১৩.৮ বিলিয়ন বছর বয়সী মহাবিশ্ব কীভাবে ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষজুড়ে বিস্তৃত

আলো ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ভ্রমণ করেও আমরা কীভাবে ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের মহাবিশ্ব দেখতে পাই?ছবি: নাসা

মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। তবুও আজ পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বিস্তৃতি প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। আপাতদৃষ্টিতে এটি অসম্ভব বলে মনে হতে পারে। প্রশ্ন হলো, আলো যদি কেবল ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে ভ্রমণ করে থাকে, তবে আমরা ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের অঞ্চলগুলো কীভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারি? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের মধ্যে। আমরা জানি, আলো যে স্থানের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে, একটু বড় পরিসরে দেখলে সেই স্থান নিজেই সম্প্রসারিত হচ্ছে।

আমাদের মহাবিশ্ব যদি স্থির হতো, তাহলে হয়তো হিসাবটা একটু সোজা হতো। এক বছরে আলো এক আলোকবর্ষ দূরত্ব অতিক্রম করে, তাই ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পর সবচেয়ে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চলটি ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষের বেশি দূরে থাকার কথা নয়।

আমাদের মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে
ছবি: নাসা

কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। এই গতিশীল স্থানকালকে বর্ণনা করার জন্যই রয়েছে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে গ্যালাক্সিগুলো মহাকাশের ভেতর একে অপরের থেকে দ্রুতগতিতে দূরে সরে যাচ্ছে না, বরং তাদের মাঝখানে থাকা ফাঁকা স্থান ক্রমশ আকারে বড় হচ্ছে।

আরও পড়ুন
এক বছরে আলো এক আলোকবর্ষ দূরত্ব অতিক্রম করে, তাই ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পর সবচেয়ে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চলটি ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষের বেশি দূরে থাকার কথা নয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক দূরত্ব বোঝার সুবিধার্থে দূরত্বের বিভিন্ন সংজ্ঞা ব্যবহার করেন। যেমন লুকব্যাক টাইম আমাদের বোঝায়, আলো কোনো বস্তু থেকে আমাদের কাছে পৌঁছাতে প্রকৃতপক্ষে ঠিক কতটা সময় নিয়েছে। অন্যদিকে কোমুভিং দূরত্ব দেখায়, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বিবেচনা করে মহাজাগতিক বস্তুগুলো বর্তমানে ঠিক কত দূরে রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ল্যাম্বডা-সিডিএম মডেল অনুযায়ী, দিগন্ত বা পার্টিকেল হরাইজনের ব্যাসার্ধ প্রায় ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। যদিও মহাজাগতিক প্যারামিটারগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই মানের সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।

এই ফলাফলের গাণিতিক রহস্য লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের স্কেল ফ্যাক্টরের মধ্যে। এটি মূলত মহাজাগতিক দূরত্ব পরিমাপের একটি আপেক্ষিক সূচক, যা আমাদের জানায় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব কতটা প্রসারিত বা সংকুচিত হচ্ছে। সহজ কথায়, কোমুভিং দূরত্ব হলো এমন একধরনের পরিমাপ, যা মহাবিশ্বের স্থান প্রসারণের প্রভাবকে বাদ দিয়ে দুটি বস্তুর মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রসারণের হারকে ধ্রুবক হিসেবে ধরে রাখে।

শুরুর দিকের ছোট মহাবিশ্বের সেই সামান্য দূরত্বও প্রসারণের ফলে আজকের দিনে এক বিশাল কোমুভিং দূরত্বে রূপান্তরিত হয়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ঠিক যেমন বেলুনের গায়ে আঁকা দুটি ফোঁটার মধ্যকার গ্রিড-পয়েন্টের নম্বর বদলায় না। যদিও বেলুনটি ফুললে আসল দূরত্ব বেড়ে যায়। আলো যখন দূরবর্তী কোনো গ্যালাক্সি থেকে আমাদের দিকে আসতে থাকে, তখন স্থান নিজেই প্রসারিত হতে থাকায় আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব কেবল সময় আর আলোর বেগের গুণফল থাকে না। শুরুর দিকের ছোট মহাবিশ্বের সেই সামান্য দূরত্বও প্রসারণের ফলে আজকের দিনে এক বিশাল কোমুভিং দূরত্বে রূপান্তরিত হয়। ফলে মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর হলেও, প্রসারণের সম্পূর্ণ ইতিহাস যুক্ত হয়ে এর আজকের কোমুভিং ব্যাসার্ধ বা বর্তমান সীমানা প্রায় ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষে পৌঁছেছে।

আরও পড়ুন
সহজ কথায়, কোমুভিং দূরত্ব হলো এমন একধরনের পরিমাপ, যা মহাবিশ্বের স্থান প্রসারণের প্রভাবকে বাদ দিয়ে দুটি বস্তুর মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রসারণের হারকে ধ্রুবক হিসেবে ধরে রাখে।

মহাবিশ্বের ইতিহাস জানার অন্যতম প্রধান উপকরণ কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি। এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ, যা বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্ব কিছুটা ঠান্ডা হলে মহাশূন্যে মুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিগ ব্যাংয়ের পর শুরুর দিকে মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং সমগ্র মহাবিশ্বজুড়ে ঘন এক প্লাজমা অবস্থা বিরাজ করছিল। সেখানে ইলেকট্রন এবং প্রোটন বা নিউক্লিয়াসগুলো বিচ্ছিন্নভাবে তীব্র বেগে ছুটাছুটি করছিল। আলোককণা বা ফোটন যখনই তৈরি হচ্ছিল, তখনই সেগুলো উন্মুক্ত ইলেকট্রনগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটকে যাচ্ছিল। ফলে আলো কোথাও দূরে ভ্রমণ করতে পারছিল না। অনেকটা কুয়াশার মধ্যে যেমন আলোর রশ্মি আটকে যায়, ঠিক তেমনি পুরো মহাবিশ্ব ছিল আলোর জন্য এক অদৃশ্য কুয়াশার চাদরে ঢাকা।

মহাবিশ্বের ইতিহাস জানার অন্যতম প্রধান উপকরণ কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি
ছবি: উইকিপিডিয়া

বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে প্রায় ৩ হাজার কেলভিনে নেমে আসে। এই তাপমাত্রায় ইলেকট্রন এবং নিউক্লিয়াসগুলো একত্র হয়ে স্থায়ী হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করতে শুরু করে। অর্থাৎ তখন পুনঃসংযোজন শুরু হয়ে যায়। কুয়াশা কেটে যাওয়ার মতো মহাবিশ্ব তখন হঠাৎ ফাঁকা এবং স্বচ্ছ হয়ে যায়। ফোটন বা আলোককণাগুলো বাধা না পেয়ে মহাশূন্যে মুক্তভাবে যাত্রা শুরু করে। আলো প্রথম মুক্ত হওয়ার এই মুহূর্তকে বলে সারফেস অব লাস্ট স্ক্যাটারিং। আজকের দিনে আমরা টেলিস্কোপে যে সিএমবি দেখি, তা মূলত ওই মুহূর্তেরই বিকিরণ। যদিও এটি বিগ ব্যাংয়ের একদম শুরুর মুহূর্তের আলো নয় এবং এর অবস্থান আমাদের তাত্ত্বিক পার্টিকেল হরাইজনের কিছুটা ভেতরে, তবুও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইটে ধারণকৃত এই বিকিরণের সূক্ষ্ম পরিমাপই নিশ্চিত করেছে, মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর।

আরও পড়ুন
কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ, যা বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্ব কিছুটা ঠান্ডা হলে মহাশূন্যে মুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষের এই চিত্রটিই কিন্তু পুরো মহাবিশ্ব নয়, এটি কেবল পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চলের বর্ণনা দেয়। বিশেষত মহাবিশ্বের যেসব অংশ থেকে সংকেত আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে, যেসব সংকেত মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের তথ্য বহন করে আসছে, এটি শুধু তার হিসাব। পৃথিবী থেকে ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে কোনো দৃশ্যমান প্রাচীর নেই এবং পৃথিবী কোনো বিশেষ কেন্দ্রীয় জায়গায়ও অবস্থান করে না। মহাবিশ্বের অন্য কোথাও যেকোনো পর্যবেক্ষকের ক্ষেত্রে তাঁদের কেন্দ্র করে একটি নিজস্ব পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব রয়েছে।

পৃথিবী থেকে ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে কোনো দৃশ্যমান প্রাচীর নেই
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের কণা দিগন্তের বাইরে যা রয়েছে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের উপযোগী নয়। আসলে পুরো মহাবিশ্বটি বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণযোগ্য অংশের চেয়ে আকারে অনেক বড় হতে পারে। অন্যভাবে বলা যায়, এর স্থানিক ব্যাপ্তি অসীমও হতে পারে। বর্তমান পরিমাপগুলো এর মোট আকার নির্ধারণ করতে পারে না। আসলে মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর হলেও, মহাবিশ্বের অত্যন্ত দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে স্পেসটাইমের সম্প্রসারণের আপেক্ষিক গতি আলোর গতির চেয়েও বেশি হওয়ার কারণে আমরা আজ ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের সীমা পর্যন্ত বস্তু দেখতে পাই। আর এই সীমার ওপারে কী আছে, তা আলো এখনো আমাদের কাছে না পৌঁছানোর কারণে সরাসরি দেখা সম্ভব নয়।

লেখক: গবেষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বিচার সহায়ক বিজ্ঞান পরীক্ষাগার, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন