সূর্যের দিকে যাত্রা করল ভারতের আদিত্য-এল১

আদিত্য-এল১ নভোযানের ইলাস্ট্রেশনছবি: ইসরো
সূর্যের নামের সঙ্গে মিল রেখে এ নভোযানের নাম রাখা হয়েছে আদিত্য। আর এল১ বিন্দুতে যাবে বলে নামের শেষে বসেছে ‘এল১’।

সফলভাবে উৎক্ষেপিত হলো সূর্য গবেষণায় পাঠানো ভারতের প্রথম নভোযান আদিত্য-এল১। ২ সেপ্টেম্বর, শনিবার বাংলাদেশ সময় ১২টা ২০ মিনিটে এ নভোযান উৎক্ষেপণ করে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। নভোযানটি ভারতের শ্রীহরিকোটা সতীশ ধাওয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টারের লঞ্চিং প্যাড থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল বা পিএসএলভি রকেটে ভর করে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১ বা এল১ বিন্দুতে পৌঁছাবে নভোযানটি।

সূর্যের নামের সঙ্গে মিল রেখে এ নভোযানের নাম রাখা হয়েছে আদিত্য। আর এল১ বিন্দুতে যাবে বলে নামের শেষে বসেছে ‘এল১’। দুইয়ে মিলে নামটি দাঁড়িয়েছে আদিত্য-এল১। সংস্কৃত ভাষায় আদিত্য মানে সূর্য। নভোযানটির এল১ বিন্দুতে পৌঁছাতে সময় লাগবে ১৮০ দিন। পৃথিবী থেকে এল১-এর দূরুত্ব প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার।

পিএসএলভি রকেটে ভর করে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১ বা এল১ বিন্দুতে পৌঁছাবে নভোযানটি
ছবি: ইসরো

আদিত্য-এল১ নভোযানে রয়েছে মোট সাতটি পেলোড বা ভার। এগুলো সূর্যের বিভিন্ন স্তর খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করবে। এর মধ্যে প্রধান দুটি পেলোড হলো ভিজিবল এমিশন লাইন করোনাগ্রাফি (ভিইএলসি) এবং সোলার আল্ট্রাভায়োলেট ইমেজিং টেলিস্কোপ (এসএউআইটি)। এল১ বিন্দুতে পৌঁছানোর পরে ভিইএলসি পেলোড প্রতি দিন ১ হাজার ৪৪০টি করে ছবি তুলে পাঠাবে। অন্য পেলোডগুলোর মধ্যে রয়েছে সোলার লো এনার্জি এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার (এসওএলইএক্সএস), হাই এনার্জি এল১ অরবিটিং এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার (এইচইএল১ওএস), আদিত্য সোলার উইন্ড পার্টিকেল এক্সপেরিমেন্ট (এসপিইএক্স) এবং প্লাজমা অ্যানালাইজার প্যাকেজ ফর আদিত্য (পিএপিএ)।

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ এই ‘মহাকাশযান’ স্থাপনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই জায়গা থেকে সূর্যকে সব সময় পর্যবেক্ষণ করা যাবে। মহাকাশযান বলা হলেও এটা আসলে একধরনের করোনাগ্রাফি স্পেসক্রাফট।

এবার একটু জেনে নেওয়া যাক, ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট জিনিসটা কী। ১৭৭২ সালে ইতালীয় বিজ্ঞানী জোসেফ-লুই ল্যাগ্রাঞ্জ গণনা করে দেখান, একটি সিস্টেমে যদি দুটি বড় বস্তু একে অন্যকে মহাকর্ষীয় শক্তিতে আকর্ষণ করে, তবে সেখানে পাঁচটি ভারসাম্যপূর্ণ বিন্দু পাওয়া যাবে। এসব বিন্দুতে দুটো বস্তুর মহাকর্ষ একে অন্যকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয় যে সেখানে তৃতীয় কোনো বস্তু রাখলে সেটা কোনো আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল অনুভব করবে না। পৃথিবীর ও সূর্যের মধ্যেও এরকম পাঁচটি স্থান রয়েছে। এগুলোকে যথাক্রমে এল১ থেকে এল৫ নামে ডাকা হয়। অনেক বিজ্ঞানী মজা করে এ জায়গাগুলোকে বলেন, মহাকাশের নিরাপদ পার্কিং স্পট। অর্থাৎ, পার্ক করে রাখা নভোযান বা নভোদুরবিনটি নির্দিষ্ট কক্ষপথেই থাকবে, সূর্য বা পৃথিবী বা আর কোনো গ্রহের টানে সেদিকে চলে যাবে না। বিস্তারিত জানতে পড়ুন: ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট কী

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ এই ‘মহাকাশযান’ স্থাপনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই জায়গা থেকে সূর্যকে সব সময় পর্যবেক্ষণ করা যাবে। মহাকাশযান বলা হলেও এটা আসলে একধরনের করোনাগ্রাফি স্পেসক্রাফট। এ ধরনের নভোযানে তাপ নিরোধক ও সূর্যালোক প্রতিরোধী ঢালের পাশাপাশি সূর্যের করোনা অঞ্চলের বর্ণালি বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র বসানো থাকে।

সূর্য নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই গবেষণা করছেন। তবে এখনো সূর্যের সব রহস্য উন্মচিত হয়নি। সৌরপৃষ্ঠের চেয়ে সূর্যের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কেন বেশি, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না বিজ্ঞানীরা। সূর্যের করোনা অঞ্চল নিয়েও রয়েছে কিছু রহস্য। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভারতের এ নভোযানের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে চলা এসব রহস্যের জট কিছুটা খুলবে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালে জাপানের সঙ্গে যুগ্মভাবে চন্দ্রাভিযানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত।

এ ছাড়াও সৌরজগতের পরিবেশের ওপর সূর্যের প্রভাব সম্পর্কে এ স্থান থেকে ভালো তথ্য পাওয়া যাবে। আগেই যেমন বলেছি, সূর্য ও পৃথিবীর মহাকর্ষ ভারসাম্যপূর্ণ হওয়ায় সেখানে আদিত্য-এল১ থাকতে পারবে যত দিন ইচ্ছা, ততদিন। সেই চেষ্টাই করছে ইসরো।

এর আগে, গত ২৩ আগস্ট, বুধবার প্রথম দেশ হিসেবে সরাসরি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নভোযান পাঠিয়েছে ভারত। এখন পর্যন্ত যতগুলো দেশ চন্দ্রাভিযান করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে নভোযান পাঠানোর রেকর্ড গড়েছে দেশটি। মাত্র ৭৫ মিলিয়ন ডলারে তারা এ অভিযান সম্পন্ন করেছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালে জাপানের সঙ্গে যুগ্মভাবে চন্দ্রাভিযানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। দেশটির আশা, এ অভিযানগুলো মহাকাশ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

লেখক: সদস্য, সম্পাদনা দল, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: স্পেস ডট কম, আনন্দবাজার পত্রিকা