আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সি অনেক পুরোনো, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বলতে গেলে সব গ্যালাক্সিই পুরোনো। সবচেয়ে তরুণ যে গ্যালাক্সি, সেটিও হয়তো ১০ বিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল আর সবচেয়ে বয়স্কটি বিগ ব্যাংয়ের ২০০–৩০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই সৃষ্ট। অর্থাৎ তাদের বয়স ১৩.৫ নাকি ১৩.৬ বিলিয়ন বছর। [তবে বছর পনেরো আগে গ্যালেক্স (GALEX) নামে অতিবেগুনি আলোর একটি দুরবিন আমাদের কাছাকাছি গত এক বিলিয়ন বছরে সৃষ্ট কিছু গ্যালাক্সি দেখতে পেয়েছে বলে দাবি করে, পরে অবশ্য এ ব্যাপারে কিছু শোনা যায়নি।]
আমাদের গ্যালাক্সি যে বেশ বয়স্ক, তা আমরা জানলাম বেশ কিছুদিন হলো। অনেকের খেয়াল থাকতে পারে, আমাদের খুব কাছাকাছি একটি তারা এইচডি১৪০২৮৩, মাত্র ২০০ আলোকবর্ষ দূরে। এর নাম দেওয়া হয়েছিল মেথুসেলাহ (বাইবেলে বর্ণিত এক দীর্ঘজীবী চরিত্রের নাম)। সেটির বয়স প্রথমে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছিলেন মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে বেশি। এটা যে হতে পারে না, তা আমরা জানি। দেখা যাক এই তারাটি নিয়ে গবেষণার ইতিহাস।
২০১৩ সালে একটি গবেষক দলের হিসাবে এই উপদানব (Sub-Giant) তারাটির বয়স হলো ১৪.৪৬ ± ০.৮০ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ এক সিগমা (০.৮০ বছর) ভুল ধরলে তারাটির বয়স ১৩.৬০ বিলিয়ন বছর থেকে ১৫.২০ বিলিয়ন বছর। তত দিনে প্ল্যাঙ্ক দুরবিন মাইক্রোওয়েভ পটভূমি ও হাবল ধ্রুবক ব্যবহার করে মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৭৭ ± ০.০৬ বিলিয়ন বছর নির্ধারণ করেছে। কাজেই বলা যায়, এক সিগমা যথার্থতার মধ্যে তারাটির বয়স মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে বেশি হয়তো নয়। ইদানীং গবেষণায় তারাটির বয়স আরও একটু কম বলা হচ্ছে। তবে সেই আলোচনায় যাবার আগে তারার মধ্যে ধাতুর পরিমাণ বা ধাতবতা (metallicity) নিয়ে কিছু কথা বলে নিই।
মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার পর প্রথম যে নক্ষত্রগুলোর জন্ম, সেগুলোর মধ্যে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া বলতে গেলে অন্য কোনো মৌল ছিল না। কারণ, শুধু প্রথম তারাদের অভ্যন্তরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে নিউক্লীয় ফিউশনের ফলে পর্যায় সারণিতে হিলিয়ামের ওপরের ভারী মৌল পদার্থগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। জ্যোতির্বিদেরা এসব ভারী মৌলকে ধাতু বলে আখ্যায়িত করেন। অর্থাৎ কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন—এগুলো সবই সংজ্ঞায় ধাতু। সেই প্রথম তারাগুলো সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হলে তাদের মধ্যে সৃষ্ট ভারী মৌলরা আন্তনাক্ষত্রিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলো পরবর্তী প্রজন্মের তারাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কাজেই প্রথম প্রজন্মের তারাদের মধ্যে ধাতুর পরিমাণ প্রায় শূন্য আর দ্বিতীয় প্রজন্মের তারাদের মধ্যে ধাতুর অস্তিত্ব দেখা দিতে থাকে। সূর্যকে তৃতীয় প্রজন্মের তারা ধরা হয় এবং এর মধ্যে ধাতুর পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ।
আমরা যদি হারজস্প্রুং-রাসেল (HR) চিত্রে কোনো তারার সঠিক অবস্থানটি জানি, অর্থাৎ তার অন্তর্নিহিত ঔজ্জ্বল্য ও পৃষ্ঠ তাপমাত্রা আমাদের জানা থাকে এবং তার বর্ণালি রেখাগুলো থেকে সেটির ধাতবতা নির্ধারণ করতে পারি, তাহলে তারাটির বয়স মোটামুটিভাবে অনুমান করা সম্ভব। এখানে বলে রাখা দরকার, আমাদের গ্যালাক্সি পুরোনো হলেও এখানে প্রথম প্রজন্মের তারাদের আর থাকার কথা নয়। কারণ, সেই তারাগুলো সম্ভবত ছিল বেশ ভারী (সূর্যের ভরের চেয়ে কয়েক গুণ ভরসম্পন্ন) এবং বিগ ব্যাংয়ের কয়েক শ মিলিয়ন বছরের মধ্যে তারা সৃষ্টি হয়ে কয়েক দশক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই তাদের সুপারনোভা হয়ে মৃত্যু হওয়ার কথা।
মেথুসেলাহ তারার কথায় ফিরে আসি। এর ধাতুর পরিমাণ সূর্যের ধাতবতার ০.৪ শতাংশ। এটা খুব কম হলেও একেবারে শূন্য নয়, কাজেই এই তারাকে দ্বিতীয় প্রজন্মের ধরে নেওয়া যায়। ২০২১ সালে নক্ষত্রের ভেতরের বস্তু-চলনের মডেলিং করে তারাটির বয়স নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ ± ০.৫ বিলিয়ন বছর। কাজেই পূর্বতন সমস্যা যেটি ছিল, এটির বয়স মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে বেশি, সেটি থাকল না। শুধু তা–ই নয়, এর ফলে আমাদের গ্যালাক্সির বেশ কয়েকটি তারা মেথুসেলাহর চেয়ে বয়সে বড় হয়ে গেল। যেমন আমাদের থেকে মাত্র ৭২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি G-টাইপ তারা এইচডি১৬৪৯২২। এটির বয়স HR রেখাচিত্র থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৩.৪ বিলিয়ন বছর। তবে ভবিষ্যতে নক্ষত্র বিকাশের নতুন ও উন্নত মডেল ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গে এই মানগুলো বদলাবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
কিন্তু মেথুসেলাহর মতো তারার সঙ্গে তার আশপাশের তারার মিল নেই, অর্থাৎ সেগুলো হলো তুলনামূলকভাবে নতুন। তারাটির দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। একটি হচ্ছে এর গতিবেগ আশপাশের তারাগুলোর থেকে বেশি, অন্যটি হলো যদিও সূর্যের থেকে এর ধাতবতা কম। এর মধ্যে আলফা প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট মৌলদের পরিমাণ একেবারে কম নয়। আলফা হলো আলফা কণা, যার মধ্যে দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন আছে, অন্যভাবে বলতে গেলে হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস। বড় তারাদের অভ্যন্তরে কার্বন নিউক্লিয়াসের সঙ্গে আলফা কণা যোগ করলে পাওয়া যায় অক্সিজেন, অক্সিজেনের সঙ্গে আলফা মিলে হয় নিয়ন আবার নিয়ন থেকে হয় ম্যাগনেশিয়াম। এই একই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় সিলিকন, সালফার, আর্গন, ক্যালসিয়াম, টাইটেনিয়াম, ক্রোমিয়াম, লোহা ও নিকেল। একটি মৌলের সঙ্গে আলফা কণা যোগ করে পরবর্তী ভারী মৌল পাওয়া যায় বলে এদের বলা হয় আলফা মৌল। মেথুসেলাহর মধ্যে আলফা মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে প্রথম প্রজন্মের তারারা অন্য মৌল পদার্থের চেয়ে আলফা মৌল সৃষ্টিতে বেশি দক্ষ ছিল। কারণ সেই প্রথম তারাদের বিস্ফোরিত পদার্থ থেকেই মেথুসেলাহ-র মতো দ্বিতীয় প্রজন্মের তারা সৃষ্টি হয়েছিল।
এবার আসি খুব নতুন একটি গবেষণার ব্যাপারে, যার ফলাফল হলো যে আমাদের গ্যালাক্সির একটা বড় অংশ বেশ পুরোনো। কোন অংশটা? একে বলা হয় থিক ডিস্ক (Thick Disk)। এটা অবস্থান করে গ্যালাক্সির মূল তলের একটু ওপরে, একে বহির্চক্র বলা যেতে পারে। এটি মোটামুটি গ্যালাক্সির তল থেকে ৪০০ আলোকবর্ষ থেকে ১০০০ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অংশের তারাদের সৃষ্টি শুরু হয়েছে বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ৮০০ মিলিয়ন বছর পরে। অর্থাৎ আজ থেকে ১৩ বিলিয়ন বছর আগে। মেথুসেলাহ-র মত এই তারাগুলোর গতিবেগও বেশি। আবার এই তারাদের ধাতবতা কম হলেও মেথুসেলাহর মতো এদের মধ্যে আলফা মৌলের পরিমাণ বেশি। এই তারাগুলোর জন্মহারের মাত্রা সবচেয়ে বেশি হয়। ১১ বিলিয়ন বছর আগে যখন গবেষকেরা মনে করছেন গায়া এনসেলিডাস নামে একটি ছোট গ্যালাক্সির সঙ্গে আমাদের গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হয় (বলা উচিত মিলিত হয়। কারণ, এর ফলে তারাদের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ হয় না)। অন্যদিকে থিন ডিস্ক (Thin Disk) বা অন্তর্চক্র, যার উচ্চতা গ্যালাক্সির তল থেকে ৪০০ আলোকবর্ষের মধ্যে, সেখানকার তারাগুলো আজ থেকে ৮ বিলিয়ন আগে থেকে (বিগ ব্যাংয়ের ৬ বিলিয়ন বছর পর থেকে) সৃষ্টি হচ্ছে, অর্থাৎ সেগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন।
এখানে বলে রাখি, এই গবেষণায় শুধু মেথুসেলহার মতো উপদানব তারাদের বৈশিষ্ট্যই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই তারাগুলো HR রেখাচিত্রে দীর্ঘদিন মূল সারণিতে অবস্থান করে সবে সেখান থেকে বের হয়েছে। এদের ধাতবতা ও বয়স বের করা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ। এগুলোর মধ্যে অনেক তারাই সূর্যের মতো G-টাইপ তারা হলেও সূর্যের চেয়ে কম ভরসম্পন্ন বলে এত দিনেও মরে যায়নি। অর্থাৎ শ্বেত বামনে পরিণত হয়নি। এই গবেষকেরা এসার (ESA) গাইয়া এবং চীনের ল্যামন্ট দুরবিন ব্যবহার করে প্রায় আড়াই লাখ উপদানব তারার অবস্থান ও ধাতবতা নির্ধারণ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, মেথুসেলাহ তারার মতো লাখ লাখ তারা আমাদের গ্যালাক্সিতে রয়েছে। কাজেই মেথুসেলাহ কোনো বিশেষ তারা নয়। আড়াই লাখ তারা নিয়ে গবেষণা একটা দুরূহ ব্যাপার, এটা ১০–১৫ বছর আগেও ভাবা যেত না আর এটা সম্ভব হয়েছে আধুনিক গণনাযন্ত্রের প্রকৌশলের জন্যই।
আর একটি কথা বলে এই নিবন্ধ শেষ করছি। মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো বিগ ব্যাংয়ের কয়েক বিলিয়ন বছরের মধ্যেই নতুন নক্ষত্র করার জন্য ভালো মসলা, অর্থাৎ হাইড্রোজেনের ঘন গ্যাসপুঞ্জ এবং মুক্ত ধূলিকণা, ফুরিয়ে ফেলেছিল। তাই আমাদের আশপাশের সব গ্যালাক্সির রং, আমাদেরটাসহ, লাল আর হলুদ—নতুন বড় উজ্জ্বল তারার নীল রং নয়। সেই অর্থে আমাদের গ্যালাক্সির বেশির ভাগ তারার পুরোনো হওয়ারই কথা। কিন্তু পুরোনো হলেও তার মধ্যে প্রথম প্রজন্মের তারাগুলো নেই। আর প্রথম প্রজন্মের একটি অন্তত তারা শনাক্ত করা জেমস ওয়েব দুরবিনের অন্যতম উদ্দেশ্য। মহাবিশ্বের দূরতম প্রান্তে, প্রথম গ্যালাক্সি যখন সবে তৈরি হচ্ছে, তখন প্রথম যে তারাগুলো জন্ম নেয়, সেগুলোকে আবিষ্কার করা জ্যোতির্বিদ্যার জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক: অধ্যাপক ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ, মোরেনো ভ্যালি কলেজ, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র