মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন কেন সম্ভব নয়

মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করা কি সত্যিই সম্ভব নয়?ছবি: এলআইভি হসপিটাল

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অ্যালকর নামে একটি বিশেষ গবেষণাকেন্দ্র আছে। সেখানে গেলে আপনি রীতিমতো শিউরে উঠবেন! কারণ, সেখানকার অতিশীতল ক্রায়োজেনিক চেম্বারগুলোতে সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখা আছে প্রায় ১৫০টির বেশি মস্তিষ্ক!

এই মস্তিষ্কগুলো মূলত এমন আশায় সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতের উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান হয়তো এগুলোকে নতুন কোনো শরীরে বসিয়ে আবার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে। রোগীরা কেন এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করছেন? বিজ্ঞান তো এখন অনেক এগিয়ে গেছে। তাহলে এই তরতাজা মাথাগুলো এখনই কেন নতুন কোনো শরীরে বসিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না? সোজা কথায় প্রশ্ন করলে, মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করা সত্যিই সম্ভব নয়?

উইসকনসিন মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারির সহকারী অধ্যাপক ম্যাক্স ক্রুকফ এই প্রক্রিয়াটিকে ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন বলতে নারাজ। তাঁর মতে, একে বরং শরীর প্রতিস্থাপন বলা উচিত। তিনি জানান, হার্ট বা লিভার প্রতিস্থাপন করলে একজন মানুষ নতুন হার্ট পান ঠিকই, কিন্তু মানুষটা একই থাকেন। তবে কারও শরীরে নতুন মস্তিষ্ক বসিয়ে দিলে তিনি পুরোপুরি নতুন একজন মানুষ হয়ে যাবেন। কারণ, আপনার পরিচয়, আপনার স্মৃতি এবং আপনার পুরো সত্তা লুকিয়ে আছে আপনার এই মস্তিষ্কের ভেতরেই!

আরও পড়ুন
উইসকনসিন মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারির সহকারী অধ্যাপক ম্যাক্স ক্রুকফ এই প্রক্রিয়াটিকে ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন বলতে নারাজ। তাঁর মতে, একে বরং শরীর প্রতিস্থাপন বলা উচিত।

কিন্তু এটি কেন সম্ভব নয়? ক্রুকফ জানান, অন্তত বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রতিস্থাপন একেবারেই অসম্ভব। এর মূল কারণ হলো আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে যাওয়া স্পাইনাল কর্ড নিয়ে এই স্নায়ুতন্ত্র গঠিত। আমাদের শরীরের অন্যান্য অংশের প্রান্তীয় স্নায়ুগুলো কেটে গেলে কিংবা প্রতিস্থাপন করলে তারা একসময় জোড়া লেগে যায় এবং নতুন স্নায়ুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরনগুলো নিজে নিজে নতুন করে তৈরি হতে পারে না।

এমনকি মস্তিষ্কের কোনো ছোট অংশ, যেমন সেরিবেলাম প্রতিস্থাপন করাও এখন কল্পনার বাইরে। কারণ, এই ছোট্ট অংশে থাকে লাখ লাখ বিশেষ নিউরন। এদের বলা হয় পারকিনজি কোষ। প্রতিটি কোষ আবার হাজার হাজার অন্য কোষের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই যোগাযোগের হিসাবটা এতই বিশাল যে, তা আধুনিক বিজ্ঞানেরও ধারণার বাইরে।

সার্জনরা হয়তো নিখুঁতভাবে গলার চামড়া, পেশি, রক্তনালি ও হাড় জোড়া লাগিয়ে দিতে পারবেন। এমনকি মেরুদণ্ডের স্নায়ুগুলোকে মুখোমুখি এনে বসিয়েও দিতে পারবেন। কিন্তু ওই স্নায়ুকোষগুলোকে একে অপরের সঙ্গে কীভাবে কথা বলাতে হবে কিংবা সংকেত আদান-প্রদান করাতে হবে, সেই প্রযুক্তি মানুষের এখনো জানা নেই।

শুনলে অবাক হবেন, বিজ্ঞানীরা ১৯০০ সালের শুরুর দিকেই কুকুর ও বানরের ওপর মাথা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রক্তনালি জোড়া লাগানো এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থতায় সেসব প্রাণী কয়েক দিনের বেশি বাঁচেনি।

আরও পড়ুন
এমনকি মস্তিষ্কের কোনো একটি ছোট অংশ, যেমন সেরিবেলাম প্রতিস্থাপন করাও এখন কল্পনার বাইরে। কারণ, এই ছোট্ট অংশে লাখ লাখ বিশেষ নিউরন থাকে, যাদের পারকিনজি কোষ বলা হয়।

এরপর ১৯৭০ সালে রবার্ট জে. হোয়াইট বানরের মাথা নতুন শরীরে বসানোর একটি সাড়া জাগানো পরীক্ষা করেন। সেই বানরগুলো অস্ত্রোপচারের পর খাবার চিবিয়ে গিলতে পারত। তাদের মস্তিষ্কের স্ক্যান করে দেখা যায়, তারা পুরোপুরি সজাগ ছিল। তবে কোনো বানরই নয় দিনের বেশি বাঁচেনি।

এই গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতালীয় সার্জন সের্জিও কানাভেরো ২০১৩ সালে মানুষের মাথা প্রতিস্থাপনের এক বিশাল পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তবে নীতিগত ও বৈজ্ঞানিক কারণে বিজ্ঞানীরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ২০১৭ সালে কানাভেরো দাবি করেন, তিনি একটি মৃতদেহের ওপর সফলভাবে মাথা প্রতিস্থাপন করেছেন। তবে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিসিস্ট আর্থার ক্যাপলান তখন এটিকে একটি জঘন্য প্রতারণা বলে আখ্যা দেন। কারণ, একটি মস্তিষ্কের সঙ্গে শরীরের নতুন স্নায়ুর সংযোগ ঘটানো বাস্তবে অসম্ভব।

পুরো মস্তিষ্ক পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, বিজ্ঞানীরা আশা করছেন স্টেম সেল বা ল্যাবে তৈরি অর্গানয়েড দিয়ে একদিন হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক সারিয়ে তোলা যাবে।

সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুসলান রাস্ট জানান, পরিণত নিউরনের চেয়ে স্টেম সেল দিয়ে তৈরি হওয়া নতুন নিউরন মস্তিষ্কে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি রোগীর নিজের শরীর থেকেই এই স্টেম সেল নেওয়া যায়। এতে শরীর সেটাকে বাইরের কোনো ক্ষতিকর বস্তু ভেবে আক্রমণ করবে না।

আরও পড়ুন
২০১৭ সালে ইতালীয় সার্জন সের্জিও কানাভেরো দাবি করেন, তিনি একটি মৃতদেহের ওপর সফলভাবে মাথা প্রতিস্থাপন করেছেন।

ইতিমধ্যে পার্কিনসনস, স্ট্রোক এবং মৃগীরোগের চিকিৎসায় স্টেম সেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এখনো এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি।

কারণ এই প্রযুক্তিতে বেশ কিছু ঝুঁকি আছে। যেমন, প্রতিস্থাপন করা সেলগুলো থেকে টিউমার তৈরি হতে পারে বা তারা ভুল কোনো সংকেত পাঠিয়ে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজে বাধা দিতে পারে। ড. রাস্টের মতে, বিজ্ঞানীদের এখন একটাই বড় চিন্তার বিষয়; কীভাবে এই কোষগুলোকে মস্তিষ্কের ঠিক ওই জায়গাতেই কাজে লাগানো যায়, যেখানে তাদের দরকার।

এ ছাড়া স্টেম সেল দিয়ে ল্যাবে স্নায়ুর যে টিস্যু তৈরি হয়, তাকে অর্গানয়েড বলে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্রেন অর্গানয়েড ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষত সারাতে পারে। তবে মানুষের ওপর এই চিকিৎসা শুরু হতে এখনো অনেক বছর বাকি।

তাই বলা যায়, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পের মতো মানুষের মাথা কেটে নতুন শরীরে বসানোর সেই রোমাঞ্চকর ও ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে আমাদের এখনো বহুকাল অপেক্ষা করতে হবে!

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন