হোমোপোলার মোটর

আমাদের প্রতিদিনের কাজকর্মে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মোটর ব্যবহার করা হয়। বাসার ছাদে পানি তোলার কাজে কিংবা বৈদ্যুতিক পাখায় যে মোটর ব্যবহার করা হয়, সেসব মোটর চলে পরিবর্তী বিদ্যুৎ প্রবাহ বা অল্টারনেটিং কারেন্টে। বাচ্চাদের বিভিন্ন খেলনায় যে মোটর ব্যবহার করা হয়, সেসব মোটর চলে একমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহ বা ডিরেক্ট কারেন্টে। খেলনায় যে ব্যাটারি লাগানো থাকে, সেখান থেকে মোটর বিদ্যুৎ সরবরাহ পায়। বৈদ্যুতিক মোটর বাস্তবে প্রথম তৈরি করে দেখান মাইকেল ফ্যারাডে। ১৯২১ সালে লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে তিনি যে বৈদ্যুতিক মোটরটি প্রদর্শন করেন, সেখানে পারদে ডুবানো একটা তামার দণ্ড একটা চুম্বককে কেন্দ্র করে ঘুরত। এই মোটরটি ছিল একটি হোমোপোলার মোটর। সাধারণ ডিসি মোটরের ভেতরে যে তারের কয়েল ঘোরে, সেই তারের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুত্ দিক পরিবর্তন করে। ফলে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের দিকও পরিবর্তন হয়। কিন্তু হোমোপোলার মোটরে তারের মধ্য দিয়ে কেবল একটা নির্দিষ্ট দিকেই বিদ্যুত্ প্রবাহিত হয়। পরিবাহী তাদের বৈদ্যুতিক পোলারিটি এবং চুম্বকের মেরুর দিক পরিবর্তন হয় না বলেই এ ধরনের মোটরের নামে হোমোপোলার শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

হোমোপোলার মোটর তৈরি করা বেশ সহজ। অনেকভাবেই এ রকম মোটর তৈরি করা যায়। আমরা দুটো ডিজাইন নিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারি।

বিভিন্ন ধাপে মোটর তৈরি হচ্ছে
ছবি: বিজ্ঞানচিন্তা

প্রথমে আমরা যে হোমোপোলার মোটরটি বানাব, সেটি তৈরির জন্য ২ নম্বর ছবির মতো করে তামার তারকে পেঁচিয়ে নিতে হবে। ওপরের দিকে তারের একটা অংশকে বাঁকিয়ে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে হবে, যেটা কি না ব্যাটারির পজিটিভ টার্মিনালকে স্পর্শ করে থাকবে। নিচের দিকে মাঝের অংশটুকুর জন্য দুপাশ থেকে আসা তারকে গোল করে বাঁকিয়ে নিতে হবে। এখানে খেয়াল রাখার বিষয় হচ্ছে, এ রকম খোলা তামার তারের ওপর অন্তরকের আস্তরণ থাকে। তাই ওপরের বাঁকানো অংশটুকুর যেখানটা ব্যাটারির পজিটিভ প্রান্তকে স্পর্শ করছে সেখানটা এবং নিচের গোল অংশটুকুর ওপরে অন্তরকের আস্তরণটুকু আগুনে পুড়িয়ে কিংবা সিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষে তুলে ফেলতে হবে। একটা অ্যালকালাইন ব্যাটারির নিচের অংশের সঙ্গে বেশ কয়েকটি নিওডিমিয়াম চুম্বক আটকে দিতে হবে। তারপর এই তামার তারটিকে ৩ নম্বর ছবির মতো করে ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে তারের নিচের গোল অংশটুকু যাতে চুম্বককে স্পর্শ করে থাকে। সঙ্গে সঙ্গেই তারটি ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করবে।

এই ডিজাইনটি ছাড়াও হোমোপোলার মোটর আমরা আরেকভাবে বানিয়ে দেখতে পারি। দুটি নিওডিমিয়াম চুম্বক নিয়ে তার ওপর একটি ড্রাইওয়াল স্ক্রু উল্টো করে বসাতে হবে। একটি অ্যালকালাইন ব্যাটারির নিচের প্রান্তে চুম্বকসহ স্ক্রুটি ৪ নম্বর ছবির মতো করে ঝুলিয়ে দিতে হবে। একটা তামার তার নিয়ে সেটার এক প্রান্ত ব্যাটারির পজিটিভ টার্মিনালের সঙ্গে, অপর প্রান্ত নিচে চুম্বকের গায়ের সঙ্গে স্পর্শ করাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে চুম্বকসহ স্ক্রুটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করবে।

ছবি ৫
বিজ্ঞানচিন্তা

এই মোটর দুটি আসলে একই নিয়ম মেনে কাজ করছে। ৬ নম্বর ছবি থেকে ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝা যাবে। প্রথম মোটরটিতে চৌম্বকক্ষেত্র যেদিকে কাজ করছে, চুম্বকের পাশে বিদ্যুৎ প্রবাহ তার সঙ্গে সমকোণে আছে। বিদ্যুৎ প্রবাহ যে ইলেকট্রনের কারণে হচ্ছে, সে ইলেকট্রনগুলো একটা চুম্বকক্ষেত্রে চলাচল করলে একধরনের বল অনুভব করে। একে লরেঞ্জ বল বলা হয়। এই বলের দিক চৌম্বকক্ষেত্র এবং বিদ্যুৎ প্রবাহের দিকের সঙ্গে সমকোণে থাকে। এই বলের কারণে তামার তার এবং চুম্বকের ওপর টর্ক তৈরি হয়। নিওডিমিয়াম চুম্বকের বাইরের আবরণ সাধারণত নিকেলের তৈরি হয়, যেটা বেশ ভালো বিদ্যুত্ পরিবাহী। চুম্বকগুলো টেবিলের ওপর বসে আছে বলে সেগুলো ঘোরে না, শুধু তামার তারটি ঘোরে। দ্বিতীয় মোটরটিতে পুরো ব্যাপারটা প্রায় একই। সেখানে তামার তারটিকে আমরা হাত দিয়ে ধরে ছিলাম বলে সেটা ঘুরতে পারছে না, কিন্তু চুম্বক এবং তার ওপরে থাকা স্ক্রুটি ঘুরছে।

এ মোটরগুলো একাধারে অনেকক্ষণ চালিয়ে রাখা যাবে না। তারের মধ্য দিয়ে অনেক বেশি কারেন্ট প্রবাহিত হয় বলে অনেকক্ষণ মোটর চালিয়ে রাখলে তার খুব গরম হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া ব্যাটারিও শেষ হয়ে যাবে। সে জন্য অল্প কিছুক্ষণ পরেই সংযোগ খুলে ফেলতে হবে।

হোমোপোলার মোটর নিয়ে আরও ভালোভাবে জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন:

লেখকদ্বয়: সদস্য, একাডেমিক টিম, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি