মারাঘা ও সমরখন্দ মানমন্দির

মারাঘা ও সমরখন্দ মানমন্দির মধ্যযুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার শীর্ষস্থানীয় দুটি মানমন্দির। মারাঘা মানমন্দির স্থাপিত হয় ১২৫৯ খ্রিষ্টাব্দে। মারাঘা বর্তমানে ইরানের আজারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত। মোগল সম্রাট হালাকু খাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় পারস্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী নাসিরুদ্দিন আল-তুসি মানমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি ‘মারাঘা মানমন্দির’ বা নাসিরুদ্দিন আল-তুসির মানমন্দির নামে পরিচিত। এই মানমন্দির ঘিরে ‘মারাঘে-ঘরানার’ সৃষ্টি হয় এবং ঘরানার বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

হালাকু খাঁ ছিলেন দিগ্‌বিজয়ী মোগল রাজ চেঙ্গিস খাঁর পৌত্র। মানমন্দিরটি ছিল একটি টিলার ওপর। মূল ভবনের পাশেই একটি গম্বুজাকৃতি ভবন থেকে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো। মানমন্দির প্রতিষ্ঠার পেছনে হালাকু খাঁ ও নাসিরুদ্দিন আল-তুসির বিরাট অবদান রয়েছে। পরবর্তীকালে এই মানমন্দিরকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বেশ কয়েকটি মানমন্দির স্থাপিত হয়। যেমন পঞ্চদশ শতাব্দীতে সমরখন্দে স্থাপিত ‘উলুগ বেগ মানমন্দির’, ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে ইস্তাম্বুলে স্থাপিত ‘তাকি আল-দীন মানমন্দির’ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতের রাজা জয় সিং কর্তৃক স্থাপিত ‘যন্তর-মন্তর’।

মারাঘা মানমন্দির

নাসিরুদ্দিন আল-তুসি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি মারাঘা মানমন্দিরের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে খোরাসান প্রদেশের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে কর্মরত ছিলেন আল উর্দি ও আল মাগরিব নামের আরও দুজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। অনেক সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির সাহায্যে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা। মানমন্দিরে যে কোয়াড্র্যান্ট যন্ত্রটি ছিল, তার ব্যাস ৮ মিটার। এর পাশাপাশি ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক একটি গোলক। টলেমির যন্ত্রপাতি থেকে উন্নতর যন্ত্রপাতি তৈরি করেন তুসি। এর মধ্যে ‘তুসি-যুগল’ ছিল অন্যতম। কয়েক দশকের বিরামহীন পর্যবেক্ষণের পর মানমন্দির থেকে প্রকাশিত হয় ‘জিজ-ই-ইলখানি’ নামের একটি তারা-সারণি।

মারাঘা মানমন্দিরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোপারনিকাস ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে তাঁর বিখ্যাত সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্ব মডেলের প্রস্তাব করেন। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্ধকার যুগের, অর্থাৎ টলেমির ভূকেন্দ্রিক বিশ্ব মডেলের অবসান ঘটতে থাকে।

সমরখন্দ মানমন্দির স্থাপিত হয় ১৪২০ খ্রিষ্টাব্দে। ইতিহাসবিখ্যাত তৈমুর লংয়ের পুত্র উলুগ বেগ সমরখন্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার জন্য একটি বিশাল মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ ‘সমরখন্দ মানমন্দির’ বা উলুগ বেগ মানমন্দির নামে পরিচিত। ইসলামিক বিশ্বের মধ্যে এটি একটি সুন্দরতম মানমন্দির। সমরখন্দ বর্তমানে উজবেকিস্তানের অন্তর্গত একটি প্রাদেশিক শহর।

উলুগ বেগ ছিলেন একজন মুসলিম শাসক। তিনি মুসলিম যুগের শেষ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন বড় পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। রাজকার্যের পাশাপাশি তিনি মনোনিবেশ করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চায়। সে সময়ের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাসুদ-আল-কাশিকে তিনি সমরখন্দে নিয়ে আসেন এবং মারাঘার মতো একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। মাসুদ-আল-কাশি এই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সমরখন্দে একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর এর সুখ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

সমরখন্দ মানমন্দির

মানমন্দিরে ছিল ৪০ মিটার ব্যাসার্ধের একটি কোয়াড্র্যান্ট যন্ত্র। সুদীর্ঘ ২০ বছর পর্যবেক্ষণের পর ১৪৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মানমন্দির থেকে প্রকাশিত হয় ১ হাজার ১৮টি তারা নিয়ে একটি তালিকা। তালিকাটি ছিল পূর্ববর্তী ও তত্কালীন তালিকাগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। উলুগ বেগের এই তালিকা ‘জিজ-ই-উলুগ বেগ’ নামে পরিচিত। এরপর জামশিদ গিয়াসউদ্দিন আল-কাশি নামের আরেকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এই মানমন্দিরে কাজ করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ ও গণনার কাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। গ্রহের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য ইকুয়েটোরিয়াল নামক একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রেরও উদ্ভাবক ছিলেন তিনি।

দুরবিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত উলুগ বেগের জিজ বা তারা-সারণি পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে একমাত্র প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য ছিল। এমনকি গ্রিনিচ মানমন্দিরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন ফ্ল্যামস্টিডও উলুগ বেগের তারা-সারণি ব্যবহার করতেন। ১৪৪৯ খ্রিষ্টাব্দে এক প্রাসাদ বিপ্লব ঘটিয়ে তাঁকে (উলুগ বেগ) হত্যা করা হয়। তিনি বলতেন, ‘ধর্ম কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়, রাজ্য ধ্বংপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু বিজ্ঞানীর কাজ চিরকালের মতো থেকে যায়।’

উলুগ বেগের মৃত্যুর পর মধ্যযুগীয় মুসলমানদের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চা আর তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তীকালে কোপারনিকাস, টাইকো ব্রাহে, জোহানেস কেপলার ও গ্যালিলিওর হাত ধরে ইউরোপে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার সূত্রপাত ঘটে।

লেখক: শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও সংগঠক