চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কত দূর

পত্রপত্রিকা, ইন্টারনেট বা টেলিভিশন—সবখানেই শোনা যাচ্ছে শব্দযুগল—চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। প্রযুক্তিপ্রেমীরা বলছেন, আমরা দাঁড়িয়ে আছি নতুন এ বিপ্লবের দোরগোড়ায়। কেউ বলছেন, এই শুরু হয়ে গেল বলে! আসলেই কি তাই? চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নানা দিক, এর বৈশিষ্ট্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা…

এজিআই অবিকল মানুষের মতো দক্ষতার সঙ্গে যেকোনো কাজ করতে পারবে

‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’—এই শব্দযুগল বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্ব রাখে, বিজ্ঞানচিন্তার নিয়মিত পাঠকদের সেটি আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে’, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসছে’—এসব কথাও বলতে গেলে এখন সেকেলে। সারা বিশ্বে এখন জোরেশোরে চলছে আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি। জো বাইডেন, আঙ্গেলা ম্যার্কেল, দ্রৌপদী মুর্মু, মাহাথির মোহাম্মদসহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় বিশ্বনেতা মানুষকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যেই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারগুলোতে চলছে কোটি কোটি ডলার লগ্নি করে গবেষণা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বেশ সরগরম। আজ হয়তো এমন কোনো ব্যবসায়িক সেমিনার, প্রযুক্তিবিষয়ক কনফারেন্স কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’ কথাটি একবারের জন্য হলেও উচ্চারিত হয় না। বিভিন্ন দেশে সরকারি পর্যায়েও কাজ শুরু হয়ে গেছে। এসব ঘটনা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ এখন আর নেই।

একজন সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক জীবনকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলেও আমাদের একই উপসংহারে আসতে হবে। একটু সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলি। আমরা সবাই খেয়াল করেছি, ফেসবুক আমাদের নিউজফিডে পছন্দমতো কনটেন্ট কিংবা প্রয়োজনীয় নানা কিছুর বিজ্ঞাপন বারবার দেখাতে থাকে। কোনো না কোনো সময় আমাদের সবার মাথায় এই চিন্তা এসেছে, ‘ফেসবুক আমার মনের কথা জানল কী করে?’ এই জাদুকরি কাজটি মূলত করে দেয় ফেসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অ্যালগরিদম। এই বিশেষ অ্যালগরিদমকে এজর‍্যাঙ্ক (EdgeRank) নামেও ডাকা হয়। ঠিক একইভাবে ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, স্পটিফাই ইত্যাদি গ্রাহকদের অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পারসোনালাইজড রিকমেন্ডেশন (Personalized Recommendation) দিচ্ছে। চমকপ্রদ এ প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা। আমাদের স্মার্টফোন, সার্চ ইঞ্জিন, ব্যাংকের লেনদেন, ই-কমার্স, মার্কেটিং খাত, ডেটা সিকিউরিটি, এমনকি সামরিক খাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। স্মার্ট টিভি, স্মার্ট ঘড়ি, স্মার্ট রেফ্রিজারেটর, হিটিং-কুলিং সিস্টেম এবং স্মার্ট ফিটনেস মেশিনের বদৌলতে আজ সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে আইওটি প্রযুক্তি। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা বিপণন সমস্যার সমাধান মুহূর্তের মধ্যেই করে দিচ্ছে বিগ ডেটা। সাম্প্রতিক কালে শিশু-কিশোরদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ফাইবার ব্যাট’, যা মূলত তৈরি হচ্ছে ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহার করে। বাংলাদেশের কিছু জনপ্রিয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে ব্যবহৃত হচ্ছে ব্লকচেইন। অর্থাৎ আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কিছু প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।

সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার ঘাটতি নেই। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। কিন্তু কী এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব? কেন এত মাতামাতি?

বরেণ্য জার্মান অর্থনীতিবিদ ক্লাউস শোয়াবের মতে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অদূর ভবিষ্যতে আসন্ন এমন এক সময়, যেখানে ভৌত, জৈব ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মধ্যে কোনো সীমারেখা থাকবে না। এই তিন প্রযুক্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, আইওটি, ব্লকচেইন, বিগ ডেটা, ন্যানো প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটার, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, বায়োটেক, পরিধানযোগ্য ইন্টারনেট, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, স্বচালিত গাড়ি, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিংসহ আরও অনেক প্রযুক্তি ও প্রবণতার সমন্বয়ে তৈরি হবে এক অভূতপূর্ব সমাজের, যা পুরো পৃথিবীকে আমূল বদলে দেবে। ঠিক যেমনটি হয়েছে শিল্পবিপ্লবের প্রথম তিন ধাপে (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লব)।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে যদি আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ না থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এর শুরুটা কখন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও কিছুটা দ্বিধা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আবার অনেকে মনে করেন, এ মুহূর্তে প্রযুক্তির যে উৎকর্ষ চলছে, তা আসলে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের বর্ধিত অংশমাত্র। প্রশ্নটির তাই আসলে কোনো নির্ভুল জবাব নেই। কারণ, বিপ্লব ৪.০ নিয়ে এখনো অনেক গবেষণা চলমান। এ ছাড়া প্রযুক্তির বিপ্লব বা টেকনোলজিক্যাল রেভল্যুশন চলাকালে বোঝা যায় না, বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। একটি উল্লেখযোগ্য সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরই কেবল সে সময়কালের প্রযুক্তির প্রসারকে ‘শিল্পবিপ্লব’ তকমা দেওয়া হয়।

শিল্পবিপ্লবের প্রথম তিনটি ধাপকেই চাইলে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়। প্রথম শিল্পবিপ্লব চলাকালে (১৭৬০-১৮৪০) কেউ ‘শিল্পবিপ্লব’ কথাটি উচ্চারণও করেনি। ‘শিল্পবিপ্লব’ কথাটি সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করে ১৮৮১ সালে, ক্ষণজন্মা ইংরেজ মনীষী আর্নল্ড টয়েনবির হাত ধরে। ঠিক একইভাবে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব (১৮৭০-১৯১৪) চলাকালে কেউ বলেনি ‘দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব চলছে’। ১৯৬০-এর দশক থেকে অর্থনীতিবিদ এরিক জিমারম্যান, ডেভিড ল্যান্ডেস ও আলফ্রেড চ্যান্ডলার দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবকে সংজ্ঞায়িত ও বর্ণনা করা শুরু করেন। ট্রানজিস্টর কিংবা মাইক্রোচিপ আবিষ্কারের সময় ‘তৃতীয় শিল্পবিপ্লব’ কিংবা ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ কথাটি হয়তো কারও মাথাতেই আসেনি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম। বিজ্ঞান ও গবেষণায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং কম্পিউটারপ্রযুক্তির আশীর্বাদে এখন আমরা অনেক আগে থেকেই ভবিষ্যৎকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিগণনা করতে পারি।

বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এবং বিভিন্ন ইন্টারনেট কমিউনিটিতে একটি ধারণা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায় সবাই একমত, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বড় পরিসরে আরেকটি প্রযুক্তিবিপ্লব হতে চলেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ক্লাউস শোয়াব ২০১৬ সালে দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন নামে যুগান্তকারী বইটি রচনা করেন। নড়েচড়ে বসে সারা বিশ্ব। এ ধারণা ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ঠিক কবে, কখন শুরু হবে (কিংবা আদৌ শুরু হয়ে গেছে কি না), এটি সুনির্দিষ্ট করে আসলে কেউই বলতে পারবেন না। তবে এর আগমনী বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃশ্যমান। অর্থনীতিবিদ ক্লাউস শোয়াবের মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ পৃথিবীতে কিছু বড়সড় পরিবর্তন আসবে। ম্যাককিনসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি) তাদের অনেক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইলন মাস্ক, রন ব্যারন ও বিল গেটস ২০৩০ সালকে ঘিরে তাঁদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের একটি জরিপে ২০২৫ সালের মধ্যে ২৩টি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে। এসব তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলা যেতে পারে, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হতে চলেছে। তবে শুধু প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়ে যায়, এমন চিন্তা করাটা ভুল। কারণ, শিল্পবিপ্লব শুধু প্রযুক্তিগতভাবেই মানবজীবনকে পরিবর্তন করে না, এই বিপ্লব আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনকেও প্রভাবিত করে।

এসব সূচকের পাশাপাশি আরেকটি সূচক অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিল্পবিপ্লবের প্রতিটি ধাপেই কোনো একটি বিশেষ প্রযুক্তি ফ্ল্যাগশিপের ভূমিকা পালন করে। বলতে গেলে, সে যুগের সমার্থক হয়ে ওঠে। উদাহরণ দিই। প্রথম শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে বাষ্পযন্ত্র প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল, দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সমার্থক বিদ্যুৎ আর কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সমার্থক। ঠিক একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সমার্থক হয়ে উঠবে বলে অনেকেই মনে করেন। এ ধারণা কোনোভাবেই অমূলক নয়। ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি মাত্র ৩ মাসে যে পরিমাণ সাড়া জাগিয়েছে, তা ছিল কল্পনাতীত। ওপেনএআইয়ের এ সাফল্য টেক জায়ান্ট গুগলেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একপ্রকার তাড়াহুড়া করেই নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চ্যাটবট বার্ড (Bard) উন্মুক্ত করে তারা। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে বার্ড আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেনি; বরং জিপিটি-৪ (Generative Pre-trained Transformer, version 4) অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং কীভাবে একে আরও কাজে লাগানো যায়, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।

শুধু চ্যাটবট নয়; বরং হিউম্যানয়েড রোবোটিকসের নির্মাণ ও পরিচালনার জন্যও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হানসেন রোবোটিকসের সোফিয়া দ্য রোবট, বোস্টন ডায়নামিকসের অ্যাটলাস ও স্পট, হোন্ডা আসিমো, নাসার রোবোনট এবং টেসলার অটোপাইলট গাড়ি নির্মাণেও ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক ও সূক্ষ্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

মাত্র এক দশক আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল সুপারকম্পিউটার, মেইনফ্রেম কম্পিউটার ও বৈজ্ঞানিক ডেটা পর্যালোচনার মধ্যে। তবে আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার প্রায় সর্বব্যাপী। বর্তমানে বিশ্বে এমন কোনো ক্ষেত্র অবশিষ্ট নেই, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন, পরিবহন থেকে শুরু করে সরকারব্যবস্থা ও রণাঙ্গন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। পিডব্লিউসির একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং এর সেবাগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে ১৫.৭ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করবে। তাই বলা যেতে পারে, মানবসভ্যতা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিকাশে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুটা হয় ১৯৬০-এর দশকে। তবে ষাটের দশকের এলিজা (ELIZA) চ্যাটবট এবং শেকি দ্য রোবট কিংবা নব্বইয়ের দশকের ডিপ ব্লুকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছি আমরা। আজকের মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং প্রযুক্তি এত উন্নত যে মাত্র ১২ বছর আগের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও এখন নিতান্ত শিশুসুলভ মনে হয়। চ্যাটজিপিটি, গুগল ডিপমাইন্ড ও আইবিএম ওয়াটসন এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎকর্ষের কি এখানেই শেষ, নাকি সবে শুরু?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রকৃত’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এখনো জন্মই হয়নি। বর্তমানে আমরা যা দেখছি, তা মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রূণের সমতুল্য। ‘প্রকৃত’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে বিজ্ঞানীরা মূলত বোঝান আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই কিংবা স্ট্রং এআইকে। এ জন্য আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকারভেদের বিষয়টি বুঝতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকারভেদ প্রধানত দুই পদ্ধতিতে করা হয়। এক. বিবর্তনগত প্রকারভেদ। দুই. নির্মাণগত প্রকারভেদ। বিবর্তনগত প্রকারভেদ অনুসারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তিন প্রকার। এক. আর্টিফিশিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স বা ন্যারো এআই, বাংলায় যাকে বলে দুর্বল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা; দুই. আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই কিংবা স্ট্রং এআই, মানে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তিন. আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স (অতিশক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)। নির্মাণগত দিক থেকে একে আবার চার ভাগে ভাগ করা হয়। এক. রিঅ্যাকটিভ মেশিন বা প্রতিক্রিয়াশীল যন্ত্র; দুই. লিমিটেড মেমোরি বা সীমিত স্মৃতির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা; তিন. থিওরি অব মাইন্ড বা মনস্তত্ত্বীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চার. সেলফ-অ্যাওয়ার এআই বা আত্মসচেতন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে মানবজীবন থেকে কায়িক শ্রমকে সমূল উৎপাটন করা হবে বলে মনে করেন অনেকে

আমরা মূলত কথা বলব স্ট্রং এআই এবং থিওরি অব মাইন্ড ধরনের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। আমরা ম্যাট্রিক্স কিংবা টার্মিনেটর–জাতীয় চলচ্চিত্রে অতি বুদ্ধিমান ও আত্মসচেতন যন্ত্রদের দেখেছি, যারা মানুষের সমপর্যায়ের কিংবা মানুষ থেকে আরও অনেক বেশি বুদ্ধিমান। স্ট্রং এআই এবং থিওরি অব মাইন্ড অনেকটা এ ধরনেরই কিছু। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আইকিউ মানুষের চেয়ে অনেক কম। গবেষক ও বিজ্ঞানী সের্গেই ইভানভের মতে, চ্যাটজিপিটি বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ৮০-৮৩ আইকিউ–সম্পন্ন মানুষের দক্ষতা প্রদর্শন করে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। তবে বেশির ভাগ প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আইকিউ ৫০-এর কম। আর একজন সাধারণ মানুষের গড় বুদ্ধিমত্তার পরিসীমা ৯০-১০০। প্রচলিত অর্থে, একজন ১২০ আইকিউ–সম্পন্ন মানুষকে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মনে করা হয়। বলে রাখা প্রয়োজন, আইকিউ পরিমাপের এই বিষয়কে অনেকেই ঠিক বৈজ্ঞানিক বলে মনে করেন না। তবে অনেকে মনে করেন, এটি কার্যকর। আইকিউ পরিমাপ করে বোঝা যায়, কে কতটা বুদ্ধিমান। তবে আইকিউ টেস্ট ঠিক কীভাবে বুদ্ধিমত্তাকে সংজ্ঞায়িত করছে এবং এই সংজ্ঞা ঠিক কতটা কার্যকর, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

যাহোক, প্রসঙ্গে ফিরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার বর্তমান অবস্থা থেকে বিবর্তিত হয়ে যখন একজন পূর্ণবয়স্ক বুদ্ধিমান মানুষের মতো চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে, তখন তাকে এজিআই বা শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। এজিআই অবিকল মানুষের মতো দক্ষতার সঙ্গে যেকোনো কাজ করতে পারবে। শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই নয়, এজিআই নিজেকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করতে পারবে। এ ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু একটি কিংবা দুটি কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং হয়ে উঠবে অলরাউন্ডার। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, এজিআই কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি নতুন স্কিল শিখে ফেলতে পারবে, যা শিখতে একজন সাধারণ মানুষের কয়েক বছর লেগে যায়। অর্থাৎ একটি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে যদি কোনো মানুষের গড়ে চার বছর সময় লাগে, এজিআই সেটি অর্জন করবে কয়েক মিনিটে। এসব কোনো কল্পকাহিনির পাতা থেকে তুলে দেওয়া গালগপ্পো নয়, কারণ, এর পূর্বাভাস ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। জিপিটি-৩.৫ ইতিমধ্যে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছে এবং কিছু মেডিকেল পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে থিওরি অব মাইন্ড (টম) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক মানুষের মতো সামাজিকভাবে আচরণ ও প্রাকৃতিক ভাষায় যোগাযোগ করতে পারবে। এটি মানবসমাজকে ইতিহাস, সমাজের গঠন, রাজনৈতিক চিন্তাধারা, ধর্মীয় মতাদর্শ ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে যোগাযোগ স্থাপন করবে। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদা, রোগের ইতিহাস ইত্যাদির সঙ্গেও সমন্বয় করতে পারবে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ বুদ্ধিমান ও সামাজিক একজন মানুষের মতো চিন্তা করবে এটি। থিওরি অব মাইন্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলার সময় প্রাকৃতিকভাবে বোঝার উপায় থাকবে না, আমরা কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলছি না।

বর্তমানে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো বিদ্যমান উদাহরণ নেই (অন্তত জনসমক্ষে নেই)। তবে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রায় সবাই মনে করেন, আমরা শিগগিরই এমন বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে পারব, যেটা হবে মানুষের মতো স্মার্ট। বিশ্বব্যাপী গবেষকেরা শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির জন্য নিরলস গবেষণা করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি কিছু দেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এজিআই তৈরির কাজ চলছে। শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলিউড সিনেমার মতো আত্মসচেতন হয়ে উঠবে কি না, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে এজিআই আত্মপ্রকাশের পরপরই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তার শীর্ষবিন্দুর দিকে এগিয়ে যাবে, এটা অনেকটা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়। অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে তাই নিশ্চিত।

অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞ বেন রস দাবি করেন, ২০৪০ নাগাদ আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স তৈরি হবে এবং ২০৬০ নাগাদ কোনো একসময়ে আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স আত্মপ্রকাশ করবে, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে সূচকীয় হারে হাজার গুণ কিংবা লক্ষ গুণ ছাড়িয়ে যাবে। তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং বিগ ডেটা প্রযুক্তির অগ্রগতি দেখে অনেকে এমন ধারণাও করছেন যে ২০৪০-এর অনেক আগেই আত্মপ্রকাশ করবে এজিআই।

শিল্পবিপ্লব প্রকৃতপক্ষে যান্ত্রিকীকরণ এবং স্বয়ংক্রিয়তার বিপ্লব। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ও কাজে কায়িক শ্রমের মাত্রা ও মানুষের হস্তক্ষেপ কমিয়ে কীভাবে মানবসভ্যতাকে আরও উন্নত, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন করে তোলা যায়; এটিই মূলত শিল্পবিপ্লবের মূলমন্ত্র। প্রথম শিল্পবিপ্লবে বাষ্পযন্ত্রের আবিষ্কারের ফলে মানুষ প্রথমবারের মতো কায়িক শ্রমকে যান্ত্রিক শ্রম দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবে বিদ্যুৎ, ট্রানজিস্টর, কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়তা নতুন মাত্রা লাভ করে এবং কায়িক শ্রমকে বিদায় করা সম্ভব হয় অনেকটাই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বিগ ডেটা, আইওটি, ব্লকচেইনসহ আরও অনেক প্রযুক্তি ও প্রবণতার সমন্বয়ে মানবজীবন থেকে কায়িক শ্রমকে সমূলে উৎপাটন করা হবে, এমনটাই ধারণা করছেন অনেকে। এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লব আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলবে। এ প্রভাব হবে অপরিবর্তনীয়। আর এখান থেকেই হতে পারে এক নতুন যুগের উন্মেষ।

সম্ভবত খুব শিগগির আমরা এমনই একটি নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছি, যখন বিদ্যুৎ, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ইন্টারনেটের মতোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, আইওটি, ব্লকচেইন, ন্যানো প্রযুক্তি, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, বায়োটেক, ওয়্যারেবলস বা পরিধানযোগ্য ইন্টারনেট, স্বচালিত গাড়ি, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং ইত্যাদি আমাদের নিত্যদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। সে সময়টি সম্ভবত খুব বেশি দূরে নয়। আজ থেকে এক দশক পরই হয়তো একদিন ঘুম থেকে উঠে আমরা দেখব, পৃথিবী বদলে গেছে। না, এক দিনে হবে না সেটা। সে জন্য আরও অনেক আগে থেকেই কাজ করছেন হাজারো প্রযুক্তিবিদ ও কম্পিউটারবিজ্ঞানী। আমাদেরও সে যাত্রায় যোগ দিতে হবে। সেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক: ডিজিটাল মার্কেটার ও উদ্যোক্তা

সূত্র: Schwab, Klaus (2016). The Fourth Industrial Revolution.

“The Fourth Industrial Revolution will be people powered | McKinsey”. www.mckinsey.com.

Padhy, N. P. Artificial Intelligence and Intelligent Systems.

Aleksander, Igor. “Beyond Artificial Intelligence.” Nature. 429 (2004): 701-702.

সুফিয়ানী, তানিম, ‘বিপ্লব ৪.০ - ভবিষ্যৎ পৃথিবীর গল্প’