বিশ্ব প্রাণী দিবস
ছদ্মবেশী সাঁঝপরী: সন্ধ্যা নামলেই জেগে ওঠে যে অদ্ভুত প্রজাপতি
আজ ৪ অক্টোবর, বিশ্ব প্রাণী দিবস। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতেই এই দিবসটি পালিত হয়। আমাদের চারপাশেই এমন অসংখ্য প্রাণী ছড়িয়ে আছে, যাদের জীবনযাপন ও টিকে থাকার কৌশল রীতিমতো অবাক করার মতো। এমনই এক অদ্ভুত ও রহস্যময় প্রাণী হলো সাঁঝপরী প্রজাপতি। এরা দিনের বেলা শুকনো পাতার ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে, জেগে ওঠে রাতে।
আমাদের চারপাশেই এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের হয়তো আগের মতো আর চোখে পড়ে না। এমনই একটি পতঙ্গ হলো সাঁঝপরী প্রজাপতি। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে, আকাশে যখন আলোর শেষ রেখা মিলিয়ে যাচ্ছে এবং গাছের নিচটা অন্ধকার হয়ে এসেছে, ঠিক সেই সময়টায় জেগে ওঠে এই প্রজাপতি। ইংরেজিতে এর নাম কমন ইভনিং ব্রাউন। বৈজ্ঞানিক নাম Melanitis leda। বাংলায় একে অনেকে ভোলভ্রমরী কিংবা সাঁঝপরী প্রজাপতি বলে ডাকেন।
দেখতে খুব একটা চোখধাঁধানো নয় এই প্রজাপতি। গায়ের রং বাদামি, ডানায় কোনো চকচকে নীল বা লাল আভা নেই। ডানা মেলে ধরলে এটি প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তার পায়। তবু প্রথম দেখায় এটিকে খুব সাধারণ, এমনকি কিছুটা একঘেয়েও লাগতে পারে। কিন্তু ডানা বন্ধ করে যখন কোনো শুকনো ডালের গায়ে বসে, তখন আপনি চমকে যাবেন। কারণ, তখন এটিকে আর প্রজাপতি বলে চেনার উপায় থাকে না, মনে হয় একটা শুকনো মরা পাতা বাতাসে উড়ে এসে ওখানে আটকে আছে।
ডানার নিচের দিকটায় পাতার শিরার মতো সরু সরু রেখা আঁকা থাকে। কোথাও একটু কালচে-বাদামি দাগ, যেন পাতাটা পোকায় কেটেছে! কোথাও হালকা হলুদাভ ছোপ, শুকিয়ে যাওয়া পাতার কিনারায় যেমন রং বদলায়, ঠিক তেমন। পাতার বোঁটার আদলে ডানার আগাটাও একটু বাঁকা। শুধু তা-ই নয়, বসার ভঙ্গিটাও একদম নকল। একটু বাঁকা ও অগোছালোভাবে বসে, যেন সত্যিকারের একটি পাতা উড়তে উড়তে এসে অসমান জায়গায় পড়েছে। সোজা বা ফিটফাট ভঙ্গিতে বসলে কাজটা হতো না, নকল ধরা পড়ে যেত সহজেই।
দেখতে খুব একটা চোখধাঁধানো নয় এই সাঁঝপরী প্রজাপতি। গায়ের রং বাদামি, ডানায় কোনো চকচকে নীল বা লাল আভা নেই। ডানা মেলে ধরলে এটি প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তার পায়।
মজার ব্যাপার হলো, এই ছদ্মবেশও ঋতুভেদে বদলায়। বর্ষার সময়কার প্রজাপতির ডানায় পাতার শিরাগুলো স্পষ্ট ও গাঢ় থাকে। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে সেই রেখা আরও ফিকে আর একরঙা হয়ে আসে, যা অনেকটা শুকিয়ে যাওয়া পাতার মতোই দেখতে লাগে। কীটতত্ত্ববিদেরা একে বলেন সিজনাল পলিফেনিজম। অর্থাৎ একই প্রজাতির প্রজাপতি ঋতুভেদে চেহারা পাল্টে ফেলে, যাতে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সব সময় মিশে থাকতে পারে।
পাখি, টিকটিকি বা বড় মাকড়সার প্রিয় খাবার হলো প্রজাপতি। রঙিন প্রজাপতি যত সহজে চোখে পড়ে, শিকারিও তাকে তত সহজে খুঁজে নেয়। কিন্তু যে প্রজাপতি নিজেকে শুকনো পাতা বানিয়ে ফেলতে পারে, তাকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। পাখি হয়তো ঠিক পাশ দিয়েই উড়ে যাচ্ছে, অথচ চিনতেই পারছে না এত কাছে বসেও প্রজাপতিটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা আত্মরক্ষার এই কৌশলের নাম দিয়েছেন ক্যামোফ্লেজ। প্রজাপতি জগতে এমন উদাহরণ আরও থাকলেও সাঁঝপরীর এই কাজটা রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে পড়ে।
মজার ব্যাপার হলো, এই একই প্রজাপতির ডানার ওপরের দিকটা একেবারে অন্য রকম। সেখানে বড় বড় কালো ফোঁটা, ভেতরে সাদা বিন্দু এবং চারপাশে হালকা কমলা বা সোনালি বলয় থাকে, যা দেখতে অনেকটা চোখের মতো। চোখের মতো এই ফোঁটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে আইস্পট। উড়ন্ত অবস্থায় ডানা খোলা থাকলে এই চোখগুলো হঠাৎ দৃশ্যমান হয়। তখন শিকারি প্রাণী এক মুহূর্তের জন্য থমকে যেতে পারে; ভাবতে পারে, এটি বুঝি কোনো বড় প্রাণীর চাহনি! ওই এক মুহূর্তের দ্বিধাই যথেষ্ট, প্রজাপতিটি ততক্ষণে উড়ে পালিয়ে যায়।
রঙিন প্রজাপতি যত সহজে চোখে পড়ে, শিকারিও তাকে তত সহজে খুঁজে নেয়। কিন্তু যে প্রজাপতি নিজেকে শুকনো পাতা বানিয়ে ফেলতে পারে, তাকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার।
সন্ধ্যাবেলার ব্যাপারটাও একটু আলাদা করে বলা দরকার। বেশির ভাগ প্রজাপতি দিনের আলোয় ওড়ে, ফুলে বসে মধু খায়। কিন্তু এই প্রজাপতি সেই নিয়ম মোটেও মানে না। দিনের বেলা ঝোপঝাড়ের আড়ালে বা পাতার নিচে চুপচাপ বসে কাটিয়ে দেয়। আলো কমতে শুরু করলেই সে বেরিয়ে পড়ে। ওড়াটাও বেশ অদ্ভুত। সোজা পথে না গিয়ে হঠাৎ এদিক-ওদিক বাঁক নেয়, থামে, আবার ছোটে। এই এলোমেলো ওড়াও হয়তো একধরনের কৌশল। কারণ, এতে শিকারির পক্ষে অনুমান করা কঠিন হয়ে যায় যে পরের মুহূর্তে সে কোন দিকে যাবে। গাছ থেকে ঝরে পড়া বা পচে যাওয়া ফলের রসের প্রতিও এই প্রজাপতির বিশেষ টান রয়েছে। ফুলের মধুর চেয়ে অনেক সময় পচা আম বা কলার রসকেই সে বেশি পছন্দ করে। সাধারণ প্রজাপতির অভ্যাসের সঙ্গে এখানেও তার একটি বড় ফারাক থেকে গেছে।
নিজের এলাকা নিয়েও বেশ পাগল স্বভাবের এই প্রজাপতি। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে থাকা পুরুষ প্রজাপতি তার আশপাশে অন্য কোনো প্রজাপতি এসে পড়লেই তেড়ে যায়। এমনকি একটি ছোট নুড়িপাথর ছুড়ে মারলেও সেটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে তাড়া করে বসে! এত ছোট একটি প্রাণী, অথচ তার সাহস রীতিমতো অবাক করার মতো।
গাছ থেকে ঝরে পড়া বা পচে যাওয়া ফলের রসের প্রতিও এই সাঁঝপরী প্রজাপতির বিশেষ টান রয়েছে। ফুলের মধুর চেয়ে অনেক সময় পচা আম বা কলার রসকেই সে বেশি পছন্দ করে।
বাংলাদেশে এই প্রজাপতি দুষ্প্রাপ্য কিছু নয়। বাগান, ঝোপঝাড়, বাঁশবন ও ধানখেতের আশপাশে এদের দেখা মেলে। শুককীট অবস্থায় এরা ধান, বাঁশপাতা আর নানারকম ঘাস খেয়ে বড় হয়। এই গাছগুলোই এদের আশ্রয়দাতা উদ্ভিদ। অর্থাৎ এসব গাছ ছাড়া এই প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পূর্ণ হয় না। ধান-নির্ভরতার কারণে অনেক জায়গায় একে ধানখেতের পরিচিত অতিথি হিসেবেও ধরা হয়। ফসলের ক্ষতি হতে পারে, এমন কিছু এরা করে না। তাই ঘাস বা ধানখেত আছে, এমন যেকোনো জায়গায় একে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে খুঁজে পাওয়াটাই আসল সমস্যা! দিনের বেলা খুঁজতে গেলে পাবেন না, তখন সে শুকনো পাতার ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকবে। সন্ধ্যায় খুঁজতে গেলে আলো এত কমে আসে যে চেনাই মুশকিল হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এই প্রজাপতির বসবাস; অথচ চোখে পড়ে কম। হয়তো এই লুকোচুরির কারণেই!