মহাকাশে মানুষের চোখ

রাতের আকাশে তারাদের আমরা কখনো মিটমিট করে জ্বলতে দেখি। কখনো উজ্জ্বলতা বাড়ছে, কখনো কমছে। সেটাকেই মনে হয় নিবুনিবু এক আলোকবিন্দু। এর কারণ কিন্তু তারার কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। হাজার কোটি মাইল পেরিয়ে তারা থেকে আলো পৃথিবীতে এসে আমাদের চোখে ধরা দেয়। সমস্যা বাধে একেবারে শেষ কয়েক মাইলে, মানে আমাদের বায়ুমণ্ডল পার হতে। বায়ুমণ্ডলে আলো বিচ্ছুরিত হয়, আবার কোথাও ঠান্ডা, কোথাও গরম বাতাসে আলো প্রতিসরিত হয়ে একদম অন্য পথে চলে যায়। এসবের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় আলোক তরঙ্গের বিশাল একটা অংশ বায়ুমণ্ডলে শোষিত হয়ে যাওয়াটা। ফলে জ্বলজ্বলে তারা আমাদের কবিত্বকে খানিকটা বাড়িয়ে দিলেও সমস্যায় পড়েন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। কোটি কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে আসা একটা তথ্য শেষ মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁদের বেশ দুঃখই করতে হতো। পৃথিবীপৃষ্ঠে অবস্থিত বিশালকায় টেলিস্কোপগুলোতে মহাকাশের তথ্য যতটুকু পাওয়া সম্ভব হতো, বায়ুমণ্ডল বাগড়া না দিলে ঠিক ততটুকু আর পাওয়া যেত না। বিংশ শতাব্দীর অর্ধেকটা পর্যন্ত এই ব্যাপারটা চলছিল।

১৯২৩ সালে হারমান ওবার্থ, রবার্ট এইচ গডার্ড ও কনস্ট্যানটিন সিওকভস্কি একটা ধারণা দেন, কেমন করে রকেটে চড়িয়ে একটা টেলিস্কোপকে পৃথিবীর উপগ্রহের মতো একটা কক্ষপথে স্থাপন করা যেতে পারে। তারপর সেখান থেকে পাওয়া যেতে পারে বায়ুমণ্ডলের বাধাবিহীন উন্নত রেজল্যুশনের মহাজাগতিক তথ্য। সেই ধারণা কাজে লাগিয়ে অনেক সংস্থাই কক্ষপথে নানা সময়ে টেলিস্কোপ স্থাপন করেছে। কিন্তু যান্ত্রিক উত্কর্ষ আর সক্ষমতার বিচারে সবগুলোই পিছিয়ে পড়েছে নাসা-ইসা এবং আরও কিছু সংস্থার যৌথভাবে নির্মিত চার গ্রেট অবজারভেটরির কাছে।

আমরা যেমন নানা রঙের আলো দেখি, যন্ত্রও তেমনটাই দেখে। গামা রশ্মি, এক্স রশ্মি, দৃশ্যমান আলো ও অবলাল রশ্মি-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিচারে আলোকে মোটামুটি এই চার ভাগে ভাগ করা যায়। তাই গ্রেট অবজারভেটরিও তৈরি করা হয়েছে চারটি। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে এরা দূর আকাশের দিকে চাতক পাখির দৃষ্টির মতো টেলিস্কোপ বাগিয়ে বসে থাকে। সৌরজগতের গ্রহগুলো কিংবা দূরের গ্যালাক্সি থেকে আসা যেকোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর বয়ে আনা গল্পগুলো চার অবজারভেটরি মিলেমিশে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয় উপাত্ত হিসেবে। সেগুলো গ্রাউন্ড স্টেশনে বসে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জেনে নেন তারার জন্ম, আকার, তাপমাত্রা, গ্যালাক্সির আকৃতিসহ নানা তথ্য।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ

নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত স্পেস টেলিস্কোপ এটি। এর জনপ্রিয়তার কারণ, এটি ছবি তোলে দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে। মানে, আমরা খালি চোখে দেখলে একটা গ্রহ বা নক্ষত্রকে যেমন দেখতে পেতাম, হাবল একটি ছবি প্রায় সেভাবেই তোলে। এই বিশাল মহাবিশ্বের সৌন্দর্য সরাসরি আমাদের সামনে তুলে ধরে জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবলের নামে নামকরণ করা এই টেলিস্কোপ। এর ২.৪ মিটার প্রতিফলক টেলিস্কোপের চারটি মূল যন্ত্র গ্রহণ করে অতিবেগুনির কাছাকাছি (Near UV), দৃশ্যমান ও অবলোহিত আলোর নিকটবর্তী (Near IR) তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি।

এই প্রজেক্টের বাজেট হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে। আর হাবলকে মহাকাশে পাঠানোর কথা ছিল ১৯৮৪ সালে। কিন্তু যন্ত্রাংশ তৈরিতে বারবার দেরি এবং পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে সময়মতো উড্ডয়ন সম্ভব হয়নি। মাঝখানে ১৯৮৬ সালে চ্যালেঞ্জার শাটল উড্ডয়নের সময় এক দুর্ঘটনায় সেটি ধ্বংস হয়ে সব ক্রু মারা যাওয়ায় নাসার সব কাজেই দেরি হয়ে যায় কিছুটা। বাজেট সমস্যার কারণে একসময় নাসার সঙ্গে যোগ দেয় ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA)। সবকিছু তৈরি করে ডিসকভারি স্পেস শাটলের সঙ্গে জুড়ে হাবল স্পেস টেলিস্কোপকে কক্ষপথে স্থাপন করা হয় ১৯৯০ সালে।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি দূর আকাশের নানান তারা, গ্যালাক্সি, কোয়াসার ইত্যাদির ঝলমলে সব ছবি। একেবারে শুরুতেই কিন্তু একটা সমস্যা দেখা গিয়েছিল। একদম শুরুর ছবিগুলোর মান পাওয়া গেল বেশ খারাপ। অন্তত একটা ২.৪ মিটার ব্যাসের রিচি-ক্রেটিয়া টেলিস্কোপের যেমন ছবি দেওয়ার কথা, তেমন ছবি মিলছিল না। বিন্দু উৎসে ফোকাস করতে সমস্যা পোহাতে হচ্ছিল এই টেলিস্কোপের। তাই ১৩.২ মিটার দৈর্ঘ্য আর ৪.২ মিটার প্রস্থের বিশাল এই ঘূর্ণমান অবজারভেটরিকে ডাকা হতে লাগল সাদা হাতি বলে।

কিন্তু সবার মুখে চুনকালি। এটি ইতিহাসের একমাত্র স্পেস টেলিস্কোপ, যেটি কক্ষপথে অবস্থানকালেই মেরামত করা যায়, এমনকি এর যন্ত্রও বদলানো যায়। প্রথমে ১৯৯৩ সালে এন্ডেভার স্পেস শাটলের সাহায্যে হাবল টেলিস্কোপে মেরামত করেন জ্যোতির্বিদেরা। সে সময় অপটিক্যাল সমস্যার সমাধানে হাই স্পিড ফটোমিটার (যেটির কাজ ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল উজ্জ্বলতা আর পোলারিটির নানা বস্তুর ছবি তোলা) খুলে ফেলে লাগানো হয় কোস্টার (Corrective Optics Space Telescope Axial Replacement) নামের একটা যন্ত্র। এতে ফোকাসের সমস্যা মিটে যায়, বিন্দু উৎসের ছবিতে আলো আর ততখানি ছড়িয়ে পড়ে না।

উড্ডয়নের সময়কার যন্ত্রের মধ্যে শুধু ফাইন গাইডেন্স সেন্সরই চলছে এখন পর্যন্ত। বাকি পাঁচটি মূল যন্ত্রের সব কটিই সময়ে সময়ে বদলানো হয়েছে আরও শক্তিশালী, আরও উন্নত যন্ত্র দিয়ে। মোট পাঁচটি মেরামত মিশনে এক দফা কিংবা দুই দফা বদল হয়েছে টেলিস্কোপের নানা অংশের। হাবল স্পেস টেলিস্কোপে খুবই প্রসারিত এলাকার ছবি নিতে আছে ওয়াইড ফিল্ড ক্যামেরা ৩ (WFC3)। এর আগে ওয়াইড ফিল্ড অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ক্যামেরা ১ ও ২ ছিল এই টেলিস্কোপে। এর মাধ্যমেই দৃশ্যমান রেঞ্জের গ্যালাক্সি কিংবা নেবুলার চমকপ্রদ ছবিগুলো আমরা পেয়ে থাকি।

২০০২ সালে স্থাপন করা হয় অ্যাডভান্সড ক্যামেরা ফর সার্ভে। এটি সূক্ষ্মতার কারণে অন্য সব যন্ত্রকে ছাড়িয়ে গেছে বলেই মানেন সবাই। নিকটবর্তী গ্রহ থেকে আকাশের সবচেয়ে দূরের কোয়াসার, সবকিছুর ছবি তুলতেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে একে। হাবল টেলিস্কোপে থাকা কসমিক অরিজিনস স্পেকট্রোগ্রাফের (COS) লক্ষ্য হলো গ্যালাক্সির উত্পত্তি আর বিবর্তনের উপাত্ত সংগ্রহ করা। নাক্ষত্রিক আর গ্রহমণ্ডল পর্যবেক্ষণসহ এর আরেকটি কাজ হলো ঠান্ডা মহাশূন্যকে পর্যবেক্ষণ করা। শুধু অতিবেগুনি রশ্মি নিয়ে কাজ করে এটি।

স্পেস টেলিস্কোপ ইমেজিং স্পেকট্রোগ্রাফ (STIS) হলো একটি বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র, যার ক্যামেরা মোডও আছে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপে ১৯৯৭ সালের দ্বিতীয় মেরামত মিশনে হাই রেজল্যুশন স্পেকট্রোগ্রাফ বদলে এটিকে বসানো হয়। এটিই প্রথম অন্য একটি সৌরজগতের একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডলের বর্ণালি পর্যবেক্ষণ করে। মাঝখানে শক্তি (পাওয়ার) সরবরাহে সমস্যার কারণে এটি অবশ্য ২০০৪ সাল থেকে কাজ করেনি। ২০০৯ সালে পঞ্চম মেরামত মিশনে সেই সমস্যা দূর করা হয়।

নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা ও মাল্টি-অবজেক্ট স্পেকট্রোমিটার স্থাপন করা হয় ১৯৯৭ সালে। এর কাজ ছিল মূলত অবলোহিত তরঙ্গে ছবি তোলা। ২০০৮ সাল পর্যন্ত এটি ব্যবহূত হয়েছে। ২০০৯ সালে ওয়াইড ফিল্ড ক্যামেরা ৩ স্থাপন করার পর এর কাজটিও নতুন ক্যামেরাটিই করে আসছে।

দৃশ্যমান এবং এর কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোয় মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল স্পেস টেলিস্কোপ বলা যায় এই হাবল স্পেস টেলিস্কোপকেই। বারবার যন্ত্র বদল আর মেরামতে এটি আর নব্বইয়ের দশকের টেলিস্কোপ নেই, আধুনিক একটি টেলিস্কোপেই রূপ নিয়েছে। মহাবিশ্বের প্রসারমানতার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এডউইন হাবল। তাঁর নামের টেলিস্কোপটি এই প্রসারণের হার সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করেছে। দৈনিক প্রায় ১৫ বার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা এই টেলিস্কোপ ২০৩০-৪০ সাল পর্যন্ত আরও কত চমকপ্রদ তথ্য আর ছবি আমাদের উপহার দিয়ে যাবে কে জানে!

কম্পটন গামা রে অবজারভেটরি

কম্পটন গামা রে অবজারভেটরি

সাধারণত আমরা আলো হিসেবে দেখতে পারি বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গের খুব ছোট্ট একটা অঞ্চল। সেটুকুকে আমরা বলে থাকি দৃশ্যমান আলো। কিন্তু মহাবিশ্বজুড়ে প্রচুর পরিমাণে তৈরি হচ্ছে দৃশ্যমান আলোর চেয়ে কম কিংবা বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো। ১৯৯১ সালে নিম্ন ভূ-কক্ষপথে স্থাপন করা হয় কম্পটন গামা রে অবজারভেটরি (CGRO)। এর কাজ ছিল উচ্চশক্তিসম্পন্ন আলোক বিকিরণ, অর্থাৎ ২০ কিলোইলেকট্রনভোল্ট (KeV) থেকে ৩০ গিগাইলেকট্রনভোল্ট (GeV) শক্তির বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ শনাক্ত করা। মূল চারটি টেলিস্কোপে তৈরি এই অবজারভেটরি কক্ষপথে ছিল ২০০০ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যেই পুরো আকাশের উচ্চশক্তি ফোটন উৎসের জরিপ করেছিল এটা। চার বছর সময় নিয়ে এটি ২৭১টি গামা উত্স মহাকাশে শনাক্ত করেছিল, যার মধ্যে ১৭০টির কথাই মানুষের আগে জানা ছিল না!

৬১৭ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই অবজারভেটরি তৈরি করেছিল টিআরডব্লিউ ইনকরপোরেটেড। এটি তৈরিতেও সাহায্য করে ESA। সঙ্গে ছিল কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউএস নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি।

গামা রে শনাক্ত করা যায় শুধু পদার্থের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। ডিটেক্টর যত বড় হবে, শনাক্তকরণের সম্ভাবনা ততই বাড়বে। তাই যন্ত্রগুলোর প্রতিটি ছিল বেশ বড়, প্রায় ছয় টন ভরের। এর একটি যন্ত্র বার্স্ট অ্যান্ড ট্রানজিয়েন্ট সোর্স এক্সপেরিমেন্ট (BATES) নিম্নশক্তির গামা বিস্ফোরণ খুঁজে বেড়াত। সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গামা উত্স শনাক্ত করাও ছিল এর কাজ। স্পেসক্রাফটের আট কোণে আটটি একই রকমের ডিটেক্টর দিয়ে আকাশের সব দিকে একই সঙ্গে জরিপ করত এই টেলিস্কোপ। নয় বছরের মিশনে টেলিস্কোপটি গড়ে দৈনিক প্রায় একটি করে মোট ২৭০০ বিস্ফোরণ শনাক্ত করেছিল। এই বিস্ফোরণগুলো ছিল দূরের গ্যালাক্সির। মিল্কিওয়ের বিস্ফোরণ হলে তা ধরা পড়ত অতি শক্তিশালী তরঙ্গ হিসেবে।

নেভাল গবেষণাগারের তৈরি ওরিয়েন্টেড সিন্টিলেশন স্পেকটোমিটার এক্সপেরিমেন্টের (OSSE) কাজ ছিল চারটি ডিটেক্টর দিয়ে ০.০৫ থেকে ১০ গবঠ শক্তির ফোটন শনাক্ত করা। এটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রের সম্ভাব্য প্রতিপদার্থ মেঘ শনাক্ত করেছিল। এ ছাড়া এই অবজারভেটরিতে ছিল ইমেজিং কম্পটন টেলিস্কোপ ও শক্তিশালী গামা রে এক্সপেরিমেন্ট টেলিস্কোপ। উচ্চশক্তির ফোটন উত্স শনাক্ত করা ছিল এর কাজ। আর কম্পটেলের উল্লেখ করার মতো কাজ হলো সমগ্র আকাশের ২৬ ভরবিশিষ্ট অ্যালুমিনিয়াম আইসোটোপের জরিপ।

চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি

সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখরের নামে নাম রাখা এই অবজারভেটরির কাজ হলো উচ্চশক্তির এক্স-রের উত্স পর্যবেক্ষণ করা। বিশেষ করে তারার অন্তিমকালের সুপারনোভা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশ উত্তপ্ত গ্যাসের এক্স-রশ্মি উত্স। ১৯৯৯ সালে উচ্চ ভূ-কক্ষপথে স্থাপনেরও আগে একসময় এর নাম ছিল অ্যাডভান্সড এক্স-রে অ্যাস্ট্রোফিজিকস ফ্যাসিলিটি (AXAF)। তখন এটিকে কক্ষপথে রাখার পরিকল্পনা ছিল পাঁচ বছর। কিন্তু এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে এখনো মিশনটি চলছে। পৃথিবীকে উপবৃত্তাকার পথে প্রায় ৬৪ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে এই অবজারভেটরি।

চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি আমাদের আকাশগঙ্গা ও নিকটতম অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের কেন্দ্রে এক্স-রে উেসর সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে অতি উচ্চ ভরবিশিষ্ট ব্ল্যাকহোলের এক্স-রে বিকিরণ উেসর কথা এর আগে জানা ছিল না মানুষের। এই অবজারভেটরির গৃহীত তথ্য থেকে একটি নিউট্রন তারা আবিষ্কার করেছিল হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা।

অ্যাডভান্সড সিসিডি ইমেজিং স্পেকট্রোমিটার (ACIS) আর হাই রেজল্যুশন ক্যামেরা (HRC) নিয়ে তৈরি এই অবজারভেটরি শুধু যে বর্ণালিগত তথ্য দেয় তা নয়, এক্স-রে উেসর ছবিও তোলে। এসিআইএসের কাজ ০.২ থেকে ১০ শবঠ শক্তির এক্স-রের বর্ণালিবীক্ষণ তৈরি।

চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি
স্পিত্জার স্পেস টেলিস্কোপ

স্পিত্জার স্পেস টেলিস্কোপ

খুব অল্প শক্তির বিদ্যুত্চুম্বক তরঙ্গকে বলা হয় অবলাল বা অবলোহিত আলো। এর একটা পরিচয় হতে পারে তাপের অনুভূতি জাগানো আলো। তাপ উত্স, অবলাল আলোর উেসর বর্ণালিবীক্ষণ চিত্র তৈরি কিংবা ছবি তোলা ছিল এই অবজারভেটরির কাজ। যেহেতু অবলাল আলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে খুব একটা পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারে না, তাই এ রকম একটা অবজারভেটরি কক্ষপথে স্থাপন করা বেশ জরুরিই ছিল। প্রাথমিকভাবে স্পিত্জার স্পেস টেলিস্কোপের কার্যক্রমের মেয়াদ ছিল আড়াই বছর। আশা ছিল, এটি পাঁচ বছর বা তার কিছু বেশি সময় হয়তো কাজ করবে। কারণ এটির অধিকাংশ যন্ত্রাংশ কাজ করার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় মাইনাস ১৬৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এটি বজায় রাখতে ব্যবহার করা হতো তরল হিলিয়াম গ্যাস। পাঁচ বছরে হিলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ শেষ হয়ে যায়। এরপর ২০০৯ সালে শুরু হয় স্পিত্জার ওয়ার্ম মিশন, যেখানে দুটি আইআরএসি (ইনফ্রারেড অ্যারে ক্যামেরা) এখনো ঠিক শুরুর মতোই কাজ করছে।

স্পিত্জারের সবচেয়ে চমকপ্রদ কাজ ছিল সৌরজগতের বাইরে অন্য একটি তারায় অবস্থিত গ্রহের ছবি তোলা। এর আগে তারার আচরণ থেকে গ্রহ শনাক্ত করা গেছে, কিন্তু ছবি তোলা যায়নি, যেটা প্রথম সম্ভব হয়েছে এই অবজারভেটরির দ্বারা। ২০০৫ সালে এটি অন্য তারার একটি গ্রহে একদম নতুন তৈরি হওয়া বলয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়, যেটি বিজ্ঞানীদের গ্রহের উত্পত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে যথেষ্ট তথ্য প্রদান করে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে কম বয়সী ও তৈরির প্রক্রিয়া চলমান তারা খুঁজে পেয়েছে এই অবজারভেটরিই। ২০০৬ সালে স্পিত্জার সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার ম্যাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়। গ্রহ শনাক্তে এই অবজারভেটরি এতটা সাহায্য করেছে যে একে গ্রহ শিকারি বলে থাকেন অনেকে। কারণ পৃথিবীসহ প্রায় সব গ্রহই নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করলেও বিকিরণ করে মূলত অবলাল আলো।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সূর্য থেকে প্রায় ৩৯.৫ আলোকবর্ষ দূরে ট্রাপিস্ট-১ নক্ষত্রের চারদিকে প্রদক্ষিণরত পাঁচটি গ্রহ আবিষ্কার করে স্পিত্জার টেলিস্কোপ। ট্রাপিস্ট-১-এর চারপাশে ঘূর্ণমান গ্রহের সংখ্যা মোট সাতটি। স্পিত্জারের আবিষ্কৃত পাঁচটি গ্রহের মধ্যে তিনটিই রয়েছে হ্যাবিটেবল জোনে, অর্থাৎ এদের মধ্যে পানি এবং জীবনধারণের উপযুক্ত পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্পিত্জার স্পেস টেলিস্কোপের এটিই সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।

৪০০ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে আকাশগঙ্গার কেন্দ্র অঞ্চলে সত্যিকারের সুনিপুণ বার আকৃতির উপস্থিতির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে এটি। এতটা সুনিপুণ আকৃতির কথা আগে কখনো জানাই যায়নি।

আর নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের দুজন বিজ্ঞানী দাবি করেছিলেন, বিগ ব্যাংয়ের অল্প সময় পরের ছবি স্পিত্জার দিয়ে তোলা সম্ভব। কারণ, প্রসারমাণ মহাবিশ্বে লাল বিচ্যুতির (Red Shift) কারণে মহাবিশ্বের একদম প্রথম ১০০ মিলিয়ন বছর সময়ের তারার আলো আমাদের পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে এত দিনে। সেই বিজ্ঞানী দুজন একটি কোয়াসারের চারপাশের তরঙ্গ উেসর ছবি থেকে জানা উত্সগুলো মুছে ফেলে অবশিষ্ট আলো যে মহাবিশ্বের ১০০ মিলিয়ন বছর বয়সকালের এক তারায় তৈরি, সেটির পক্ষে বেশ শক্ত যুক্তিই পেয়েছেন।

অবলাল আলোয় মহাবিশ্বকে দেখার এই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে ২০১৯ সালের বসন্তে কক্ষপথে স্থাপন করা হবে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। সেটির জন্য প্রস্তুতি নিতে এখন স্পিত্জার স্পেস টেলিস্কোপের চলছে আড়াই বছর মেয়াদি বিয়ন্ড মিশন।

লেখক: শিক্ষার্থী, খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: নাসা, দ্য অ্যাথেনা এক্স-রে অবজারভেটরি, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত