উইলসন ও পালোমার পর্বত মানমন্দির

উইলসন মানমন্দির

উইলসন ও পালোমার পর্বত মানমন্দির বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান দুটি মানমন্দির। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনেক বড় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন এ দুটি মানমন্দিরে বসে। উইলসন পর্বত মানমন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৯১৭ সালে, আমেরিকার প্যাসাডনার কাছাকাছি উইলসন পর্বতের ওপর, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৭৪০ মিটার উচ্চতায়। দুরবিনসহ মানমন্দিরের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ ইলেরি হালে। তিনি এর আগেও ইয়ার্কিজ মানমন্দিরের ৪০ ইঞ্চি ব্যাসের একটি বৃহৎ দুরবিন নির্মাণ করেছিলেন। মানমন্দির নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন ওয়াশিংটনের স্বনামধন্য কার্নেগি প্রতিষ্ঠান।

উইলসন মানমন্দিরে বসানো আছে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি দুরবিন। এর একটি হলো ১০০ ইঞ্চি (২ দশমিক ৫ মিটার) ব্যাসবিশিষ্ট হুকার দুরবিন। অপরটি ৬০ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট হালে দুরবিন। পালোমার মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ১০০ ইঞ্চি হুকার দুরবিনটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলক দুরবিন। দুরবিনে চোখ রেখে এর প্রথম আলো দেখেন কবি আলফ্রেড নয়েস। ওই রাতে প্রথম যে বস্তু তিনি দেখেন, তা হলো বৃহস্পতি আর এর চাঁদ। কবির জন্য তাই রাতটি ছিল বিশেষ স্মরণীয়। তিনি বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে লেখেন একটি মহাকাব্য। পরে এডুইন হাবল, মিল্টন হুমাসন, হার্লো শার্পলির মতো প্রথিতযশা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই মানমন্দিরে বসে আকাশ পর্যবেক্ষণ করেন।

পালোমার মানমন্দির

দুরবিনের সাহায্যে মহাকাশের প্রচুর আলোকচিত্র তোলেন তাঁরা। এর মধ্যে রয়েছে এম৩১ নামের একটি গ্যালাক্সির ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। এটা আসলে আমাদের প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ছবি। আলোকচিত্রটি বিশ্লেষণ করে হাবল দেখান যে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র।

এ ছাড়া হাবল ও জর্জ হুমাসন বেশ কিছু গ্যালাক্সির বর্ণালির রক্তিম সরণ (রেড শিফট) পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখেন, এ রক্তিম সরণ, অর্থাৎ বর্ণালির লাল তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে দ্রুতগতিতে সরে যাচ্ছে প্রায় সব গ্যালাক্সি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আরও জানান, আমাদের এ মহাবিশ্ব কোটি কোটি গ্যালাক্সি দ্বারা গঠিত। আবার একেকটি গ্যালাক্সিতে রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্র। একই সঙ্গে আমাদের ছায়াপথে সূর্যের অবস্থানও নির্ণয় করেন তাঁরা। বলেন, সূর্যের অবস্থান আমাদের ছায়াপথ বা আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে নয়, কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে। এসবই জানা সম্ভব হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান থেকে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে আমেরিকার পালোমার পর্বত মানমন্দির থেকে। মানমন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৯২৮ সালে। তবে পুরোপুরি অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৮ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের পালোমার পর্বতের ওপরে। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৭১২ মিটার। এটি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা ক্যালটেকের নিজস্ব মানমন্দির। এর অপর দুই সহযোগী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো আমেরিকার বিখ্যাত জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়। দুরবিনসহ মানমন্দিরের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ ইলেরি হালে। এটা স্থাপনের জন্য মোটা অঙ্কের আর্থিক অনুদান দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত রকফেলার ফাউন্ডেশন।

পালোমার মানমন্দিরে ভেতরের চিত্র

পালোমার মানমন্দিরে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রতিফলক দুরবিন। এর ব্যাস হলো ২০০ ইঞ্চি (৫ মিটার)। ১৯৪৯ সালে হাবল প্রথম এই দুরবিন দিয়ে এনজিসি ২২৬১ নীহারিকার আলোকচিত্র তুলতে সক্ষম হন। নীহারিকাটি মনোসেরাস বা একশৃঙ্গী মণ্ডলে অবস্থিত। এ ছাড়া দুরবিন দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তিনি ১০০ কোটির বেশি গ্যালাক্সির সন্ধান পান। সন্ধান পান আমাদের ছায়াপথের বাইরের শেফালি বিষম তারারও। পরে এসব তারার সাহায্য নিয়ে ছায়াপথগুলোর দূরত্ব নির্ণয় করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

এ ছাড়া মানমন্দিরে বসে বিজ্ঞানীরা মহাকাশের দুর্বোধ্য জ্যোতিষ্ক কোয়াসার, প্রথম আবিষ্কৃত বাদামি বামন নক্ষত্র এবং বামন গ্রহ এরিস আবিষ্কার করেন। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বামন গ্রহের মধ্যে এরিস সবচেয়ে বড়। যৌথভাবে আবিষ্কার করেন মাইক ব্রাউন, চাদ ট্রুজিলো ও ডেভিড র৵াবিনোউইত্জ। মানমন্দিরের ৪৮ ইঞ্চি ব্যাসের স্যামুয়েল ওশিন দুরবিন দিয়ে এটি প্রথম শনাক্ত করেন তাঁরা। আবিষ্কারের সময় এর সাংকেতিক নাম ছিল ‘২০০৩ ইউবি ৩১৩’। পরে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) ২০০৬ সালে একে আনুষ্ঠানিকভাবে এরিস নাম দিয়ে সৌরজগতের বামন গ্রহের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। গ্রিক পুরাণের বিবাদ ও কলহের দেবীর নামানুসারে এর নামকরণ হয় এরিস।

মানমন্দিরের প্রথম পরিচালক ছিলেন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইরা স্প্রাগু বাওয়েন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পালোমার মানমন্দিরে দায়িত্ব পালনের আগে বাওয়েন যুক্ত ছিলেন উইলসন মানমন্দিরের সঙ্গে।

লেখক: শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও সংগঠক