আপনি কি সচেতনভাবে স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান

শিল্পীর কল্পনায় লুসিড ড্রিমের দৃশ্যছবি: ব্লুম ট্যাম্পা বে ডটকম

শিরোনামটি পড়ে আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, স্বপ্নকে কি আসলেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়? উত্তর হ্যাঁ, যায়! বিজ্ঞানীরা এখন এমন কিছু প্রযুক্তি ও পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণে আনা বা নিজের ইচ্ছামতো স্বপ্ন দেখা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণার নাম লুসিড ড্রিমিং।

লুসিড ড্রিমিং হলো স্বপ্নের ভেতরে সচেতন থাকা। এটি এমন একধরনের স্বপ্ন, যেখানে ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষ বুঝতে পারেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন। অনেক সময় তিনি নিজের ইচ্ছামতো স্বপ্নের ঘটনাগুলো পরিচালনাও করতে পারেন। যেমন, স্বপ্নে তিনি নিজের ইচ্ছামতো দৌড়ান, আকাশে ওড়েন বা পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। হুট করে যেকোনো দিন আপনি লুসিড ড্রিম দেখতে পারেন, আবার বিশেষ অনুশীলনের মাধ্যমেও এটি আয়ত্ত করা সম্ভব। এই স্বপ্নের অনুভূতিগুলো একদম বাস্তবের মতোই মনে হয়। অর্থাৎ আপনি যদি স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে ঘুমের ভেতরেই কোনো খরচ বা শারীরিক কষ্ট ছাড়া অত্যন্ত আনন্দদায়ক অনুভূতি লাভ করতে পারবেন।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, লুসিড ড্রিম দেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশটি মূলত সচেতন ভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত।

লুসিড ড্রিম দেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি সক্রিয় থাকে
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা এখন হাইটেক স্লিপ মাস্ক, অ্যাপ বা সেন্সর তৈরি করছেন। এগুলো আপনার ঘুমের একটি নির্দিষ্ট পর্যায় বা রেম স্লিপ শনাক্ত করতে পারে। শনাক্ত করার পর, আপনি যে ধরনের দৃশ্য দেখতে চান, সেই অনুযায়ী আলো, কম্পন বা শব্দ সংকেত হিসেবে পাঠায়। এই সংকেত পেয়ে আপনি স্বপ্নের ভেতরে থেকেই বুঝতে পারেন, আপনি এখন স্বপ্ন দেখছেন। এভাবে স্বপ্নের ভেতরে সচেতনতা বাড়ানো যায়। ধারণা করা হয়, যাঁরা প্রাকৃতিকভাবে স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাঁরা মানুষ হিসেবে বেশ সৃজনশীল।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, লুসিড ড্রিম দেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশটি মূলত সচেতন ভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত।

স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সুফল

স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আপনি লাখ টাকার অনুভূতি স্বপ্নেই বিনা মূল্যে পেতে পারেন! বাস্তবে আপনি যে ইচ্ছা পূরণ করতে পারছেন না, আক্ষরিক অর্থেই স্বপ্নে তা পূরণ করতে পারবেন। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক বাস্তব ও স্বপ্নে দেখা অনুভূতির মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করতে পারে না।

নিশ্চিন্ত ঘুমের ভেতর স্বপ্নের জগতেও আপনি জটিল চিন্তাভাবনার মাধ্যমে বাস্তব জীবনের নানা সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান বের করতে পারেন।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, স্বপ্নের মধ্যে কোনো কাজের অনুশীলন করলে বাস্তবেও মস্তিষ্ক সেই কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারে।

ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন, ট্রমা, গভীর হতাশা, ব্যর্থতা বা মানসিক বেদনা মোকাবিলায় লুসিড ড্রিমিং থেরাপি বেশ সহায়ক হতে পারে।

সতর্কতা ও সীমাবদ্ধতা

লুসিড ড্রিমিং নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর প্রযুক্তিগুলো সব মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর বা নিরাপদ নয়। কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ঘুমের মান খারাপ করে দিতে পারে। এমনকি স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতে পারে। যাঁদের ওপর এই পরীক্ষা করা হয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ বাস্তবের চেয়ে লুসিড ড্রিমিংয়ের জগতেই নিজেকে বেশি সুখি দাবি করেছেন। বাস্তবে বেঁচে থাকার চেয়ে স্বপ্নে জীবিত থাকার অনুভূতিকেই তাঁরা বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন! অর্থাৎ, তাঁরা চেয়েছেন তাঁদের সত্তাকে যেন বেশি বেশি স্বপ্নের জগতেই বাঁচিয়ে রাখা হয়। এককথায় বলতে গেলে, অতিরিক্ত লুসিড ড্রিমিংয়ের ফলে মানুষ বাস্তব দুনিয়া থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

আরও পড়ুন