চাঁদের নমুনা কেনাবেচা কি বেআইনি

১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অ্যাপোলোর ছয়টি মিশনে নভোচারীরা চাঁদ থেকে পৃথিবীতে অনেক নমুনা নিয়ে এসেছেছবি: ব্রেট কুমার / হিউস্টন ক্রোনিকল / গেটি ইমেজ

ইন্টারনেটে তো প্রতিদিন কত কিছু বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। উৎসাহী অনেক মানুষ চাঁদের জমিও কিনে নিয়েছেন নিজের নামে। যদিও চাঁদের জমি বিক্রির অধিকার কারো নেই, কারণ চাঁদ কোনো নির্দিষ্ট দেশের সম্পত্তি নয়। কিন্তু চাঁদের মাটি বিক্রির বিজ্ঞাপন কি দেখেছেন? কেউ হয়তো দাবি করছে, এগুলো অ্যাপোলো মিশনের আনা আসল পাথর! এমন বিজ্ঞাপন দেখলে একটু সাবধানে থাকবেন। কারণ, নাসার আনা চাঁদের পাথর খোলাবাজারে বিক্রি হয় না। কেউ এগুলো বেচাকেনা করতে গেলে তার কপালে দুঃখ আছে!

২০০২ সালের কথা। নাসার তিন শিক্ষানবিশ মিলে এক ভয়ংকর কাণ্ড করে বসল। থ্যাড রবার্টস, টিফানি ফাউলার এবং শায়ে সাউর জনসন স্পেস সেন্টার থেকে প্রায় ৮ কেজি চাঁদের পাথর চুরি করে! এর দাম ছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

কীভাবে করল তারা এই কাজ? ক্যামেরার সঙ্গে কারসাজি করে। বিশেষ বডি স্যুট পরে এবং নাসার ভুয়া ব্যাজ ঝুলিয়ে তারা এই মিশন সফল করেছিল। কিন্তু চোর তো চুরি করেই বিপদে পড়ল! কালোবাজারে এগুলো বিক্রি করা মোটেও সহজ ছিল না।

থ্যাড রবার্টস, টিফানি ফাউলার এবং শায়ে সাউর জনসন স্পেস সেন্টার থেকে প্রায় ৮ কেজি চাঁদের পাথর চুরি করে!
ছবি: মিটিওরাইট টাইমস ম্যাগাজিন

শেষমেশ তারা বেলজিয়ামের এন্টওয়ার্প মিনারেলজি ক্লাবের ওয়েবসাইটে এগুলো বিক্রির বিজ্ঞাপন দিল। তখন মাঠে নামল এফবিআই। তারা ক্রেতা সেজে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর একটি হোটেলে চোরদের সঙ্গে দেখা করল। ব্যস, হাতেনাতে ধরা পড়ল সবাই। উদ্ধার হলো চাঁদের পাথর। মূল হোতা রবার্টসের আট বছরের জেল হলো। আর বাকিদের হলো গৃহবন্দী দশা।

আরও পড়ুন
২০০২ সালের কথা। নাসার তিন শিক্ষানবিশ থ্যাড রবার্টস, টিফানি ফাউলার এবং শায়ে সাউর জনসন স্পেস সেন্টার থেকে প্রায় ৮ কেজি চাঁদের পাথর চুরি করে! এর দাম ছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

নাসার লুনার স্যাম্পল ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটিতে এগুলো রাখা হয়। এটি টেক্সাসের হিউস্টনে জনসন স্পেস সেন্টারের ৩১এন ভবনে অবস্থিত। ১৯৭৯ সালে এটি চালু হয়। উদ্দেশ্য ছিল চাঁদের মহামূল্যবান পাথরগুলো যেন দূষণমুক্ত থাকে এবং নিরাপদে রাখা যায়।

১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অ্যাপোলোর ছয়টি মিশনে নভোচারীরা চাঁদ থেকে পৃথিবীতে অনেক নমুনা নিয়ে এসেছেন। তাঁরা সঙ্গে এনেছিলেন পাথর, বালি ও ধুলো। সব মিলিয়ে এর ওজন ছিল ৩৮২ কেজি! শুধু অ্যাপোলো ১৭ মিশনেই আনা হয়েছিল প্রায় ১১০ কেজি চাঁদের মাটি ও পাথর।

এই ল্যাবে যারা কাজ করেন, তারা খুবই সতর্ক। চাঁদের পাথর কেনাবেচা নিয়ে তাঁরা সহজে মুখ খুলতে চান না। নাসার কাছে প্রতিটি পাথরের নিখুঁত হিসাব আছে। অ্যাপোলো ক্যাপসুলে করে আসা প্রতিটি জিনিসের ক্যাটালগ তৈরি করা আছে।

পাথরগুলো এমনভাবে রাখা হয় যাতে এগুলোতে কোনো জং বা ময়লা না ধরে। স্টেইনলেস স্টিলের বিশেষ ক্যাবিনেটে রাখা হয় এগুলো। তিন স্তরের গ্লাভস পরে তবেই এগুলোতে হাত দেওয়া যায়। আর পাথরগুলোকে বিশুদ্ধ নাইট্রোজেন গ্যাসে ডুবিয়ে রাখা হয়, যাতে পৃথিবীর বাতাস এগুলোকে নষ্ট করতে না পারে।

আরও পড়ুন
১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অ্যাপোলোর ছয়টি মিশনে নভোচারীরা চাঁদ থেকে পৃথিবীতে অনেক নমুনা নিয়ে এসেছেন। তাঁরা সঙ্গে এনেছিলেন পাথর, বালি ও ধুলো।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব নমুনা কেনাবেচা কি সত্যিই বেআইনি? সোজা উত্তর হলো, হ্যাঁ! অ্যাপোলো মিশনের আনা কোনো কিছু বেচাকেনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি একটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় অপরাধ। এর জন্য জেল ও বিশাল অঙ্কের জরিমানা হতে পারে। চাঁদের পাথর নাসা এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সম্পত্তি। কোনো সাধারণ নাগরিক তো দূর, খোদ নভোচারীরাও এগুলো বিক্রি বা বিনিময় করতে পারেন না। তবে মহাকাশ থেকে প্রাকৃতিকভাবে আসা চাঁদের উল্কাপিণ্ডের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটবে না।

তা ছাড়া চাঁদের পাথর পাচারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি কড়া আইন আছে: এক, নাসার সম্পত্তি চুরি বা আত্মসাৎ করা মারাত্মক অপরাধ। দুই, চাঁদের পাথরকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ ধরা হয়। এই আইনে কোনো জাদুঘর বা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব চুরি করা এবং বিক্রি করা নিষিদ্ধ। তিন, চুরি করা পাথরের দাম যদি ৫ হাজার ডলারের বেশি হয় এবং তা এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে নেওয়া হয়, তবে পাচারের মামলাও যুক্ত হয়।

অ্যাপোলো মিশনের চাঁদ থেকে আনা কোনো কিছু বেচাকেনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি
ছবি: নাসা / জনসন স্পেস সেন্টার

এত নিরাপত্তার পরও নাসা কিন্তু মানুষকে এগুলো নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ দেয়। তবে শর্ত আছে। শিক্ষক বা বিজ্ঞানীদের নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে গিয়ে একটা বিশেষ কর্মশালায় অংশ নিতে হয়। এই ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার কর্মশালায় পাথরগুলোর যত্ন নেওয়া এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখানো হয়।

আরও পড়ুন
চাঁদের পাথর নাসা এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সম্পত্তি। কোনো সাধারণ নাগরিক তো দূর, খোদ নভোচারীরাও এগুলো বিক্রি বা বিনিময় করতে পারেন না।

প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা প্লাস্টিকে মোড়ানো কিছু পাথরের নমুনা ধার নিতে পারেন। গবেষণার প্রয়োজনে তাঁরা এগুলো খুলেও দেখতে পারেন। কাজ শেষ হলে অবশিষ্ট অংশ নাসাকে ফেরত দিতে হয়। তখন এগুলোকে আলাদা ভাবে ‘ফেরত আসা’ নমুনা হিসেবে জমা রাখা হয়।

নাসার বিশেষজ্ঞ এবং অ্যাপোলো রিমাস্টারড বইয়ের লেখক অ্যান্ডি সন্ডার্স জানিয়েছেন, ‘এই পাথরগুলো এখনো কাজে লাগছে। ২০২২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের একটি নমুনা প্রথমবারের মতো খোলা হয়। ৫০ বছর ধরে সেটি সিল করা ছিল! কী দারুণ ব্যাপার, তাই না? আমরা এখনো অ্যাপোলো মিশন থেকে নতুন নতুন জিনিস শিখছি।

২০২২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের একটি নমুনা প্রথমবারের মতো খোলা হয়
ছবি: নাসা / রবার্ট মার্কোভিটজ

অনেকেই হয়তো শখ করে চাঁদের একটুখানি পাথর বা ধুলো নিজের কাছে রাখতে চাইবেন। কিন্তু সরকারের এই কড়া নিয়ম করা হয়েছে শুধু কালোবাজারি থামানোর জন্য। তাই সোজা নিয়ম হলো, কোনো পাথর নাসার অ্যাপোলো মিশন থেকে আনা হলে সেটা কেনার কথা মাথাতেও আনবেন না! ওই ছোট্ট একটু চাঁদের ধুলো আপনাকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দিতে পারে!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: স্পেস ডটকম

আরও পড়ুন