রহস্যময় এক্স কণা

মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুর অবস্থাটা কেমন ছিল, তা জানার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা নিরন্তর। ধারণা করা হয়, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরেই একধরনের রহস্যময় কণার অস্তিত্ব ছিল। সম্প্রতি সে কণার দেখা মিলেছে গবেষণাগারে। মহাবিশ্বের জন্মের সময়কার পরিবেশ, যাকে বলে প্রাইমোর্ডিয়াল স্যুপ তৈরি করে এ কণার হদিস পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কণাটি শনাক্ত করেছেন এমআইটি ও সার্নের একদল পদার্থবিজ্ঞানী।

প্রাইমোর্ডিয়াল স্যুপ মূলত কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে লেড আয়নের পরস্পরের সংঘর্ষের মাধ্যমে এটা তৈরি করা হয়। এই সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা বা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কণার মধ্য থেকে পদার্থবিদেরা মাত্র ১০০টি অচেনা কণা শণাক্ত করতে সক্ষম হন, যাকে এক্স কণা বলা হচ্ছে।

এটা নতুন এক অধ্যায়ের শুরু—এমনটা মনে করছেন এমআইটির পদার্থবিজ্ঞানী ইয়েন-জি লি। তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই এক্স কণার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা ব্যবহার করতে চাই। সেটা করতে পারলে মহাবিশ্ব কী ধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি, এ নিয়ে ধারণা পাল্টে যেতে পারে।’

বর্তমানে আমাদের পরিচিত বস্তুকণা, যেমন প্রোটন-নিউট্রন ও ইলেকট্রন কণিকাগুলোর অস্ত্বিত্ব বিগ ব্যাংয়ের সময় ছিল না। বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরে এক সেকেন্ডের কয়েক মিলিয়ন ভাগের মধ্যে ছিল শুধু ট্রিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রা আর উত্তপ্ত কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা। খুব কম সময়ের মধ্যে প্লাজমা ঠান্ডা হয়ে যায়। জন্ম হয় প্রোটন আর নিউট্রনের মতো কণার, যা আমাদের চিরচেনা পদার্থগুলোর মূল ভিত্তি। এই সময় কোয়ার্ক-গ্লুয়ন কণার মধ্যে সংঘর্ষে তৈরি হয় একধরনের রহস্যময় কণা। এখনো বিজ্ঞানীরা জানেন না, কীভাবে এটা তৈরি হয়। রহস্যময় এই কণার নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন এক্স কণা। এর দেখা মিলেছে কণা কোলাইডার যন্ত্রে। খুব অল্প সময়ের জন্য।

২০১৮ সালে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার লেড আয়নের পারস্পারিক সংঘর্ষ ঘটায় প্রচণ্ড গতিতে। এ ধরনের প্রায় ১৩ বিলিয়ন সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এর প্রতিটি থেকে প্রায় ১০ হাজার কণা ছড়িয়ে পড়ে। তৈরি হয় কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা। সব মিলিয়ে এখান থেকে প্রাপ্ত ডেটার পরিমাণ এত বেশি, কম্পিউটারের সাহায্যেও বিশ্লেষণ করা কঠিন। এই পরিমাণ কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমাতে আরও অনেক বেশি এক্স পার্টিকেল তৈরি হওয়ার কথা। বিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন, এখানে এক্স কণাগুলো খুঁজে পাওয়াই অনেক কঠিন হবে। কারণ, কোয়ার্কের এই প্লাজমাতে আরও অন্য অনেক কণা ছিল।

তা ছাড়া এক্স কণার জীবনকালও বেশ সংক্ষিপ্ত। এগুলো যখন ক্ষয় হতে থাকে, তখন আরও কম ভরযুক্ত কণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ডেটা অ্যানালাইসিস প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে কাজ করানোর জন্য গবেষক দলটি একটি অ্যালগরিদম তৈরি করেন। যেটা এক্স কণার ক্ষয়প্রক্রিয়া শনাক্ত করতে পারবে। এরপর তাঁরা ২০১৮ সালে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার থেকে প্রাপ্ত ডেটা তাঁদের সফটওয়্যারে সরবরাহ করেন।

অ্যালগরিদমটি একটি নির্দিষ্ট ভরের সংকেত শনাক্ত করেছে, যা প্রায় ১০০টি এক্স কণার উপস্থিতির কথা জানায়। রহস্যময় কণার অনুসন্ধান হিসেবে শুরুটা আসলেই চমৎকার।

এই মুহূর্তে এক্স পার্টিকেলের গঠন জানার জন্য বিজ্ঞানীদের প্রাপ্ত এই ডেটাগুলো অবশ্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু সেটার দিকে তারা অনেকটাই এগিয়ে গেছে কণা শনাক্তের মাধ্যমে। এখন আমরা এক্স পার্টিকেলকে কীভাবে খুঁজতে হবে, সেটা জানি। আর সেই সুতা ধরেই ভবিষ্যতে এ সম্পর্কে ডেটা পাওয়া আরও সহজ হয়ে যাবে। আর যত বেশি ডেটা আমরা পাব, ততটাই সহজ হবে এক্স কণা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা।

এ–সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি গত ১৯ জানুয়ারি ফিজিক্স রিভিউ লেটার জার্নালে প্রকাশিত হয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট