদের একত্রিত করতে পারে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আমাদের বেশিরভাগ পাঠক তরুণ। তাদের জন্য কিছু বলুন।

ড. আমিন: তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য আমি বলব, শুধু আপনার কৌতূহল অনুসরণ করুন। আপনি যদি কোনো বিষয়ে আগ্রহী হন, সে সম্পর্কে আরও জানুন। প্রশ্ন করুন। আপনি যদি এটি না বোঝেন, তার মানে এই নয় যে আপনি যথেষ্ট জানেন না। বরং        এর মানে হলো, আপনি হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যা করার জন্য সঠিক ব্যক্তিকে খুঁজে পাননি। অথবা হয়তো এমন কিছু, যা অজানা। আপনিই হয়তো প্রথম ব্যক্তি হবেন, যিনি তা আবিষ্কার করবেন। তাই আপনার কৌতূহল অনুসরণ করুন।

যেসব শিক্ষার্থী বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানে আসতে আগ্রহী, তাদের জন্য আমি বলব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গণিতে আরও ভালো হোন। কারণ গণিত হলো প্রকৃতির ভাষা। প্রকৃতির ভাষা বুঝতে হলে, গণিতের ভাষা বুঝতে হবে। আপনাকে সেই ভাষা শিখতে হবে। তাই আমি বলব, গণিত শিখুন, গণিতে ভালো করুন।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার শখ সম্পর্কে বলুন।

মহাকাশবিজ্ঞানী মুস্তাফা আমিন
ফাইল ছবি

ড. আমিন: আমি খুব ছোট ছিলাম। আমার মনে হয়, আমার মা লক্ষ্য করেছিলেন, শিল্পকলা সম্পর্কে আমার কিছু প্রতিভা আছে। তিনি সপ্তাহ শেষে আমাকে এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যেতেন। তখন আমি সম্ভবত দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম। সেই ব্যক্তির বাড়িতে আমাকে সকালে নামিয়ে দিতেন এবং সন্ধ্যা ৫টা বা ৬টার দিকে আমাকে নিতে আসতেন। তখন আমি ছবি আঁকতাম। আমার মা ছিলেন ডাক্তার। আমার বাবার রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি ছিল। তিনি কারখানায় কাজ করতেন।

মা যখন আমাকে সেখানে নামিয়ে দিতেন, আমি খুব ছোটবেলা থেকেই সেই শিল্পীর কাজ দেখেছি। তিনি শিক্ষার্থীদের যা শেখাতেন, তা দেখে দেখে আমি শিখেছিলাম। তিনি আমাকে কী করতে হবে, তা শেখানোর জন্য কখনও পেন্সিল হাতে দেননি, কিন্তু আমি পর্যবেক্ষণ করে শিখেছি। আমি সারা জীবনই শিল্পকলা পছন্দ করি। আমি এখনও ছবি আঁকি। আমি যখন ভ্রমণ করি, তখন স্কেচ করি। কোথাও গেলে ছবি আঁকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণের সময় আমি কার্জন হলের একটি স্কেচ করেছিলাম। ভবনটি সুন্দর ছিল।

আমি স্কেচ করতে উপভোগ করি। স্কেচ করায় বিজ্ঞানেও বড় ভূমিকা পালন করে। আমাকে দৃষ্টিভঙ্গিমূলক চিন্তাবিদ বলা যায়। আমার মনে হয়, যতক্ষণ না উত্তরটি কেমন দেখায়, তা স্কেচ করতে পারি, ততক্ষণ আমি সমস্যাটি বুঝি না। আমি আসলে দৃশ্যনির্ভর চিন্তা করি। আমি যখন শেখাই, তখন আমি অনেক গ্রাফ ব্যবহার করে শেখাই। আমি এভাবেই চিন্তা করি। আমার সবসময় মনে হয়েছে, শিল্পকলায় আমার কিছু সহজাত প্রতিভা ছিল। তবে আমি এতে ততটা ভালো নই।