মানসিক চাপে থাকলে মস্তিষ্ক শান্ত করতে পারে গান
আমাদের মধ্যে অনেকেই গান শুনতে শুনতে কাজ করতে অনেক পছন্দ করেন। কেউ গান শুনতে শুনতে ঘর গোছান, কেউ বা কষে ফেলেন ত্রিকোণমিতির জটিল সব অঙ্ক। গান শুনলে মন ভালো হয়—এ কথা আমরা অনেকেই জানি। বিশেষ করে মানসিক চাপের সময় পছন্দের গান শুনলে অনেকটাই স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু গান কি শুধু মন ভালো করে? নতুন এক গবেষণা বলছে, ব্যাপারটা আরও গভীর। গান মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনে এবং শরীরকেও ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়।
প্রকৃতির শব্দ, যেমন পানির কলকল বা বৃষ্টির শব্দও আমাদের শান্ত করতে পারে। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শব্দের তুলনায় সংগীতের প্রভাব কিছুটা আলাদা। গান শোনার সময় হৃৎস্পন্দন কমে, ত্বকের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা কমে এবং স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে আসে।
চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষক ও এই গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ই দ্যু বলেন, ‘মানসিক চাপের পরও মস্তিষ্ক কিছু সময় অধিক সতর্ক অবস্থায় থাকতে পারে। প্রকৃতির শব্দ হয়তো মস্তিষ্ককে শান্ত পরিবেশ দেয়। কিন্তু সংগীত মস্তিষ্ককে একটি নির্দিষ্ট ধারার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। গানে কখনো উত্তেজনা তৈরি হয়, কোনো কিছুর প্রত্যাশা তৈরি হয়, আবার শেষ পর্যন্ত সেই উত্তেজনার সমাধানও ঘটে।’
প্রকৃতির শব্দ, যেমন পানির কলকল বা বৃষ্টির শব্দও আমাদের শান্ত করতে পারে। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শব্দের তুলনায় সংগীতের প্রভাব কিছুটা আলাদা।
গানের এই বিশেষ প্রভাব কীভাবে কাজ করে, তা জানতে গবেষকেরা কয়েকটি পরীক্ষা চালান। প্রথম পরীক্ষায় ৩০ জন অংশগ্রহণকারীকে গান শুনতে দেওয়া হয়। আরেকটি পরীক্ষায় ৩০ জনের দলকে শোনানো হয় প্রকৃতির পানির শব্দ। গান বা পানির শব্দ শোনানোর আগে ও পরে তাঁদের একটি মানসিক চাপ তৈরির পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কঠিন অঙ্ক করতে দেওয়া হয় তাঁদের। পাশাপাশি তাঁদের কাজের ফলাফল সম্পর্কে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও দেওয়া হয়, যাতে মানসিক চাপ তৈরি হয়।
গবেষকেরা পরীক্ষার আগে ও পরে অংশগ্রহণকারীদের হৃৎস্পন্দন এবং লালায় থাকা কর্টিসলের মাত্রা পরিমাপ করেন। দেখা যায়, যাঁরা গান শুনেছিলেন, তাঁরা মানসিক চাপ থেকে তুলনামূলক দ্রুত সময়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন।
এরপর আরেকটি পরীক্ষায় ভিন্ন একদল অংশগ্রহণকারীর মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হয়। এ জন্য ব্যবহার করা হয় এফএমআরআই (fMRI) বা ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং। এতে দেখা যায়, প্রকৃতির শব্দ নয়, বরং গান শোনার সময় মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট স্নায়বিক পথের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
গান শুধু আমাদের চাপের কথা ভুলিয়ে রাখে না বা মন অন্যদিকে সরিয়ে দেয় না; বরং মস্তিষ্ককে একটি গোছানো পথ ধরে ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের যে অংশগুলো শব্দ নিয়ে কাজ করে এবং যে অংশগুলো মানসিক চাপ ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, গান শোনার সময় তাদের মধ্যে যোগাযোগের ধরন বদলে যায়। অর্থাৎ গান শুধু আমাদের চাপের কথা ভুলিয়ে রাখে না বা মন অন্যদিকে সরিয়ে দেয় না; বরং মস্তিষ্ককে একটি গোছানো পথ ধরে ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
তবে গান কীভাবে মস্তিষ্ককে শান্ত করে, তা পুরোপুরি বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন সুস্থ ও তরুণ মানুষ, যাঁদের স্বল্পমেয়াদি মানসিক চাপের মধ্যে রাখা হয়েছিল। তাই দীর্ঘদিন মানসিক চাপ বা চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া গবেষকেরা এই গবেষণায় নিজেদের পছন্দ করা কিছু গান ব্যবহার করেছিলেন। মানুষের নিজের পছন্দের গান শুনলে এর প্রভাব ভিন্নও হতে পারে।