গুগল ম্যাপে লাইভ ট্রাফিক

অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে, একটু সকাল সকাল বাসা থেকে বের হতে হবে। এই সময়টায় রাস্তায় বেশ যানজট থাকে, তাই ভাবলাম ফোনে গুগল ম্যাপটা একটু দেখে নিই। অফিসের ঠিকানা দিয়ে দিকনির্দেশনা চাইতেই গুগল ম্যাপ জানাল, প্রতিদিন যে মহাসড়ক দিয়ে অফিসে যাই, সেখানে অনেক ভিড়, বাসা থেকে অফিসে পৌঁছাতে আধা ঘণ্টার জায়গায় লাগবে এক ঘণ্টার বেশি। গুগল ম্যাপ আরও জানিয়ে দিল, শহরের ভেতরের রাস্তা দিয়ে গেলে কিছুটা কম সময় লাগবে। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে না পারলে মিটিংয়ের শুরুটা ধরতে পারব না, তাই ভিড়ের রাস্তা এড়িয়ে গুগল ম্যাপসের পরামর্শ অনুযায়ী শহরের রাস্তা দিয়েই রওনা দিলাম।

মহাসড়কের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি সেখানে গাড়ির পর গাড়ি, এগোচ্ছে শম্বুকগতিতে; একটু পরই দেখি পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে মহাসড়কের ধার ঘেঁষে ছুটে চলেছে। মনে হয় সামনে কোথাও গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে কারণেই এত ভিড়। গুগল ম্যাপসের নির্দেশনামতো ভেতরের রাস্তা দিয়ে অফিসে পৌঁছে গেলাম ৪০ মিনিটে কোনো ঝামেলা ছাড়াই, মিটিং শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই। অফিসের ব্রেক রুম থেকে এক কাপ কফি হাতে নিয়ে মিটিং রুমের দিকে যেতে যেতে ভাবছিলাম, গুগল ম্যাপসটা না দেখে বের হলে আমি এখন আটকে থাকতাম মহাসড়কের ওই ট্রাফিক জ্যামে!

গত মাসে বাংলাদেশে গুগল ম্যাপস অ্যাপে এই লাইভ ট্রাফিক সেবা দেওয়া শুরু করেছে। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জনবহুল শহরে এই সেবা আগে থেকেই চালু ছিল। এই সেবা ভিড়ের সময় গন্তব্যে পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা এখন অনেকটাই দূর করে দিয়েছে। মনে করুন আপনি গুগল ম্যাপ না দেখে আপনার প্রাত্যহিক আসা-যাওয়ার রাস্তা দিয়েই রওনা দিলেন। কিছু দূর গিয়ে আটকে গেলেন ট্রাফিক জ্যামে। আর কয়েক বছর আগে হলে আপনি গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে যেতেন-কখন এই ট্রাফিক জ্যাম ছাড়বে, গন্তব্যে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে! আর এখন আপনি থেমে থাকা গাড়িতে বসে আপনার স্মার্ট ফোনটি বের করে গুগল ম্যাপস খুললেই দেখতে পাবেন, সামনে কত দূর পর্যন্ত এই ভিড়, কী কারণে এই ভিড়। হয়তো সামনে একটি গাড়ির দুর্ঘটনা হয়েছে অথবা রাস্তার লেন বন্ধ করে কাজ চলছে। ম্যাপ আরও জানিয়ে দেবে আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে কতক্ষণ দেরি হবে।

কিন্তু রাস্তায় ট্রাফিকের তাত্ক্ষণিক অবস্থা গুগল ম্যাপ আপনাকে জানাতে পারছে কীভাবে? পারছে আমার-আপনার মতো লাখ লাখ মানুষের কল্যাণে, যারা প্রতিদিন বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যার যার নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাচ্ছে। আমাদের প্রায় সবার হাতে এখন অ্যাপেল আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড ফোন আছে। আপনার সেই স্মার্ট ফোনে লোকেশন সার্ভিস বলে একটি ফিচার আছে, যা ফোনের বর্তমান অবস্থান (জিপিএস কোঅর্ডিনেট) নির্ধারণ করতে পারে। ফোনের গুগল ম্যাপস অ্যাপটি লোকেশন সার্ভিস ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত তার অবস্থান গুগল সার্ভারকে জানাচ্ছে। আপনার যাত্রাপথের অবস্থানসংক্রান্ত এই তথ্যগুলো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে কত সময় লাগছে, তা নির্ধারণ করতে গুগলকে সাহায্য করছে। লাখ লাখ গুগল ম্যাপস ব্যবহারকারীর সম্মিলিত তথ্য দিয়ে গুগল রাস্তায় ট্রাফিকের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করতে পারছে। যেমন রাস্তায় কত গাড়ি চলছে, গাড়িগুলো কত দ্রুত চলছে অথবা থেমে আছে কি না।

আজ ঢাকায় ট্রাফিক জ্যামের চিত্র

কয়েক বছর ধরে গুগল দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাস্তার ট্রাফিকের যে তথ্য জোগাড় করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে দিনের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট রাস্তায় সাধারণত কী ধরনের ট্রাফিক থাকে, তার একটি ইতিহাস তৈরি করেছে। এই ঐতিহাসিক তথ্য আর আপনার চলার পথে ট্রাফিকের বর্তমান অবস্থানের তথ্য ব্যবহার করে গুগল ম্যাপস আপনাকে জানাতে পারছে ওই রাস্তার সাধারণ ট্রাফিকের তুলনায় আপনি ধীরে না দ্রুত চলছেন এবং আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাধারণত যে সময় লাগে, তার থেকে কত বেশি সময় লাগতে পারে।

গুগল ম্যাপস এখন আপনাকে রাস্তার সামনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, তা-ও জানাতে পারে। এর জন্য গুগল নির্ভর করে জনপ্রিয় নেভিগেশন অ্যাপ ওয়েজের (Waze) ওপর। গুগল কয়েক বছর আগে ওয়েজকে ১ বিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনে নিয়েছে। ওয়েজ ব্যবহারকারীরা গাড়ি চলার সময় কোনো ট্রাফিকজনিত ঘটনা বা দুর্ঘটনা দেখলে তা রিপোর্ট করতে পারে। গুগল স্থানীয় সড়ক পরিবহন সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক থেকেও দুর্ঘটনার তথ্য নিয়ে থাকে। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গুগল ম্যাপস আপনাকে রাস্তার ম্যাপের ওপর দুর্ঘটনার অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে দেখাতে পারে।

গুগল ম্যাপ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সময়ের যে হিসাব দেয়, তা সব সময় সঠিক না-ও হতে পারে। হয়তো শুরুতে দেখাল যে ভিড়ের রাস্তায় লাগবে ৪৫ মিনিট, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে ধীরগতিতে চলতে চলতে দেখলেন সময় আস্তে আস্তে বেড়ে চলেছে, ১ মিনিট, ২ মিনিট করে যোগ হচ্ছে মূল হিসাবের সঙ্গে। গুগল ম্যাপস কতটা সঠিকভাবে ট্রাফিকের বর্তমান অবস্থা আপনাকে জানাতে পারে, তা নির্ভর করে তাত্ক্ষণিক ট্রাফিকের কী পরিমাণ তথ্য তার কাছে আছে। যত বেশি গুগল ম্যাপ ব্যবহারকারী রাস্তায় থাকবে, তত বেশি তথ্য গুগলের কাছে পৌঁছাবে। আর ট্রাফিকজনিত ঘটনা বা দুর্ঘটনার তথ্য যত দ্রুত গুগলের কাছে পৌঁছাবে, গুগল ম্যাপ তত সঠিকভাবে ট্রাফিকের বর্তমান অবস্থা এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় নির্ধারণ করতে পারবে।

গুগল ম্যাপ এখন আমাদের প্রতিদিনের যাত্রাপথের সঙ্গী-ভিড় পুরোপুরি এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো হয়তো সব সময় সম্ভব হয় না, কিন্তু গন্তব্যে কখন পৌঁছাতে পারব, তার অনিশ্চয়তা নিয়ে ট্রাফিক জ্যামে আজ আর আমাদের বসে থাকতে হয় না।

লেখক: কম্পিউটার প্রকৌশলী

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত