আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা

যখন মনে মনে চিন্তা করি, তখনো কিন্তু আমাদের মনের মধ্যে একধরনের বাচন সক্রিয় থাকে। প্রত্যেকের নিজের ভেতরে চলছে নিরবচ্ছিন্ন এই নিজস্ব আলাপ—একটি অন্তর্বাচন। এটি আমাদের অনুভূতির ও চিন্তার অংশ, এরও একটি ভাষা রয়েছে। অন্তর্বাচনের এই ভাষাটি কী? এই প্রশ্নের উত্তরে দুটি বিকল্প তত্ত্ব রয়েছে। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী চিন্তার এই ভাষা হলো মাতৃভাষা, অথবা যেই ভাষায় আমরা শৈশবে প্রথম ভাষা অর্জনের সময় অভ্যস্ত হই, সেই ভাষা। অন্য তত্ত্বের মতে, এটি আমাদের পরিচিত কোনো ভাষাই নয়, একেবারেই নিরপেক্ষ, অভ্যন্তরীণ ও সহজাত একটি চিন্তার ভাষা। উপযুক্ত পরীক্ষণের মধ্যে প্রমাণ সম্পন্ন হয়নি বলে এই দুই তত্ত্বের কোনটি ঠিক এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তবে উভয়ের তাত্ত্বিক যুক্তিগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে মাতৃভাষার সঙ্গে অন্তর্বাচনের একটি বিশেষ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, অন্তর্বাচন নিজে মাতৃভাষা না হলেও। যা মাতৃভাষায় করতে পারব, তা বেশি হূদয়গ্রাহী হবে, মনের মধ্যে তা বাজবে বেশি, সেটি অনস্বীকার্য। তবে এর মাধ্যমে এটিও দেখা যায় যে অন্তর্বাচনের কিছুটা ভাষা-নিরপেক্ষতা থাকায় ভালো করে আমরা যেকোনো দ্বিতীয় ভাষা আয়ত্ত করি এবং যেসব কাজ আমরা সে ভাষায় করি, তা-ও আমাদের অন্তর্বাচনে অবদান রাখে।

আমার যোগাযোগের যে ভাষা, সে ক্ষেত্রে আমি কিন্তু একা থাকি না, তাই এটি অন্তর্বাচনের মতো নয়। যোগাযোগের যে অন্য পক্ষ তার ভাষা ও আমার ভাষা এক হলে ভালো, না হলেও যোগাযোগ আমাকে করতেই হয়। শিক্ষার ভাষারও সেই একই সমস্যা। এতে যোগাযোগ করতে হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের উেসর সঙ্গে, আবার সে জ্ঞান যাদের নিয়ে প্রয়োগ করব তাদের সঙ্গেও। তাই শিক্ষার ভাষা, তার ব্যবহারের ভাষা, সব সময় আমার মাতৃভাষায় হবে সেই জেদ কাম্য নয়। জ্ঞানের উেসর জগত্ এবং তার প্রয়োগের জগত্ উভয়ে আমাদের পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এমন জেদ করা যায় না, আর দুনিয়ার খুব কম জাতি এটি করতে পারে। জ্ঞানের চর্চায় এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরাক্রমে অনেক শক্তিশালী জাতিও এমন জেদ করে পরে পিছিয়ে এসেছে। এতে তাদের মধ্যে কোনো গ্লানি আসেনি বা ওই শক্তি সাধনায়ও কোনো ছেদ ঘটেনি। এর কারণ শিক্ষার ভাষা হিসেবে ভিন ভাষাকে ভালোভাবে বরণ করেও নিজের ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও নৈকট্যকে তারা একটুও বিসর্জন দেয়নি, কারণ সেটি অন্তরের ভাষার সবচেয়ে কাছাকাছি। শেষ পর্যন্ত নিজের ভাষার ওই সাহিত্যের মাধ্যমেই জগতের যত জ্ঞান, যত সৃষ্টিশীলতা, যত আবেদন মানুষের অন্তর্বাচনে ধরা পড়ে। বহু ভাষার প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে নিজের ভাষায় প্রত্যাবর্তন—এটি যে শুধু আজকের ঘটনা তা নয়, ইতিহাসের সব পর্যায়ে প্রায় সব জাতির জন্য তা-ই হয়েছে।

রাজা রামমোহন রায় ফারসি শিখেছেন, তার মাধ্যমে অনেক জ্ঞান আয়ত্ত করেছেন, সেসবের চর্চা করেছেন। তিনি ইংরেজি শিখেছেন, তার মাধ্যমে আরও অনেক জ্ঞান আয়ত্ত করেছেন, সেসবের চর্চা করেছেন। কিন্তু তাঁর ব্রাহ্মসমাজের ধারণা ও ব্রাহ্মসংগীত এই দুই ভাষার কোনোটির মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি—এ সমাজের, এ সংগীতের সব তত্ত্ব বাংলাতেই হয়েছে। বরং তাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উন্নত করেছেন তিনি ও তাঁর ব্রাহ্ম সহযোগীরা। ফারসিতে ও ইংরেজিতে তাঁর যে জ্ঞানবিচরণ, সেগুলো তাতে অন্তরায় হয়নি; বরং অনেক বেশি সহায়ক হয়েছে। রাজা রামমোহন রায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, কিন্তু তাঁর শিক্ষা লাভ প্রক্রিয়া বিরল ব্যতিক্রম বলে ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের যেকোনো স্কুলছাত্রের জন্য তিনিই আদর্শ হতে পারেন এবং হওয়া উচিত। রামমোহন ভাষা ঠিক করেছিলেন তাঁর সময়ের বিশ্ববাস্তবতায়, আমরা করব আমাদের সময়ের।

বাংলার প্রয়োগের দিক থেকে আমাদের ইতিবাচক অনেক অর্জন রয়েছে। গণমানুষের উন্নয়নের কর্মক্ষেত্রে, দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে, প্রশাসনে, জ্ঞানগর্ভ আলোচনায়, নিজেদের নীতিনির্ধারণী তর্ক-বিতর্কে, জ্ঞানের সব বিষয়ে পুস্তক রচনায় ও তার আস্বাদনে, আমরা আজ বাংলা চমত্কারভাবে ব্যবহার করছি এবং সেটিই সংগত। এ জন্য বিশ্বের সব বাংলাভাষীর কাছে আমরা সম্মানের আসন অর্জন করেছি। এগুলো সম্ভব হয়েছে, কারণ তা বাস্তবতার দিক থেকে যৌক্তিক। কিন্তু সেই যৌক্তিকতার বাইরে কিছু করতে যাওয়া সমীচীন হয় না, হবেও না। সে ক্ষেত্রে জবরদস্তি করলে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। শুধু একটি ভাষাকে যে আমাদের শিক্ষার ভাষা করা যাবে না, সেটি যথেষ্ট মূল্য দিয়ে এখন আমাদের বুঝতে হচ্ছে। স্কুলে সার্বিকভাবে আমাদের ভাষা শিক্ষার এবং বিশেষভাবে ইংরেজি শিক্ষার দুরবস্থা আজ সে কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। অতীতে একসময় বহুকাল ধরে আমাদের শিক্ষার একাধিক ভাষা ছিল স্কুল থেকেই। তাতে লেখাপড়া খারাপ হতো, তা কোনো শ্রেণির মধ্যে কুক্ষিগত থাকত, মাতৃভাষার উন্নয়ন ব্যাহত হতো, এমন কথা বলা যাবে না। আজ শুধু আমাদের পণ্ডিতেরাই নয়, সমগ্র গণমানুষ বিশ্বায়নের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে গেছে যে শিক্ষার ওই একাধিক ভাষার প্রয়োজন এখন বরং অনেক গুণে বেড়েছে এবং সবার জন্য সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে যেটি তখনো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখনো গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, মাতৃভাষার সঙ্গে প্রাণের যোগটি সব পর্যায়েই বজায় রাখতে হয়। বিজ্ঞানের সঙ্গে এবং জ্ঞানের অন্য সব শাখার সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় মাতৃভাষাতেই হতে হবে এবং সে পরিচয় এরপর থেকে চিরকাল বজায় রাখতে হবে। এর কারণ শেষ পর্যন্ত সব জ্ঞান আমাদের আত্মার কাছে আসবে, অন্তর্বাচনে আসবে মাতৃভাষার মাধ্যমেই। এ জ্ঞানের সংগ্রহটি অবশ্য আমাদের করতে হবে মাতৃভাষা ও বিশ্বভাষা উভয়ের মাধ্যমে এবং তা কিছুটা স্কুল থেকেই শুরু করে। এই উভয় ভাষার মধ্যে আমাদের আনাগোনা যত স্বচ্ছন্দ হবে, আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও আত্তীকরণও তত স্বচ্ছন্দ হবে। এই অর্থেই আমাদের প্রায় সবাইকে দ্বিভাষী হতে হবে এবং শিক্ষার আয়োজনটিও সেভাবেই হতে হবে।

উচ্চতর শিক্ষায় অর্থাত্ উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে বাদ দিয়ে সেখানে বাংলা মাধ্যমে প্রচলনের খেসারত আমরা প্রচুর দিয়েছি, এখনো দিচ্ছি। মনে করা হয়েছিল এতে শিক্ষা বেশি আত্মস্থ হবে, এর মান বেড়ে যাবে; হয়েছে তার উল্টো, যার কারণ সেই বিশ্ব বাতায়নটি বন্ধ হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে ছোটবেলা থেকে ইংরেজি ভাষা আয়ত্তের চ্যালেঞ্জটি আলগা হয়ে যাওয়ার ফলে ভাষা শিক্ষার পুরো ব্যাপারটিই অবহেলিত হয়ে সেটি বাংলা ভাষা শিক্ষাকেও আক্রান্ত করেছে। গবেষণায় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে যারা দ্বিভাষী, তাদের এক ভাষায় স্বচ্ছন্দ হওয়া অন্য ভাষার শিক্ষা বা চর্চাকে কোনোভাবে ব্যাহত করে না; বরং সাহায্য করে। এখন উচ্চশিক্ষায় ইংরেজিতে ফিরে আসার চেষ্টা করেও আমরা স্কুল-কলেজে ভিন্ন পরিস্থিতির কারণে দারুণভাবে মার খাচ্ছি। এ অবস্থায় শঙ্কিত হয়ে সংগতিসম্পন্ন মা-বাবারা একেবারে কথা শেখার বয়স থেকে ছেলেমেয়েকে এমন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সোপর্দ করে দিচ্ছেন, যার পর থেকে মাতৃভাষার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই আর থাকে না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেশের সঙ্গেও। সেই শ্রেণিটি ক্রমে প্রসারিত হচ্ছে, দেশে শ্রেণি বিভাজন প্রকট হচ্ছে।

অথচ দ্বিভাষী হওয়ার মধ্যে কোনো বিভাজন নেই, অতীতে আমাদের দেশেও ছিল না। বাংলা আমার মাতৃভাষা, সাহিত্যের ভাষা—সেটি বিজ্ঞান সাহিত্য হলেও তা-ই, আত্মার অনুভব পাওয়ার জন্য যেকোনো রকম সাহিত্য হলেও। এ ভাষাতেই আমরা সব জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অন্তর থেকে অনুভব করব। কিন্তু ওই জ্ঞান-বিজ্ঞান বিশ্ব থেকে স্বচ্ছন্দে সংগ্রহ করার জন্য এবং স্বচ্ছন্দে চর্চা করার জন্য ইংরেজিও আমাদের ভালোভাবেই প্রয়োজন। এটি অস্বীকার করেই বরং আমরা বিভাজন সৃষ্টি করছি।

লেখক: পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ও বিজ্ঞান লেখক