সোশ্যাল মিডিয়ায় বট বাহিনী কী, কীভাবে কাজ করে

ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্সে ইদানীং আমরা প্রায়ই একটি শব্দ শুনি—বট বাহিনী। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এই বট আসলে কারা? এরা কি রোবট, নাকি মানুষ? কেনই-বা এরা হঠাৎ কোনো নির্দিষ্ট পোস্টের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে?

বট শব্দটা এসেছে রোবট থেকে। এটি মূলত একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করার জন্য তৈরি করা হয়। যখন কয়েক হাজার বা লক্ষাধিক ভুয়া প্রোফাইলকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে বলা হয় বট আর্মি বা বট বাহিনী। যেমন, নির্দিষ্ট কাউকে গালি দেওয়া, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বা কারও প্রশংসা করা।

এরা মূলত দুই ধরনের হয়। অটোমেটেড এবং হিউম্যান ট্রল আর্মি। অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় বটগুলো সম্পূর্ণ কম্পিউটারচালিত। কোনো নির্দিষ্ট কি-ওয়ার্ড দেখলেই এরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমেন্ট করে। যেমন আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দেশের নাম লিখে পোস্ট করেন, তাহলে প্রোগ্রাম করা বটগুলো সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এসে আগে থেকে সেট করা কমেন্ট পেস্ট করে দেবে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত বটগুলো আরও ভয়ংকর। এরা শুধু কপি-পেস্ট না করে মানুষের মতো করেই প্রাসঙ্গিক ও আলাদা আলাদা কমেন্ট লিখতে পারে। আর হিউম্যান ট্রল আর্মি আসলে মানুষ, কিন্তু ভুয়া আইডি ব্যবহার করে। এদের টাকা দিয়ে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়। একেকজন মানুষ ১০-২০টি আইডি নিয়ন্ত্রণ করে। আর নির্দেশ পাওয়ামাত্রই কোনো নির্দিষ্ট লিংকে গিয়ে দল বেঁধে আক্রমণ করেন। প্রযুক্তিগতভাবে এরা বট না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এরা বট বাহিনী নামেই বেশি পরিচিত।

আরও পড়ুন
বট শব্দটা এসেছে রোবট থেকে। এটি মূলত একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করার জন্য তৈরি করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, বট বাহিনীর মূল কাজ কী? বট বাহিনী সাধারণত তিনটি কৌশলে কাজ করে। প্রথমত, কোনো একটি ঘটনা ঘটার পর জনমত কোন দিকে যাবে, তা এরা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। শত শত পজিটিভ বা নেগেটিভ কমেন্ট করে এরা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট। অর্থাৎ, মানুষ যখন দেখে সবাই একদিকে কথা বলছে, সে-ও অবচেতনভাবে ভাবতে শুরু করে যে ওটাই বোধ হয় ঠিক। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে যখন একই ভাষায় গালি বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ সেটাকে সত্যি বলে ভ্রম করতে পারে। তৃতীয়ত, কোনো পেজ বা আইডি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এরা একসঙ্গে হাজার হাজার রিপোর্ট মারে। ফলে ফেসবুক বা অন্য মাধ্যমের অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইডিটি ব্লক করে দেয়। মেটা বা ফেসবুকের ভাষায় এ ধরনের কাজকে কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার বলা হয়।

তবে বট শনাক্ত করার কিছু পেশাদার উপায় আছে। যেমন, কোনো নিউজ বা পোস্ট পাবলিশ হওয়ার মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই যদি ১০০ বা তার বেশি কমেন্ট চলে আসে, তবে বুঝতে হবে এটি বটের কাজ। একজন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে এত দ্রুত পড়ে কমেন্ট করা অসম্ভব। আবার ১০-১৫ জন আলাদা মানুষের কমেন্ট হুবহু একই হলেও বুঝতে হবে তা বটের কাজ। এ ছাড়া বটদের আইডিতে সাধারণত কোনো ব্যক্তিগত জীবন বা আসল পরিচয় থাকে না। প্রোফাইল পিকচার হয় কোনো সেলিব্রিটির ছবি, ফুল বা পাখির ছবি। টাইমলাইনে নিজস্ব কোনো পোস্টের বদলে কেবল শেয়ার করা পোস্ট থাকে এবং আইডির ফলোয়ার বা ফ্রেন্ডলিস্টে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

আরও পড়ুন
শত শত পজিটিভ বা নেগেটিভ কমেন্ট করে বট বাহিনীরা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট।

বট বাহিনী ডিজিটাল গণতন্ত্রের জন্য এখন বড় হুমকি। এরা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করতে পারে। বিশেষ করে ভূরাজনীতি বা জাতীয় নির্বাচনের সময় এদের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। একে অনেক সময় ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা তথ্যযুদ্ধ বলা হয়।

তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কমেন্টের ভিড় দেখে উত্তেজিত হওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এটি কি সত্যিই কোনো মানুষের মতামত, নাকি কোনো স্ক্রিপ্টেড প্রোপাগান্ডা? মনে রাখবেন, লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে সব সময় সত্য বিচার করা যায় না।

সূত্র: সাইবার সিকিউরিটি গাইডলাইনস এবং এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ

আরও পড়ুন