আড়াই শ বছর আগের এক সন্ধ্যা। ইউরেনাস আবিষ্কারের ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। আবিষ্কর্তা উইলিয়াম হার্শেল তখন খ্যাতির শীর্ষে। ১৭৮৭ সালের এপ্রিল মাসের কথা। দিনটি ছিল ঠিক অমাবস্যার পরদিন। তারিখ ১৯ এপ্রিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় হার্শেল তাঁর দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন চাঁদের দিকে। যে যন্ত্র দিয়ে তিনি ইউরেনাস আবিষ্কার করেছিলেন, এটি কিন্তু সেই যন্ত্র নয়। মাপে বেশ বড়। এটি তিনি নতুন করে তৈরি করেছিলেন। সে প্রায় ১০ ফুট দীর্ঘ দূরবীক্ষণ যন্ত্র। আর এই যন্ত্র দিয়েই ওই দিন এক অদ্ভুত ঘটনা তিনি দেখতে পেয়েছিলেন চাঁদের পিঠে। সেদিন শুক্লপক্ষের শুরু, অর্থাৎ চাঁদের শুধু একফালি অংশ দেখা যাচ্ছিল সন্ধ্যার আকাশে। তিনি দূরবীক্ষণ যন্ত্র তাক করে ছিলেন চাঁদের অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশের দিকে।
চাঁদের যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে না, সেই অংশ কিন্তু একেবারে নিকষ অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। সেই দিকও খানিকটা আলোকিত। সেটা আমরা খালি চোখেই বুঝতে পারি। এই আলো কোথা থেকে আসে? লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন প্রথমে। আমাদের পৃথিবী যেমন চাঁদনি রাতের আলোয় আলোকিত হয়, তেমনি পৃথিবীর আলোও নিশ্চয়ই চাঁদের পিঠের আঁধারাচ্ছন্ন অংশ কম হলেও কিছুটা আলোকিত করে রাখে।
আর হার্শেলের দুরবিন এত শক্তিশালী ছিল যে সেই ক্ষীণ আলোতেও চাঁদের পিঠের গর্তগুলো দেখা যেত। সেই অন্ধকার অংশে দুরবিন তাক করেছিলেন হার্শেল
হঠাৎ তাঁর চোখে পড়েছিল আলোর ঝলক। এক জায়গায় নয়, তিনটি অঞ্চলে আগুন জ্বলে ওঠার চিহ্ন। আতশবাজির মতো। সেদিন খুব তাড়াতাড়ি অস্ত গিয়েছিল চাঁদ, তাই পরদিন তিনি আবার দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তাক করলেন দ্বিতীয়ার চাঁদের অন্ধকার অঞ্চলে। যেসব অঞ্চলে আগের দিন আলোর ঝলক দেখেছিলেন, সেদিকে। তিনটি গর্ত। একটি হলো চাঁদের থালার এক ধারে, নাম অ্যারিস্টার্কাস। তখন অবশ্য অন্য নাম ছিল। জোহানেস হ্যাভেলিয়াস, যিনি চাঁদের প্রথম মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, তিনি নাম রেখেছিলেন মুন পরফেরাইট। উল্লেখ্য, তিনিও ২০০ বছর আগে, ১৬৫০ সালে এই অঞ্চলে লালচে ঝলক দেখেছিলেন। প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ অ্যারিস্টার্কাসের সম্মানে এর নামকরণ করা হয়েছে।
বাকি দুটি অঞ্চল ছিল চাঁদের থালার মাঝামাঝি জায়গায়। গর্ত দুটির নাম মেনিলাউস ও ম্যানিলিউস। পাশাপাশি অবস্থান এগুলোর। দূরত্ব বেশি নয়। ৪০০ কিলোমিটারের কম। কলকাতা-ঢাকার মতোই কাছাকাছি। যেখানে ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং নেমেছিলেন, সেখান থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে রয়েছে গর্ত দুটি।
হার্শেল পরদিনও দেখতে পেলেন, সেই অঞ্চলগুলো তখনো জ্বলজ্বল করছে। সেই অংশগুলো তখনো অন্ধকারে ঢাকা। তাঁর মনে হয়েছিল যেন গনগন করে কয়লার টুকরা জ্বলছে। লাল-কমলা রঙের আভা এবং তার ওপরে সাদা ছাইয়ের একটা পাতলা আস্তরণ যেন। যেমনটা দেখা যায় কয়লার উনুনে। কম আগুনে জ্বলতে থাকা কয়লার উনুন দেখছেন, এমনটা মনে হয়েছিল তাঁর।
সেদিন আকাশে চাঁদের কাছেই বৃহস্পতি গ্রহ ছিল। হার্শেল দুরবিন ঘুরিয়ে বৃহস্পতির একটি উপগ্রহের সঙ্গে চাঁদের এই উজ্জ্বল অঞ্চলটির মাপ তুলনা করে নিয়েছিলেন। প্রথম উজ্জ্বল অঞ্চলটির মাপ তাঁর মনে হয়েছিল পাঁচ কিলোমিটারের বেশি। ঠিক গোলাকার নয়, তবে অঞ্চলের সীমানারেখাটি খুব স্পষ্ট। উজ্জ্বল অঞ্চলটি যেন এক জায়গায় এসে হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে।
তিনি মনে করেছিলেন, এটা অগ্ন্যুৎপাতের চিহ্ন। চাঁদে যখন পাহাড় আছে, তখন আগ্নেয়গিরি থাকাও সম্ভব। তিনি এই নতুন আবিষ্কারে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে তখন ইউরেনাস আবিষ্কর্তা হিসেবে রাজকোষ থেকে বার্ষিক ভাতা দেওয়া হতো। তিনি তখনকার ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জর্জকে নিমন্ত্রণও করেছিলেন একবার এসে দুরবিনে এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখে যাওয়ার জন্য।
১৯৫৩ সালে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। আমেরিকার ওকলাহোমা প্রদেশে টুকলা নামের জায়গায় এক চিকিৎসক ছিলেন, নাম লিওন স্টুয়ার্ট। তিনি আবার শখের জ্যোতির্বিদও ছিলেন।
আমরা এখন জানি যে চাঁদে আগ্নেয়গিরি নেই। আগে ছিল, কিন্তু সে বহু আগের কথা। আমরা চাঁদের কলঙ্ক বলতে যে কালো অংশগুলো দেখি, সেগুলো লাভা দিয়ে তৈরি। প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগের ঘটনা সেটা। মুহুর্মুহু উল্কাপাত আর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত—যুগপৎ এই দুই ঘটনার ফলে ওই জায়গাগুলোতে লাভার আস্তরণ পড়েছে। এসব তথ্য জানা গেছে নীল আর্মস্ট্রংয়ের মতো নভোচরেরা চাঁদের পাথর, বালু, মাটির যেসব নমুনা এনেছিলেন, সেসব পরীক্ষা করে।
কিন্তু সেই অগ্নিপর্ব প্রাচীন যুগের কথা। চাঁদে শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল কোটি বছর আগে। তাহলে হার্শেল যে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেটা কী ছিল? এ নিয়ে মাঝেমধ্যেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তবে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। বরং আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে এই প্রশ্ন। হার্শেলের পর্যবেক্ষণের এক শতাব্দী পরে আটলান্টিকের ওপারের এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দেহ করেছিলেন এই জবানবন্দির যথার্থতা নিয়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার লিক মানমন্দিরের বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড হোল্ডেন বলেছিলেন, সেই উজ্জ্বল অংশগুলো আসলে দেখার ভুল। আসলে গর্তের চারদিকে যে বিশাল পাঁচিল থাকে, সেই উঁচু অংশে সূর্যের আলো এসে পড়েছিল। তার চারপাশের অংশ যখন অন্ধকার, তখন পাঁচিলের শিখরে সূর্যের আলো লেগে সেই অংশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। হার্শেলের মনে হয়েছিল আগুন লেগেছে। আর লালচে আলো? সেটা হয়তো তাঁর দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আয়নার ত্রুটির জন্য হয়েছিল। এমন হয় অনেক সময়, যখন আয়না বা লেন্সের ত্রুটির জন্য আলোর সব রং একসঙ্গে ফোকাস হয় না। ফলে লালচে বা নীলচে হয়ে ওঠে দুরবিনের মধ্য দিয়ে দেখা দৃশ্য। হোল্ডেন আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, হার্শেলের মতো একজন বিচক্ষণ বিজ্ঞানী কীভাবে এমন ভুল করলেন!
কিন্তু সত্যিই কি চোখের ভুল? এমন ঘটনা খুব বেশি না হলেও একেবারে হয়নি, তা নয়। যেমন দ্বাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবেরির (সেই ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’খ্যাত) কয়েকজন পাদরি বলেছিলেন, তাঁরা শুক্লপক্ষের চাঁদের অন্ধকার অংশে কয়লা জ্বলতে থাকার মতো দেখেছিলেন। ১৬৫০ সালে হ্যাভেলিয়াসের পর্যবেক্ষণের কথা আগেই বলা হয়েছে।
১৯৫৩ সালে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। আমেরিকার ওকলাহোমা প্রদেশে টুকলা নামের জায়গায় এক চিকিৎসক ছিলেন, নাম লিওন স্টুয়ার্ট। তিনি আবার শখের জ্যোতির্বিদও ছিলেন। রোগী দেখতে যেতে না হলে সন্ধ্যাবেলাটা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আকাশের তারা দেখেই কাটাতেন। মাঝেমধ্যে তাঁর ক্যামেরা সেই দুরবিনের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ছবিও তুলতেন।
সেই বছর নভেম্বর মাসের ১৫ তারিখে তিনি এক জবর ছবি তুলেছিলেন। চাঁদের পিঠে বিস্ফোরণের ছবি। সেদিনও শুক্লপক্ষের চাঁদ ছিল, কিন্তু অর্ধেক আলোকিত। অন্ধকার অংশে এক জায়গায় হঠাৎ তিনি দেখলেন, এক আলোর ঝলক। ৮ থেকে ১০ সেকেন্ড পরই মিলিয়ে গেল। কিন্তু ততক্ষণে তিনি ছবি তুলে নিয়েছেন।
তাঁর মনে হয়েছিল, এটি একটি উল্কাপাতের ঘটনা। সেই মতানুসারেই লিখেছিলেন এক প্রবন্ধ। স্ট্রলিং অ্যাস্ট্রনমার নামের এক ছোট কাগজে। সঙ্গে ছবি। কিন্তু সবাই তাঁর কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার একটা কারণ হলো তিনি পেশাদার বিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মফস্বলের এক চিকিৎসক! তাঁর ছবি দেখে সবাই বলেছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনো উল্কা ঢুকেছিল সেই সময়। সেই উল্কা পুড়ে যাওয়ার সময় তার পেছনে ছিল চাঁদ। এটি একটি সমাপতনমাত্র।
হার্শেলের পর্যবেক্ষণেরও একটি সম্ভাব্য সমাধান বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন। সম্প্রতি চাঁদের চারদিকে প্রদক্ষিণরত মহাকাশযান থেকে তোলা ছবিতে কিছু আশ্চর্যজনক তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। যে যন্ত্র দিয়ে চাঁদের পিঠের তাপমাত্রা মাপা যায়, তা দিয়ে দেখা গেছে, চাঁদের ওপর কিছু কিছু জায়গার তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কম।
বহু বছর পর নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী বনি বুরাত্তি ১৯৫৩ সালের ছবিটি দেখে কৌতূহলী হন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে উল্কা এসে পড়ার পর এই দীপ্তির ঝলক দেখা যেতে পারে, সেটির মাপ মোটামুটি কুড়ি মিটারের মতো হওয়া চাই। আর সেটা পড়ার পর যে গর্ত হবে, সেটি হবে কয়েক কিলোমিটার বড়। এই মাপের গর্ত পৃথিবীর কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখা অসম্ভব। তখন নাসার পাঠানো ক্লিমেন্টাইন মহাকাশযান থেকে তোলা চাঁদের পিঠের ছবিতে তিনি ওই অঞ্চলে এই মাপের একটি গর্তের চিহ্ন খুঁজে পান। তাঁর মতে, এটি একটি নতুন গর্ত এবং এর সৃষ্টির মুহূর্তই দেখেছিলেন ডা. স্টুয়ার্ট।
হার্শেলের পর্যবেক্ষণেরও একটি সম্ভাব্য সমাধান বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন। সম্প্রতি চাঁদের চারদিকে প্রদক্ষিণরত মহাকাশযান থেকে তোলা ছবিতে কিছু আশ্চর্যজনক তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। যে যন্ত্র দিয়ে চাঁদের পিঠের তাপমাত্রা মাপা যায়, তা দিয়ে দেখা গেছে, চাঁদের ওপর কিছু কিছু জায়গার তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কম। চারপাশের তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। এই কোল্ড স্পটগুলোর উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। এখনো গবেষণা চলছে। তবে তাঁরা মনে করেন, এগুলো হলো নতুন গর্ত তৈরির সময় ছিটকে পড়া মাটি বা সেই সময় চাঁদের ওপরের স্তরে একধরনের আলোড়নের জন্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলগুলোর ওপর সূর্যালোক পড়ার সময় বেশির ভাগ আলো প্রতিফলিত হয়ে যায় এবং মাটি যথেষ্ট গরম হতে পারে না। তাই রাতে অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হয়ে যায়।
অর্থাৎ এই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে নতুন গর্ত তৈরির সম্পর্ক আছে। সম্প্রতি দেখা গেছে হার্শেল যেসব অঞ্চলে আলো ‘জ্বলতে’ দেখেছিলেন, ঠিক সেখানেই অনেক কোল্ড স্পট রয়েছে। এগুলো কি তাহলে উল্কাপাতের জন্য তৈরি হয়েছিল, যে উল্কাপাতের মুহূর্তে সাক্ষী ছিলেন হার্শেল? এই প্রশ্ন নিয়ে এখন বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এমন ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে। আর সেটা প্রত্যক্ষ করার জন্য সাধারণ দুরবিন হলেই যথেষ্ট। তাই বলছিলাম কি, শ্রাবণের মেঘ চলে গিয়ে শরৎ তো এসে গেছে, এবার ধীরে ধীরে বাইনোকুলার বা দুরবিনগুলো বের করে সন্ধ্যাকাশে চাঁদ দেখার সময় এল বলে!
লেখক: অধ্যাপক, রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বেঙ্গালুরু, ভারত