ব্ল্যাকবক্স। বাংলা করলে দাঁড়ায়, কালোবাক্স। শব্দটা শুনলে আমাদের মাথায় হয়তো কালো রঙের একটা বাক্সের কথা ভেসে ওঠে। কিন্তু আদতে ব্ল্যাকবক্স কমলা রঙের ধাতব বাক্স। মূলত ব্ল্যাকবক্স হলো ফ্লাইট রেকর্ডার, বিমানে স্থাপন করা হয়। কোনো বিমানযাত্রার সবকিছু রেকর্ড করতে ব্যবহৃত হয় এই ইলেকট্রনিক ডিভাইসটি। যাত্রীদের কথাবার্তা, ককপিটে পাইলটদের কথোপকথনসহ সবকিছু রেকর্ড করে এই ব্ল্যাকবক্স বা ফ্লাইট রেকর্ডার। অর্থাৎ যে যন্ত্র দিয়ে একটি ফ্লাইট বা বিমানযাত্রার উচ্চতা, গতি, ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা, পাইলটদের কথোপকথন, ইঞ্জিনের শব্দ ইত্যাদি রেকর্ড করা হয়, তাই ব্ল্যাকবক্স। বিমান দুর্ঘটনার তদন্তে ব্ল্যাকবক্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিমান ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও এটি অক্ষত থাকে।
ব্ল্যাকবক্সের নাম ‘ব্ল্যাকবক্স’ হওয়ার কারণ, আগের ফ্লাইট রেকর্ডারগুলো কালো রঙের হতো। আবার বিমান দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনার স্মৃতি রেকর্ড করার বিষয়টিও এর নামের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তাই একে বিমান বা উড়োজাহাজের শব্দ বা বার্তাধারকও বলা যায়।
ব্ল্যাকবক্স চালু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। যদিও ফ্রাঙ্কোই হুসেনো এবং পল ব্যুডোঁয়ে তাঁদের ‘টাইপ এইচবি’ ফ্লাইট রেকর্ডার দিয়ে ফ্রান্সের ম্যারিগনেন ফ্লাইট টেস্ট সেন্টারে ১৯৩৯ সালে প্রথম এই চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু এটি ছিল ফটোগ্রাফনির্ভর ফ্লাইট রেকর্ডার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মানুষ আরও বেশি করে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। বিমানের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্ল্যাকবক্স তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিমানের আকারের ওপর নির্ভর করে বাতাসের গতি, চাপ, জ্বালানি প্রবাহসহ ১১ থেকে ২৯ ধরনের ডেটা রেকর্ড করতে পারে এটি। প্রায় ২ থেকে ২৫ ঘণ্টার রেকর্ড জমা থাকে বিমানের পেছনের দিকে বসানো এই যন্ত্রে
পুরাতন ব্ল্যাকবক্সে অবশ্য ম্যাগনেটিক টেপ ব্যবহার করা হতো। ষাটের দশকে ব্যবহৃত হতো এ ধরনের ফ্লাইট রেকর্ডার।
এবারে চলুন, ব্ল্যাকবক্সের প্রকারভেদ জেনে নিই। সাধারণত দুই ধরনের ফ্লাইট রেকর্ডার ব্যবহার করা হয়। এর একটি ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (FDR), অন্যটি ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (CVR)।
এফডিআর বিমানযাত্রার বিভিন্ন তথ্য রেকর্ড করে। যেমন উচ্চতা, গতি ও ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা। আসলে, বিমানের সিস্টেম থেকে অপারেটিং ডেটা রেকর্ডের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক বা বৈদ্যুতিক সিস্টেমে পাঠানো সব ধরনের নির্দেশই এটি রেকর্ড করে। এ জন্য বিমানের বিভিন্ন অংশে তারযুক্ত সেন্সর আছে। এগুলো থেকে তথ্য চলে যায় এফডিআরে। সে জন্য পাইলট কোনো সুইচ ঘোরালেও সেই তথ্য রেকর্ড হয়ে যায়। বিমানের আকারের ওপর নির্ভর করে বাতাসের গতি, চাপ, জ্বালানি প্রবাহসহ ১১ থেকে ২৯ ধরনের ডেটা রেকর্ড করতে পারে এটি। প্রায় ২ থেকে ২৫ ঘণ্টার রেকর্ড জমা থাকে বিমানের পেছনের দিকে বসানো এই যন্ত্রে।
পাইলটদের মধ্যে কথোপকথন, ইঞ্জিনের শব্দ ও সতর্কতার মতো অন্যান্য শব্দসহ ককপিটের শব্দগুলি রেকর্ড করে সিভিআর। নামের ‘ককপিট’ অংশটি দেখেই বোঝা যায়, এটি মূলত ককপিটের তথ্য জমা রাখে। তথ্য সংগ্রহের জন্য পাইলটদের হেডসেটের পাশাপাশি ককপিটে মাইক্রোফোন সেট করা থাকে। তবে এটি শুধু শেষ ৩০ মিনিটের তথ্য বা অডিও জমা রাখে। আগের অংশটুকু ডিলিট হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে, এবং নতুন তথ্য ওর ওপরেই রেকর্ড হয়।
এর ভেতরে থাকে মেমোরি চিপ বা ম্যাগনেটিপ টেপ। প্রচণ্ড চাপে, এমনকি বিমান ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে বা কয়েক হাজার ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেলেও অক্ষত থাকে। পানির নিচে তলিয়ে গেলে অবস্থান শনাক্ত করার জন্য থাকে বিশেষ আন্ডারওয়াটার লোকেটর বিকন
দুটো যন্ত্রই বসানো থাকে বিমানের পেছনের দিকে। এগুলোতে পাওয়ার জোগান দেয় বিমানে থাকা জেনারেটর। তবে এর আসল বিশেষত্ব হলো ভেতরের ক্র্যাশ সারভাইবাল মেমোরি ইউনিট (CSMU)। সিএসএমইউ তিনটি স্তর রয়েছে। এক, অ্যালুমিনিয়াম হাউজিং (অ্যালুমিনিয়ামের আবরণ); দুই, হাই টেম্পারেচার ইনসুলেশন (উচ্চতাপ নিরোধক আবরণ) এবং তিন, স্টেইনলেস স্টিল শেল (ইস্পাতের আবরণ)। প্রচণ্ড তাপমাত্রা, আগুন, চাপ ইত্যাদি থেকে অক্ষত রাখার ব্যবস্থা এগুলো।
এর ভেতরে থাকে মেমোরি চিপ বা ম্যাগনেটিপ টেপ। প্রচণ্ড চাপে, এমনকি বিমান ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে বা কয়েক হাজার ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেলেও অক্ষত থাকে। পানির নিচে তলিয়ে গেলে অবস্থান শনাক্ত করার জন্য থাকে বিশেষ আন্ডারওয়াটার লোকেটর বিকন। এর সাবমার্জ সেন্সর একধরনের শব্দ করে। এই শব্দ শনাক্ত করে ব্ল্যাকবক্সের অবস্থান চিহ্নিত করা যায়। তবে দুর্ঘটনার পর ব্ল্যাকবক্স থেকে তথ্য পুনরুদ্ধার করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
ব্ল্যাকবক্সের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বোঝা গেছে বারবার, বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর। একটা উদাহরণ দিই। কুইন্সল্যান্ডে ১৯৬০ সালে ট্রান্সঅস্ট্রেলিয়া এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৫৩৮ দুর্ঘটনার তদন্তের সময় বিচারক জোর দিয়ে বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সব বিমানে ফ্লাইট রেকর্ডার স্থাপন করা উচিত। ফলে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ককপিটের ভয়েস রেকর্ড করা বাধ্যতামূলক করেছে।
বর্তমানে অনেক গাড়িতেও ব্ল্যাকবক্স যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্ল্যাকবক্স আরও উন্নত করা, ক্যামেরা যুক্ত করা ও ভিডিও রেকর্ডের ব্যবস্থার চেষ্টা করছেন প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকরা।
লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, হাজেরা-তাজু ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম
সূত্র: উইকিপিডিয়া, হাউ স্টাফ ওয়ার্কস ডটকম ও ফ্লাইজিপস ডটকম