দুজন মানুষের স্বপ্নে কি যোগাযোগ হওয়া সম্ভব

বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মধ্যে স্বপ্নেও যোগাযোগের সম্ভাবনা রয়েছেছবি: গেটি ইমেজ

দুজন মানুষের যোগাযোগ হচ্ছে কেবল স্বপ্নে। হয়তো স্বপ্নেই তাঁরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছেন। একেক দিন স্বপ্নে একেক রকম অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন তাঁরা। ঘুম থেকে উঠে বাস্তবে হয়তো হন্যে হয়ে খুঁজছেন অপর মানুষটিকে। কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষটার কোনো অস্তিত্ব আছে কি না, তা দুজনের কেউই নিশ্চিত নন। আবার পরের দিন স্বপ্নে যে সেই মানুষটার সঙ্গেই দেখা হবে, তা-ও নিয়ন্ত্রণ করার উপায় নেই।

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বা মুভির বড় পর্দায় হয়তো এমন দৃশ্য আপনি দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে কি সত্যিই স্বপ্নে দুজন মানুষের মধ্যে যোগাযোগ হওয়া সম্ভব? এমন প্রশ্ন আপনার মনে জাগতেই পারে। মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা আপনার এই ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বরং তাঁরা দেখিয়েছেন, দুজন মানুষের মধ্যে স্বপ্নেও যোগাযোগ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

লুসিড ড্রিম হলো এমন একধরনের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থাতেই বুঝতে পারে যে সে স্বপ্ন দেখছে। অর্থাৎ সে স্বপ্নের মধ্যে নিজেকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। চাইলে স্বপ্নের গল্প বা দৃশ্যপটও নিজের মতো বদলে ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই বা তার বেশি লুসিড ড্রিমার স্বপ্নের মধ্যেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। দুজনের ঘুমের র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা রেম পর্যায় যদি একই সময়ে ঘটে, তবে তাঁদের মধ্যে সংকেত পাঠানো এবং প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করা সহজ হয়। একে সিঙ্ক্রোনাইজড রিম বলা যেতে পারে।

আরও পড়ুন
লুসিড ড্রিম হলো এমন একধরনের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থাতেই বুঝতে পারে যে সে স্বপ্ন দেখছে। অর্থাৎ সে স্বপ্নের মধ্যে নিজেকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

গবেষকেরা ধারণা করেন, দুজন স্বপ্নদ্রষ্টা আলাদা ঘরে, আলাদা স্থানে বা এমনকি আলাদা সময়ে ঘুমালেও তাঁদের মধ্যে সংকেতের আদান-প্রদান সম্ভব। তবে কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে এই যোগাযোগ কীভাবে ঘটে, তা এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। যদিও ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনার কথা শোনা যায়, যেখানে মানুষ স্বপ্নে প্রিয়জন বা মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে ভবিষ্যতের বিপদ সম্পর্কে সতর্কবার্তা বা দিকনির্দেশনা পেয়েছেন।

একাধিক গবেষণায় ইইজি ব্যবহার করে দেখা গেছে, যাঁরা একসঙ্গে লুসিড ড্রিমার হিসেবে স্বপ্নে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুগুলো একই প্যাটার্নে সক্রিয় হয়। অর্থাৎ তাঁরা যে শুধু স্বপ্নে যোগাযোগের অনুভূতি পাচ্ছেন তা নয়, বাস্তবেও তাঁদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ একে অপরের সঙ্গে সমন্বিত হচ্ছে।

সম্প্রতি এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্নায়ুপ্রযুক্তি স্টার্টআপ রেমস্পেস। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁরা দুজন অভিজ্ঞ লুসিড ড্রিমারকে নিয়ে এই পরীক্ষা চালায়। দুজনের মধ্যে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাঁরা নিজ নিজ বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন এবং বিশেষ সেন্সরের সাহায্যে দূর থেকে তাঁদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ও ঘুম-চক্র পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।

আরও পড়ুন
একাধিক গবেষণায় ইইজি ব্যবহার করে দেখা গেছে, যাঁরা একসঙ্গে লুসিড ড্রিমার হিসেবে স্বপ্নে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুগুলো একই প্যাটার্নে সক্রিয় হয়।

পরীক্ষায় প্রথম ব্যক্তি যখন লুসিড ড্রিমে প্রবেশ করেন, তখন সার্ভার থেকে একটি বিশেষ ভাষার শব্দ ইয়ারবাডের মাধ্যমে তাঁর কানে পাঠানো হয়। তিনি স্বপ্নের মধ্যেই শব্দটি উচ্চারণ করেন, যা সেন্সরের মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়। এর আট মিনিট পর দ্বিতীয় ব্যক্তি লুসিড ড্রিমে প্রবেশ করলে সার্ভার থেকে রেকর্ড করা সেই শব্দটি তাঁর কাছে পাঠানো হয়।

প্রযুক্তির সাহায্যে স্বপ্নেও যোগাযোগ করা সম্ভব
ছবি: রেম-স্পেস

ঘুম থেকে উঠে তিনি শব্দটি নিশ্চিত করেন। একে অনেকেই ড্রিম টেলিপ্যাথি হিসেবে দেখলেও, এটি মূলত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে স্বপ্নে যোগাযোগ।

২০২৪ সালের অক্টোবরে এই যুগান্তকারী গবেষণার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তা স্বপ্ন গবেষণার দুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে।

 

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: টেক এক্সপ্লোরিস্ট

আরও পড়ুন