মঙ্গল গ্রহের প্রাণ নাকি ভুল করে মেরে ফেলেছে নাসা, দাবি গবেষকদের

নাসার ভাইকিং ল্যান্ডারের একটি মডেল; পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সাগানছবি: নাসা

আমরা এখনো হন্যে হয়ে মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান করছি। কিন্তু যদি এমন হয় যে মানুষ আজ থেকে ৫০ বছর আগেই মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেয়েছিল, আর না বুঝেই হয়তো তা মেরেও ফেলেছে!

এটুকু শুনে কোনো সায়েন্স ফিকশন বা মুভি রিভিউ ভাবতে পারেন। কিন্তু বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডার্ক শুলজ-মাকুচ এবং তাঁর সহযোগী গবেষকেরা সম্প্রতি এমন এক দাবিই করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে অ্যাস্ট্রোবায়োলজি জার্নালে।

এই বিষয়টা বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। চলুন ১৯৭৬ সালে ফিরে যাই।

নাসার বিখ্যাত ভাইকিং মিশন তখন মঙ্গলের মাটি স্পর্শ করেছে। উদ্দেশ্য লাল গ্রহে প্রাণের খোঁজ করা। ভাইকিং ল্যান্ডার মঙ্গলের মাটি তুলে এনে কিছু বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা চালায়।

প্রথম পরীক্ষার ফলাফল বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছিল। সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের পক্ষে ইতিবাচক সাড়া মিলেছিল। বিজ্ঞানীরা প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ নিশ্চিত ছিলেন! মাটি থেকে গ্যাসের বুদবুদ বের হচ্ছিল, ঠিক যেমনটা কোনো জীবাণু শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার পরীক্ষাটি চালালেন, তখন আর কোনো সাড়া মিলল না। সব নিশ্চুপ।

তখন নাসার বিজ্ঞানীরা ধরে নিলেন, প্রথম ফলাফলটা ছিল ভুল। হয়তো পৃথিবী থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো দূষণ বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। ভাইকিং মিশনের ডিরেক্টর জেরাল্ড সোফেন তখন বলেছিলেন, ‘নো অর্গানিকস, নো লাইফ’। মানে জৈব অণু নেই, মানে প্রাণও নেই। ফাইলটা ওখানেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

কিন্তু ৫০ বছর পর বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা হয়তো ভুল ব্যাখ্যা করেছিলাম। নতুন গবেষণা বলছে, ভাইকিং ল্যান্ডার মঙ্গলের মাটিতে পানি এবং পুষ্টিকর উপাদান মিশিয়েছিল জীবাণুদের খাইয়ে দেখার জন্য।

পৃথিবীর লজিক অনুযায়ী এটা ঠিকই ছিল। কিন্তু মঙ্গলের পরিবেশ তো পৃথিবীর মতো নয়! সেখানকার জীবাণুরা (যদি থাকে) হয়তো প্রচণ্ড শুষ্ক পরিবেশে হাইবারনেশন বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। অধ্যাপক ডার্ক শুলজ-মাকুচ বলেন, ‘পৃথিবীর আটাকামা মরুভূমির মতো রুক্ষ জায়গাতেও জীবাণু থাকে। সেখানে যদি আপনি হঠাৎ করে প্রচুর পানি ঢেলে দেন, তবে ওই জীবাণুরা মরে যাবে। মঙ্গলেও হয়তো ঠিক তাই ঘটেছিল।’

সহজ কথায়, আমরা হয়তো মঙ্গলের ওই সম্ভাব্য জীবাণুদের অতিরিক্ত পানি খাইয়ে মেরে ফেলেছিলাম। তাই প্রথমবার সাড়া দিলেও দ্বিতীয়বার তারা আর বেঁচে ছিল না সাড়া দেওয়ার জন্য।

তখন ভাইকিং ল্যান্ডার মঙ্গলের মাটিতে কিছু বিশেষ জৈব যৌগ পেয়েছিল। যেগুলোকে নাসা তখন পৃথিবীর দূষণ ভেবেছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে ফিনিক্স ল্যান্ডার মঙ্গলে পারক্লোরেট নামে একধরনের লবণ খুঁজে পায়, যা মঙ্গলের নিজস্ব সম্পদ।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গলের ওই পারক্লোরেট লবণের সঙ্গে যদি জৈব অণু মেশে এবং উত্তপ্ত হয়, তবে ঠিক সেই ফলাফলই পাওয়া যায় যা ভাইকিং ১৯৭৬ সালে পেয়েছিল। অর্থাৎ, ওগুলো পৃথিবীর দূষণ ছিল না, মঙ্গলের নিজস্ব জিনিসই ছিল!

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য জীবাণুদের একটা দারুণ নাম দিয়েছেন, বারসুম (ব্যাকটেরিয়াল অটোট্রফ রেস্পায়ারিং উইথ স্টোর্ড অক্সিজেন অন মার্স)। নামটি নেওয়া হয়েছে এডগার রাইস বারোজের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস আ প্রিন্সেস অব মার্স থেকে। এই উপন্যাসে মঙ্গলকে ডাকা হয় বারসুম নামে।

গবেষকদের ধারণা, এই জীবাণুরা হয়তো দিনের বেলা সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং রাতে অক্সিজেন জমিয়ে রাখে। যখনই সামান্য আর্দ্রতা পায়, তখনই এরা জেগে ওঠে। ভাইকিং মিশনের পরীক্ষায় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি পেয়ে এরা হয়তো হতভম্ব হয়ে মারা পড়েছিল!

অবশ্যই বিজ্ঞানীরা হলফ করে বলছেন না যে ভাইকিং প্রাণ পেয়েই গিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা বলছেন, ৫০ বছর আগের ওই ফলাফলকে ‘ভুল’ বলে উড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি। যেহেতু মানুষ ভবিষ্যতে মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং সেখান থেকে মাটির নমুনা পৃথিবীতে আনার চেষ্টা চলছে, তাই এই পুরোনো ফাইলটা আবার ঘেঁটে দেখা জরুরি।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: অ্যাস্ট্রোবায়োলজি জার্নাল, বিগ থিংক ও লাইভ সায়েন্স