পৃথিবীর চৌম্বক মেরু বদলে গেলেও প্রাণীরা যেভাবে পথ চিনবে
শীতের সময় হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া পাখি এক দেশ থেকে আরেক দেশে উড়ে যায়। শুধু পাখিই কেন বলছি, সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে চলে কচ্ছপও। এরা কীভাবে পথ চিনে আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়?
আসলে পরিযায়ী প্রাণীদের পথ চেনার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এদের অনেকেই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে নিজেদের ভেতরের ‘কম্পাস’ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু পৃথিবীর এই চৌম্বক মেরু কিন্তু চিরকাল এক জায়গায় স্থির থাকে না। ভৌগোলিক ইতিহাসের পাতা ঘাটলে আপনি দেখতে পাবেন, পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু বেশ কয়েকবার নিজেদের জায়গা অদলবদল করেছে।
পরিযায়ী প্রাণীরা পৃথিবীতে আসার পর থেকেই বেশ কয়েকবার এমন মেরু পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। তাহলে আপনার মনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগতেই পারে, দিক নির্দেশক চৌম্বক ক্ষেত্রই যদি উল্টে যায়, তবে এই প্রাণীরা পথ হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেল না কেন? সৌরঝড়ের কারণে চৌম্বক ক্ষেত্রের সামান্য এদিক-ওদিক হলেই যেখানে কবুতর পথ হারিয়ে ফেলে, সেখানে পুরো মেরু উল্টে গেলে এই প্রাণীদের কী দশা হবে?
আসলে পরিযায়ী প্রাণীদের পথ চেনার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এদের অনেকেই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে নিজেদের ভেতরের কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে।
মাঝেমধ্যেই কিছু ভীতিজাগানিয়া খবর চোখে পড়ে—পৃথিবীর মেরু নাকি খুব শিগগিরই উল্টে যাচ্ছে। দক্ষিণ আটলান্টিকের ওপর চৌম্বক ক্ষেত্রের দুর্বলতা দেখে অনেকেই এমন দাবি করেন। কিন্তু ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, এটি একেবারেই স্বাভাবিক একটি ঘটনা এবং শিগগিরই মেরু উল্টে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। সর্বশেষ পুরো মেরু পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার বছর আগে। তবুও বিজ্ঞানীদের কৌতূহল মেটেনি; যদি আবার এমনটা হয়, তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই আধুনিক বিশ্ব এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীদের ঠিক কী হবে?
এই কৌতূহলের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এরিক ওয়ারেন্ট বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি কাজ করেন অস্ট্রেলিয়ার বোগং মথ নামে এক প্রজাতির পরিযায়ী পোকা নিয়ে। এই খুদে পোকাগুলো প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এমন কিছু পাহাড়ি গুহায় গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে তারা আগে কখনো যায়নি। তাদের দলে কোনো বয়স্ক মথ থাকে না যে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের মস্তিষ্কের আকারও একদম ক্ষুদ্র। তবুও তারা নিখুঁতভাবে গ্রীষ্ম কাটানোর জন্য সেই ঠান্ডা গুহাগুলো ঠিকই খুঁজে বের করে।
ওয়ারেন্ট তাঁর গবেষণায় দেখেছেন, এই মথগুলো পথ চেনার জন্য পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে। তাহলে মেরু উল্টে গেলে তারা কীভাবে বাঁচে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি তিনটি মূল কারণের কথা উল্লেখ করেছেন।
বোগং মথ পোকাদের দলে কোনো বয়স্ক মথ থাকে না যে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের মস্তিষ্কের আকারও একদম ক্ষুদ্র। তবুও তারা নিখুঁতভাবে গ্রীষ্ম কাটানোর জন্য ঠান্ডা গুহাগুলো খুঁজে বের করে।
প্রথমত, প্রাকৃতিক নির্বাচন। যেকোনো প্রাণীর দলেই জিনগত মিউটেশনের কারণে এমন কিছু সদস্য জন্মায়, যাদের ভেতরের ‘কম্পাস’ একটু উল্টাপাল্টা কাজ করে। সাধারণ সময়ে এই ত্রুটিপূর্ণ কম্পাসের কারণে তারা হয়তো পথ হারিয়ে মারা যায়। কিন্তু যখন পৃথিবীর চৌম্বক মেরু উল্টে যায়, তখন ওই ভুল কম্পাসওয়ালা সদস্যরাই একদম ঠিকঠাক পথ চিনে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। বাকিরা পথ হারিয়ে মারা পড়লেও, এই ত্রুটিপূর্ণ সদস্যরাই তখন দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে পুরো শূন্যস্থান পূরণ করে নেয়। বিশেষ করে পোকামাকড়দের ক্ষেত্রে এটি খুব দ্রুত ঘটে, কারণ এদের জীবনচক্র অত্যন্ত ছোট।
দ্বিতীয়ত, পথ চেনার বিকল্প উপায়। পরিযায়ী প্রাণীরা পথ চেনার জন্য অন্ধের মতো কেবল চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে না। তাদের কাছে বিকল্প প ব্যবস্থাও থাকে। যেমন সূর্য, তারা বা আশপাশের গন্ধ। ওয়ারেন্ট তাঁর একটি গবেষণায় কৃত্রিম প্ল্যানেটোরিয়ামের ভেতর পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বোগং মথ তখন আকাশের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি দেখে নিজেদের পথ চিনে নিচ্ছে! মেঘমুক্ত রাতে চৌম্বক ক্ষেত্র কাজ না করলেও তারা ঠিকই বিকল্প উপায়ে পথ খুঁজে নিতে পারে।
আর সবশেষ হলো, পরিবর্তনের ধীর গতি। মেরু পরিবর্তনের এই ঘটনা কোনো হলিউডের সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মতো এক রাতের মধ্যে ঘটে যায় না। একটি সম্পূর্ণ মেরু পরিবর্তন হতে কয়েক হাজার বছর, এমনকি ৮০ হাজার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এত দীর্ঘ সময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রাণীরা খুব সহজেই নতুন চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেদের জেনেটিক্যালি মানিয়ে নেওয়ার এবং নিজেদের ভেতরের কম্পাসকে নতুন করে ক্যালিব্রেট করার সুযোগ পায়।
সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এরিক ওয়ারেন্ট অবাক হয়ে দেখলেন, বোগং মথ তখন আকাশের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি দেখে নিজেদের পথ চিনে নিচ্ছে!
ওয়ারেন্ট এখন তাঁর গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে চাইছেন। তিনি দেখতে চান, মথগুলোকে যদি একই সঙ্গে দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত সংকেত দেওয়া হয়, তবে তারা কী করবে। ধরুন, প্ল্যানেটোরিয়ামের ভেতর শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে পৃথিবীর উল্টো একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করা হলো, আবার মাথার ওপরে তারায় ভরা আকাশও থাকল। এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে মথেরা কোনটিকে বেশি বিশ্বাস করবে? নক্ষত্র নাকি চুম্বক?
বর্তমান সময়ে যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো জরুরি গবেষণাতেই ঠিকমতো ফান্ডিং পাওয়া যায় না, সেখানে মথ নিয়ে এমন কৌতূহল-উদ্দীপক গবেষণার অনুদান জোগাড় করা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন। হয়তো ওয়ারেন্টকে শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেট দুনিয়ার অনুকরণে ‘অনলি মথস’ নামে কোনো ফান্ডরেইজার খুলতে হতে পারে!
বোগং মথের আকার ছোট হওয়ায় ল্যাবে তাদের নিয়ে কাজ করা যতটা সহজ, বড় আকৃতির পরিযায়ী প্রাণীদের নিয়ে এমন পরীক্ষা করা ঠিক ততটাই কঠিন। তাই প্রকৃতিতে মেরু উল্টে গেলে আসলে কী ঘটে, তার শতভাগ নিশ্চিত উত্তর পেতে হলে হয়তো আমাদের পরবর্তী মেরু পরিবর্তন পর্যন্ত অপেক্ষাই করতে হবে। আর সেই চাক্ষুষ প্রমাণ দেখার জন্য মানবজাতিকে অন্তত আরও কয়েক হাজার বছর এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হবে!