গাজীপুরে দেশের প্রথম মানমন্দির

গাজীপুরের শ্রীপুরে বেনুর ভিটায় স্থাপন করা হলো দেশের প্রথম মহাকাশ মানমন্দির। মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক শাহাজাহান মৃধার ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি এই মানমন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের একটি টেলিস্কোপ। দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থীরা চাইলে এখান থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন

এ অঞ্চলের মহাকাশচর্চার ইতিহাস আজকের নয়। প্রাচীন যুগেই বিকশিত হয়েছিল প্রাচীন ভারতের জ্যোতির্বিদ্যা। ব্রিটিশ ভারতে বেশ কয়েকটি আধুনিক মানমন্দির স্থাপিত হয়। সেগুলোর সবই হয় দক্ষিণ, নইলে পশ্চিম ভারতে। অথচ সে সময় গোটা ভারতের রাজধানী ছিল এ বাংলাতেই—কলকাতায়। তবু কেন এ এলাকায় মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তার কারণ যতটা না রাজনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক, তার চেয়েও বেশি ভৌগোলিক। মানমন্দির স্থাপনের বেশ কয়েকটি শর্তের প্রধানতম হলো পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত আকাশ। তা ছাড়া সে সময় এ যুগের মতো এত উন্নত টেলিস্কোপও ছিল না। কিন্তু দিন বদলেছে, ব্রিটিশরা পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে গেছে বহু আগেই। এরপর পাকস্তানি শাসন–শোষণে নিজেদের কোনো মানমন্দির থাকবে—এ স্বপ্ন খুব কম মানুষই দেখেছেন। এরপর আন্দোলন–স্বাধীনতা, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নিজের পায়ে দাঁড়াতে অনেক সময় চলে গেছে। এত দিনে বোধ হয় দেশ প্রস্তুত একটা মানমন্দির ধারণ করার জন্য। সরকারি একটা ঘোষণাও হয়েছে, কাজ শুরু হতে আরও কিছুদিন লাগবে বোধ হয়। তবে বেসরকারি উদ্যোগে একটা মানমন্দির স্থাপনের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সেটি স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় বাঘের বাজারে, বেনুর ভিটায়। একটা ১৪ ইঞ্চি মিড ক্যাসিগ্রেইন টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয়েছে সেখানে। চলছে মহাকাশ পর্যবেক্ষণও। ভবিষ্যতে এখানে অত্যাধুনিক ১০০ ইঞ্চি ব্যাসের রিফ্লেক্টর রেডিও টেলিস্কোপ সংযুক্ত করার কথাও ভাবনায় আছে বলে জানিয়েছেন এর প্রতিষ্ঠাতা।

এ মানমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা ও মহাকাশবিষয়ক সংগঠক শাহজাহান মৃধা, যিনি বেনু নামে পরিচিত। শাহজাহান মৃধার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় নির্মিত এ অবজারভেটরির মূল অবকাঠামো ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে তরুণ গবষকেরা এখানে বসে কাজ করতে পারবেন। দেশি–বিদেশি বিখ্যাত গবেষকদেরও এই মানমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মানমন্দির পরিদর্শন করেছেন জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক ড. দীপেন ভট্টাচার্য, অক্সফোর্ড সেন্টার ফর অ্যানিমেল এথিকসসের ফেলো ড. রেইনার এবার্ট ও মহাকাশ গবেষক ড. মাকসুদা আফরোজ। মানমন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মৃধা বেনুও তখন উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া মহাকাশ গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, গ্রন্থাগার ও থাকার সুব্যবস্থা থাকবে। অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির জন্য থাকবে নানা সুযোগ–সুবিধা। জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আর্চারি, মাউন্টেনিয়ারিং ও উড্ডয়নবিদ্যার প্রশিক্ষণের সুযোগ–সুবিধাও থাকবে এখানে।

কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে এ মানমন্দির স্থাপন করার ভাবনা কাজ করেছিল, সে কথা জানতে চেয়েছিল বিজ্ঞানচিন্তার টিম। শাহজাহান মৃধা জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মহাকাশের প্রতি আকর্ষণ ছিল। ছোট ছোট টেলিস্কোপ কিনে ব্যক্তিগতভাবে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু করেন তিনি। কিন্তু পর্যবেক্ষণ আরও বিস্তৃত করতে একটা অবজারভেটরি বা মানমন্দিরের অভাব অনুভব করেন। ১৯৯০–এর দশকে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের পরিচালক খান মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তারপর উদ্যোগ নেন বিজ্ঞান জাদুঘরের ছাদে মানমন্দির স্থাপনের। আসলে এক হিসাবে সেটাই ছিল দেশের প্রথম অবজারভেটরি। সেখানে একটি ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপ স্থাপন করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু করা হয়। কিন্তু এটা বেশি দিন সচল রাখা যায়নি। তা ছাড়া অবজারভেটরির ডোমও ছিল অনেক ছোট। তাই আরও বড় টেলিস্কোপ সেখানে স্থাপন করা কঠিন।

সে সময় শাহজাহান মৃধা ব্যক্তি উদ্যোগে একটি মানমন্দির নির্মাণের কথা ভাবেন। প্রায় দুই দশক পর সেটি অবশেষে সত্যি হলো। রীতিমতো পর্যবেক্ষণ শুরু হয়ে গেছে বাঘের বাজারের এই মানমন্দিরে। কিন্তু কেন এটা গাজীপুরেই স্থাপন করা হলো, ভৌগোলিকভাবে এর গুরুত্ব কতখানি। এ বিষয়ে শাহজাহান মৃধা বলেন, ‘আসলে এখানে অনেক আগে থেকেই আমরা অ্যাস্ট্রোক্যাম্প করি। ছেলেমেয়েরা টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে। এখানকার রাতের আকাশ অনেক পরিষ্কার, বাতাসে ধুলাবালু প্রায় নেই বললেই চলে। আলোকদূষণ কিংবা উঁচু বিল্ডিং নেই আকাশ পর্যবেক্ষণ বাধা দেওয়ার জন্য।’

এখানে এখন গাজীপুর জেলার বিভন্ন স্কুলের শিক্ষকদের পার্টটাইম নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে সহজেই এখানে কর্মস্থল কিংবা বাসার কাজের ফাঁকে চলে আসতে পারেন। তাঁদের টেলিস্কোপ পরিচালনা ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। থাকবে মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থাও। তাঁরা নিয়মিত এসে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করবেন এবং ডেটা নোট করবেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণের ফল পাঠানো হবে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন—আইএইউর সঙ্গে যৌথভাবে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে এই অবজারভেটরি। এ ছাড়া প্রবাসী দুই মহাকাশবিজ্ঞানীর সহযোগিতা পাচ্ছেন—যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজের অধ্যাপক, নাসার সাবেক গবেষক ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী দীপেন ভট্টাচার্য ও মহাকাশ গবেষক ড. মাকসুদা আফরোজের। এ ছাড়া অক্সফোর্ড সেন্টার ফর অ্যানিমেল এথিকসের ফেলো রেইনার এবার্টও ঘুরে গেছেন এই মানমন্দির থেকে।

মানমন্দির নির্মাণের সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। বসেছে টেলিস্কোপও। শিক্ষার্থীরা টুকটাক পর্যবেক্ষণ শুরু করেছেন। শিগগিরই মানমন্দিরটি তরুণ মহাকাশ পর্যবেক্ষকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন এর প্রতিষ্ঠাতা।