স্বাভাবিক মস্তিষ্ক বলে কিছু নেই

একবিংশ শতাব্দী এখনও চলছে, কিন্তু এই সময়টাই আমাদের ভাবনার ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতো, সেগুলো এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে কিছু শক্তিশালী ধারণা। সেগুলো শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত তেমন ২১টি ধারণার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে পরিচিত হব। সেগুলো একবিংশ শতাব্দীর চিন্তাজগৎকে নতুন পথে নিয়ে গেছে।

চতুর্থ পর্বে থাকছে নিউরোডাইভার্সিটি

স্বাভাবিক মস্তিষ্ক বলে প্রকৃত অর্থে কিছু নেইছবি: রেডি ট্রেনিং অনলাইন

মানুষ পৃথিবীকে যেভাবে বোঝে, শেখে বা পৃথিবীর বিভিন্ন সত্তার সঙ্গে যেভাবে আচরণ করে, তা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। একেকজনের আচরণ একেক রকম। কোনো নির্দিষ্ট আচরণকে একমাত্র সঠিক বা স্ট্যান্ডার্ড বলা যায় না। চিন্তা, শেখা ও আচরণের এই পার্থক্যগুলো কোনো অসুস্থতা বা ভুল কিছু নয়; বরং এগুলো মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। নিউরোডাইভার্সিটিবিষয়ক গবেষণা আমাদের দীর্ঘদিনের পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এটি বলছে, স্বাভাবিক মস্তিষ্ক বলে প্রকৃত অর্থে কিছু নেই। ভিন্নধর্মী মস্তিষ্কগুলোরও রয়েছে নিজস্ব অনন্য শক্তি।

এক সময় বিজ্ঞান স্বাভাবিক মস্তিষ্কের জয়গান গাইত। যাদের মস্তিষ্ক সেই সংজ্ঞায় পড়ত না, তাদেরই রোগী বা মানসিক সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। নিউরোডাইভার্সিটি শব্দটি এখন সব মানুষের স্নায়বিক বৈচিত্র্যকে বোঝালেও, এটি মূলত অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি (অমনোযোগিতা ও অতিচঞ্চলতা), ডিসলেক্সিয়া (ভাষা বা পঠন অক্ষমতা) ও ডাইস্প্রাক্সিয়ার (নড়াচড়া ও সমন্বয়ের অসুবিধা) মতো বিষয়গুলোকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, এই অবস্থাগুলোকে রোগ হিসেবে না দেখে মস্তিষ্কের ভিন্ন রূপ হিসেবে দেখা উচিত।

নিউরোডাইভার্সিটি শব্দটি দ্বারা সব মানুষের স্নায়বিক বৈচিত্র্যকে বোঝায়
ছবি: সাই-পোস্ট

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে অস্ট্রেলীয় সমাজবিজ্ঞানী জুডি সিঙ্গার নিউরোডাইভার্সিটি শব্দটি প্রবর্তন করেন। তখন থেকেই একটি নতুন ভাবনা দানা বাঁধতে শুরু করে। এই রোগগুলোকে যদি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হিসেবে দেখা হয়, তবে কেমন হবে?

আরও পড়ুন
নিউরোডাইভার্সিটি শব্দটি এখন সব মানুষের স্নায়বিক বৈচিত্র্যকে বোঝালেও, এটি মূলত অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি, ডিসলেক্সিয়ার মতো বিষয়গুলোকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়।

নিউরোডাইভার্সিটি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল স্নায়ুবিকভাবে ভিন্ন মানুষদের গ্রহণযোগ্যতা, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। এটি মূলত তথাকথিত নিউরোলজিক্যাল সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলন হলেও বর্তমানে চিকিৎসা ও শিক্ষাক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব বাড়ছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে অটিস্টিক ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পান এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।

স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিকতার মধ্যে কোনো কঠোর সীমারেখা নেই; বরং মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতাগুলোকে একটি ধারাবাহিক বর্ণালীতে হিসাব করা উচিত, যার কোথাও না কোথাও আমরা সবাই অবস্থান করি। ২০১৩ সালে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডারস-এ অটিজমের একটি উচ্চ-কার্যক্ষম রূপ হিসেবে পরিচিত অ্যাসপারগারস সিনড্রোমকে আলাদা রোগ হিসেবে বাতিল করা হয়। এর বদলে সবকিছুকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের আয়তায় নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসকেরাও এখন নিউরোডাইভারজেন্সকে একটি স্পেকট্রাম হিসেবেই দেখেন।

নিউরোটিপিক্যাল বলতে বোঝায় যাদের মস্তিষ্ক সমাজের সাধারণ নিয়মে চলে
ছবি: চ্যাটজিপিটি

স্পেকট্রাম ধারণাটি আসার ফলে নিউরোটিপিক্যাল ও নিউরোডাইভারজেন্ট শব্দগুলোর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়েছে। নিউরোটিপিক্যাল মানে যাদের মস্তিষ্ক সমাজের সাধারণ নিয়মে চলে। আর নিউরোডাইভারজেন্ট মানে যাদের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করে।

স্পেকট্রামের প্রান্তের দিকে থাকা মানুষেরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের ভিন্নধর্মী মস্তিষ্কের সঙ্গে এমন কিছু অসাধারণ শক্তিও আসে, যা অন্যদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের গবেষণাগুলো বলছে, অটিস্টিক মানুষদের গাণিতিক যুক্তিবোধ, সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি মনোযোগ এবং প্যাটার্ন শনাক্ত করার ক্ষমতা গড়পড়তা মানুষের চেয়ে বেশি হতে পারে।

আরও পড়ুন
নিউরোটিপিক্যাল মানে যাদের মস্তিষ্ক সমাজের সাধারণ নিয়মে চলে। আর নিউরোডাইভারজেন্ট মানে যাদের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করে।

এডিএইচডি বা ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত মানুষেরা সৃজনশীলতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় ভালো করেন এবং বড় কোনো বিষয় বুঝতে পারদর্শী হন। ডাইস্প্রাক্সিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যেও পরিস্থিতি মোকাবিলার সৃজনশীল ক্ষমতা দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করছেন, নিউরোডাইভার্স অবস্থাগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়।

নিউরোডাইভারজেন্ট মস্তিষ্কের বৈচিত্র্য
ছবি: রিথিংক ডিসলেক্সিয়া

তবে সবকিছুরই মুদ্রার উল্টো পিঠ আছে। নিউরোডাইভারজেন্ট অবস্থাগুলোকে সুপারপাওয়ার বা অতিমানবীয় ক্ষমতা হিসেবে উপস্থাপন করা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে। যুক্তরাজ্যের ব্রিটেনের ব্রাইটন ও সাসেক্স মেডিক্যাল স্কুলের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নিউরোডাইভার্সিটি গবেষক জেসিকা একলস সতর্ক করে বলেন, ‘অতিরিক্ত ইতিবাচক হতে গিয়ে আমরা এর গুরুতর দিকগুলোকে খাটো করে দেখার ঝুঁকি নিই।’

 

লেখক: ফ্যাক্ট-চেকার, সত্যিফাই

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট, হার্ভার্ড হেলথ

আরও পড়ুন