সূর্যের নিউট্রিনো সমস্যা বিজ্ঞানের বিখ্যাত সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি। সূর্য প্রধানত হাইড্রোজেন গ্যাস নিয়ে গঠিত। সূর্যের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী, সূর্য হাইড্রোস্ট্যাটিক ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ সূর্যের মহাকর্ষ ও সূর্যের অভ্যন্তরীণ নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় উত্পন্ন বিকিরণ চাপ পরস্পর সাম্যাবস্থায় আছে। এই মডেল অনুযায়ী ১৯২০ সালে আর্থার এডিংটন প্রস্তাব করেন, সূর্যের ভর ও ব্যাসার্ধ জানা থাকলে তার কেন্দ্রের তাপমাত্রা জানা সম্ভব। হিসাব অনুযায়ী এই তাপমাত্রা হলো ১০ থেকে ২০ মিলিয়ন ডিগ্রি কেলভিন। এই উচ্চ তাপমাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়া হলো প্রোটন-প্রোটন চেইন বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়াটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—ppI, ppII, ppIII।
প্রোটন-প্রোটন বিক্রিয়ার হিসাব অনুসারে সেকেন্ডে ১.৮x১০৩৮টি নিউট্রিনো তৈরি হওয়ার কথা। ফলে পৃথিবীর মতো দূরত্বে প্রতি সেকেন্ডে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রায় ৪০০ ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু এভাবে উত্পন্ন বেশির ভাগ নিউট্রিনোর শক্তি অনেক কম থাকে। ফলে এদের ডিটেক্টরে ধরা যায় না। তবু প্রোটন-প্রোটন বিক্রিয়ার শেষ ধাপে উত্পন্ন নিউট্রিনো যথেষ্ট শক্তিশালী থাকে, যাদের ডিটেক্টরে ধরা যায়। যদিও এই ধরনের নিউট্রিনো প্রতি ১০ হাজার বিক্রিয়ার মধ্যে মাত্র দুবার পাওয়া যায়। এই উচ্চশক্তির নিউট্রিনোকে ধরার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটায় মাটির ১.৫ কিলোমিটার নিচে একটি সোনার খনিতে পারক্লোরো ইথিলিনপূর্ণ একটি ৪০০ ঘন মিটারের বড় পাত্র রাখা হয়েছে। সেই ডিটেক্টর সব মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে মুক্ত। এখানে সূর্য থেকে আসা ইলেকট্রন নিউট্রিনোকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, সূর্য থেকে ৮ SNU নিউট্রিনো আসার কথা। কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই নিউট্রিনোর পরিমাণ মাত্র ২.২। SNU মানে সোলার নিউট্রিনো ইউনিট। এটি নিউট্রিনোর পরিমাণ নির্দেশ করে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে যে পরিমাণ নিউট্রিনো পাওয়ার কথা, তার তুলনায় অনেক কম নিউট্রিনো আমরা পাচ্ছি। এর কোনো যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
২০০১ সালে কানাডার সাডবারি নিউট্রিনো অবজারভেটরি জানায়, সূর্য থেকে নিউট্রিনো পৃথিবীতে আসার সময় এটা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে আমরা সূর্যের ভেতরে তৈরি হওয়া আসল নিউট্রিনোকে দেখতে পাই না। আমাদের কাছে আসে পরিবর্তিত মিউওন ও টাও নিউট্রিনো। এ ঘটনা থেকে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার জানা যায়। এত দিন মনে করা হতো নিউট্রিনো ভরবিহীন। কিন্তু নিউট্রিনোকে পাল্টে যেতে হলে অবশ্যই তাকে ভরযুক্ত হতে হবে। ফলে নিউট্রিনোর খুব সামান্য হলেও ভর আছে। যা-ই হোক, এতে জানা গেল কেন আমরা এত দিন নিউট্রিনোর সংখ্যা কম পেয়েছি।
আবার জাপানি বিজ্ঞানীদের আরেকটি গবেষণায়ও দেখা যায় যে নিউট্রিনোর হিসাব করা সংখ্যা এবং পর্যবেক্ষিত সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য আছে। তাই ধরে নেওয়াই যায়, সূর্যের নিউট্রিনো সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা জানতে পারছি না আসলেই নিউট্রিনোগুলো সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসার পথে পাল্টে যাচ্ছে কি না। উপরন্তু র্যালফ জারগেন্স প্রস্তাবিত সূর্যের ইলেকট্রিক্যাল মডেল অনুযায়ী, যেহেতু ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভরের পার্থক্য অনেক বেশি, ফলে সূর্যের ভেতর হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো অনেকটা ডাইপোলের মতো আচরণ করে। এতে সূর্যের কেন্দ্রের দিকে প্রোটন, অর্থাৎ ধনাত্মক চার্জের আধিক্য ঘটে। যা-ই হোক, এই মডেল বলে, সূর্যের ভেতরে নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় ভারী মৌল সংশ্লেষিত হয় এবং ফলস্বরূপ সূর্যের ভেতরেই বিভিন্ন ধরনের নিউট্রিনো তৈরি হয়। অর্থাৎ নিউট্রিনো সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসার সময় পাল্টে যায় না, বরং তারা সূর্যের ভেতরেই তৈরি হয়ে আসে। এই মডেল আরও বলে, যেহেতু নিউট্রিনোর ভর আছে, তাই এটি অবশ্যই সাধারণ পদার্থ গঠনকারী কণা দিয়েই গঠিত হতে হবে। ফলে বিভিন্ন ধরনের নিউট্রিনো যে আমরা দেখতে পাই, তারা আসলে নিউট্রিনোর বিভিন্ন কোয়ান্টাম অবস্থার ফল। ধারণা করা হয় যে সূর্যের বিভিন্ন ধরনের ঘটনা যেমন সৌরকলঙ্ক, সৌরবায়ু ইত্যাদি ঘটনা সূর্যের নিউট্রিনোর সংখ্যার তারতম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
লেখক: শিক্ষার্থী, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
সূত্র: সায়েন্টফিক আমেরিকান, উইকিপিডিয়া
*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত