মহাকাশে দূষণ

১৯৫৭ সাল। কয়েক মাস ধরে আকাশে একটি নতুন ‘তারা’ দেখা যাচ্ছে। তবে এই তারা মানুষের তৈরি। নাম স্পুটনিক-১। পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। পাঠিয়েছে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। কয়েক মাস পর্যন্ত একে খালি চোখে সহজেই দেখা যেত। রাতের আকাশের ১৫তম উজ্জ্বল নক্ষত্র চিত্রার মতো লাগত একে।

নিক্ষেপের ঠিক তিন মাস পর ১৯৫৮ সালের ৪ জানুয়ারি পুনরায় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায় উপগ্রহটি। তবে যে রকেট উপগ্রহটিকে কক্ষপথে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেটি কিন্তু থেকে যায় কক্ষপথেই। এটিই ইতিহাসের প্রথম স্পেস জাঙ্ক বা মহাশূন্য আবর্জনা। মহাশূন্য জয়ের পাশাপাশি মহাশূন্য-দূষণে মানুষের ভূমিকাও সেখানেই শুরু।

২০১৬ সালের এক হিসাব অনুসারে বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে ১৭ হাজার ৮৫২টি কৃত্রিম বস্তু। এর সবই কাজে লাগে ভাবলে বড্ড ভুল হবে। এতগুলো উপগ্রহের মধ্যে বর্তমানে কাজে লাগে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৪০০। বাকি সব কিন্তু আবর্জনা। তবে এখানে যা বললাম, বাস্তবে আবর্জনার পরিমাণ আরও বেশি। এই ১৭ হাজার হলো বড় আকারের বস্তুগুলোর পরিমাণ। যেগুলো সহজেই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু ২০১৩ সালের এক হিসাব অনুসারে, ১ সেন্টিমিটারের ছোট আবর্জনার সংখ্যাই ১৭ কোটি। ১ থেকে ১০ সেন্টিমিটার আকারের এমন বস্তু ৬ লাখ ৭০ হাজার। আর এর চেয়েও বড় আকারের বস্তুর সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার। সব মিলিয়ে আবর্জনার মোট ভর সাড়ে ৫ হাজার টন। ১০০ কেজি ভরের আবর্জনাই আছে ১ হাজার ৫০০-এর বেশি।

আবর্জনার একটি উৎসের কথা তো বলাই হলো। উপগ্রহকে বয়ে নিয়ে যাওয়া রকেট। অনেক ক্ষেত্রেই রকেট হয় মাল্টিস্টেজের। একের পর এক রকেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যানের বেগ বৃদ্ধি করে। আরেকটি উত্স উপগ্রহ নিজেই। কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানোর কিছু সময় পর উপগ্রহের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে। তখন আর একে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। কখনো আবার উপগ্রহ নিজে থেকেই অচল হয়ে পড়ে। উপগ্রহরা নিজে নিজে আবার কাঙ্ক্ষিত কক্ষপথে টিকে থাকতে পারে না। নানা কারণে এর গতিপথ বদলে যেতে পারে। সে জন্য পৃথিবী থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময় পরে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। জ্বালানি ফুরিয়ে যেতে পারে। কোনো যন্ত্রাংশ বা সমগ্র উপগ্রহই হয়ে পড়তে পারে অচল। আরও নানা কারণে এটি পরিণত হয় আবর্জনায়।

সাধারণত গড়ে একটি উপগ্রহ ৩ থেকে ৪ বছর কাজে লাগে। ১৯৫৮ সালে মহাকাশে নিক্ষেপ করা হয় ভ্যানগার্ড-১ উপগ্রহ। মহাশূন্যে পাঠানো ৪র্থ উপগ্রহ এটি। তবে তার চেয়ে মজার কথা হলো, এখনো কক্ষপথে ঘুরপাক খেতে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন বস্তু এটি। পাঠানো হয়েছিল মূলত থ্রি-স্টেজ লঞ্চ ভেহিকেলের পরীক্ষা চালানোর জন্য। এ ছাড়া মহাশূন্যে ও কক্ষপথে থাকা অবস্থায় উপগ্রহের কী পরিণতি হয়, সেটা দেখাও ছিল উদ্দেশ্য। খরচ বা টেকনিক্যাল কারণে অনেক সময় এমন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পাঠানো উপগ্রহকে একাধিক কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। তাই শেষ পর্যন্ত আবর্জনা না হয়ে এর কোনো উপায় থাকে না।

আবর্জনার খুব বড় আরেকটি উত্স হলো উপগ্রহ ধ্বংসের পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন কেউ কারও চেয়ে কম যায়নি এ কাজে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি অকার্যকর গোয়েন্দা উপগ্রহ ধ্বংস করার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ৪৫০ কেজি ভরের উপগ্রহটির অবস্থান ছিল ২৫০ কিলোমিটার ওপরে। ২০০৭ সালে চীন অ্যান্টিস্যাটেলাইট মিসাইল টেস্ট পরিচালনা করে। এতে গলফ বল আকারের ২ হাজার ৩০০ খণ্ড আবর্জনা তৈরি হয়। পাশাপাশি এর চেয়ে ছোট আকারের আবর্জনা সব মিলিয়ে তৈরি হয় ১০ লাখ খণ্ডের ওপরে।

ছোট হলেও আবর্জনার আরেকটি বড় উত্স হলো হারানো জিনিসপত্র। মার্কিন নভোচারী এড হোয়াইট যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্রথম স্পেসওয়ার্কের সময় একটি দস্তানা হারিয়ে ফেলেন। জেমিনি ১০ মিশনের সময় মাইকেল কলিন্স হারান একটি ক্যামেরা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় হারিয়েছে টুথব্রাশ, ব্যাগ, সোলার প্যানেল, প্লায়ার্স, ব্রিফকেস ইত্যাদি।

কক্ষপথের এসব আবর্জনার ফলে সৃষ্টি হয় নানা রকমের সমস্যা। বর্তমানে টেনিস বলের চেয়ে বড় আকারের বস্তুর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এরা ঘণ্টায় ১৭ হাজার ৫০০ মাইল বেগে কক্ষপথে চলছে। প্রচণ্ড এই বেগ যেকোনো উপগ্রহ বা মহাকাশযানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট। এমনকি মার্বেলের সমান আবর্জনাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে মহাকাশযানকে। তার ওপর রয়েছে এমন অসংখ্য আবর্জনা, যেগুলো শনাক্তই করা যায় না।

১৯৯৬ সালে ফ্রান্সের একটি উপগ্রহ এমন আবর্জনার কবলে পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, যার সঙ্গে উগগ্রহের ধাক্কা লেগেছিল, সেটিও ছিল এক যুগ আগে ফ্রান্সেরই পাঠানো অপর একটি রকেটের ধ্বংসাবশেষ। ২০০৯ সালে রাশিয়ার একটি অচল স্যাটেলাইট যুক্তরাষ্ট্রের একটি সক্রিয় উপগ্রহের সঙ্গে ধাক্কা লাগায়। অকার্যকর হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহটি। উপরন্তু এই সংঘর্ষে আরও ২ হাজার শনাক্তযোগ্য আবর্জনার খণ্ড প্রস্তুত হয়। ২০০৭ সালে চীন পুরোনো উপগ্রহ ধ্বংস করার একটি উদ্যোগ নেয়। প্রচেষ্টাটি এক অর্থে বুমেরাং হয়। নতুন করে তৈরি হয় ৩ হাজার খণ্ড আবর্জনা।

সংঘর্ষের বড় একটা অসুবিধাই হলো একের পর এক সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা। একটি ধাক্কায় যে গোল বাধল, তাতে হতে পারে আরেকটি সংঘর্ষ, তাতে আরেকটি, তাতে আরেকটি ইত্যাদি। এ সম্ভাবনার নাম কেসলার ইফেক্ট।

অনেক সময় আবর্জনার উপস্থিতির কারণে নতুন মহাকাশযান বা উপগ্রহ নিজের কক্ষপথের দিকে এগিয়ে যেতেই বাধার মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) মতো মহাকাশ স্টেশনগুলোর জন্যও এসব আবর্জনা একটি হুমকি। আইএসএসে অবশ্য আবর্জনা থেকে সুরক্ষার কিছু ব্যবস্থা আছে। তবে মহাকাশ স্টেশনগুলোর সোলার প্যানেলও ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। সোভিয়েত মহাকাশ স্টেশন মির একবার এমন সংঘর্ষে পড়লে বিকল হয়ে যায় এক পাশের সোলার প্যানেল।

এসব আবর্জনা যে শুধু মহাকাশযান আর উপগ্রহেরই ক্ষতি করে তা নয়। বড় বড় আবর্জনার খণ্ডগুলো নেমে আসতে পারে পৃথিবীতেও। ১৯৬৯ সালে জাপানের ৫ জন নাবিক এভাবে আহত হন। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় একজন মহিলা এমন একটি আঘাতের মুখোমুখি হন। পরে জানা যায়, এক বছর আগে নিক্ষিপ্ত ডেল্টা ২ রকেটের অংশ ছিল খণ্ডটি। বস্তুটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ৪ ও ৫ ইঞ্চি করে লম্বা ছিল। এ রকম আরও কিছু ঘটনা ঘটলেও এ পর্যন্ত অবশ্য হতাহতের বা বড় কোনো আঘাতের ঘটনা ঘটেনি।

অপ্রয়োজনীয় উপগ্রহ যাতে পরবর্তী কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সে জন্য সাধারণত দুটি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উপগ্রহ যদি পৃথিবীর খুব কাছে থাকে, তাহলে এর সর্বশেষ জ্বালানিটুকু ব্যবহার করে এর গতি কমানো হয়। ফলে এটি কক্ষপথ ছেড়ে নিচে নেমে আসে। প্রবেশ করে বায়ুমণ্ডলে। বায়ুর সঙ্গে সংঘর্ষে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায়। তবে এ কৌশলটি কাজে লাগে অপেক্ষাকৃত ছোট বস্তুদের ক্ষেত্রে। স্পেস স্টেশন বা বড় মহাকাশযানের মতো বস্তুগুলো এত সহজে ধ্বংস হওয়ার নয়। এরা পৃথিবীর বুকে চলে আসবে। এ ক্ষেত্রে সমাধান হলো এদের নির্জন এলাকায় নামিয়ে আনা। প্রশান্ত মহাসাগরের একটি জায়গা এ কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। একে আবার স্পেসক্র্যাফট সিমেট্রি বা মহাকাশযানের সমাধিও বলা হয়।

তবে উপগ্রহ দূরে থাকলে এর কক্ষপথ পরিবর্তন করে বায়ুমণ্ডলের মতো নিচে নামিয়ে আনতে অনেক বেশি জ্বালানি প্রয়োজন। তখন নামিয়ে আনার চেয়ে বরং এর গতিপথ পরিবর্তন করে বাইরের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটি চলে যায় আরও দূরের নির্জন কক্ষপথে। এই কক্ষপথেরও একটি নাম আছে। গ্রেভইয়ার্ড অরবিট বা গোরস্থান কক্ষপথ। সক্রিয় কোনো কক্ষপথের অবস্থান থেকে জায়গাটি অন্তত ২০০ মাইল দূরে। ভূপৃষ্ঠ থেকে দূরত্ব ২২ হাজার ৪০০ মাইল। সক্রিয় উপগ্রহগুলোকে এরা আর বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।

অন্যদিকে স্পেস জাঙ্ক সরানোর জন্য জাপান ও ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ম্যাগনেটিক জালের কথা ভাবছে। জিনিসটা অনেকটা মাছ ধরার জালের মতো। চিন্তাভাবনা চলছে কীভাবে উঁচু অবস্থানে টেনে নিয়ে এসে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘাত ঘটিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া যায়। পরিকল্পনা রয়েছে লেজার রশ্মি দিয়ে ধ্বংস করারও। তবে সবচেয়ে ভালো একটি বুদ্ধি হলো থ্রি-আর (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল)। মানে আবর্জনা কমাতে হবে ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। আর এদিকে, আধুনিক মহাকাশযানগুলোতে আবর্জনা শনাক্ত ও এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।