৫৯ হাজার বছর আগের ডেন্টিস্টরা পাথর ঘষে দাঁতের চিকিৎসা করত

আজ থেকে ৫৯ হাজার বছর আগে বরফযুগের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দাঁতের চিকিৎসা কেমন ছিল?ছবি: মার্ক লং

ডেন্টিস্টের চেয়ারে বসার কথা ভাবলেই কি আপনার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে? দাঁতের গর্ত পরিষ্কার করার জন্য ডাক্তার যখন ছোট্ট ড্রিল মেশিনটা চালু করেন, তখন ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসে অনেকেরই। আধুনিক যুগে চেতনানাশক ইনজেকশন দেওয়ার পরও দাঁতের চিকিৎসায় আমরা এত ভয় পাই। একবার ভাবুন তো, আজ থেকে ৫৯ হাজার বছর আগে বরফযুগের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দাঁতের চিকিৎসা কেমন ছিল? তখন তো কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি বা ওষুধ ছিল না। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, আমাদের প্রাচীন আত্মীয় নিয়ান্ডারথালরা সেই আমলেই রীতিমতো ডেন্টিস্টের কাজ করত!

বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ান্ডারথালদের পরিচয় ছিল বোকা, জংলি ও অসভ্য প্রাচীন মানুষ হিসেবে। অনেকেই মনে করতেন, এদের বুদ্ধি বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো বলছে উল্টো কথা। নিয়ান্ডারথালরা মোটেও বোকা ছিল না। তারা মৃতদেহ কবর দিত, আহত সঙ্গীদের সেবাযত্ন করত এবং বরফযুগের চরম বৈরী পরিবেশেও দারুণ সফলতার সঙ্গে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তারপরও বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা বিতর্ক ছিল। অনেকেই মনে করতেন, আধুনিক মানুষের মতো জটিল কোনো অস্ত্রোপচার বা সার্জারি করার মতো প্রযুক্তিগত জ্ঞান তাদের ছিল না। তবে রাশিয়ার সাইবেরিয়ার একটি গুহা থেকে পাওয়া একটি ক্ষতবিক্ষত দাঁত বিজ্ঞানীদের এই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

আরও পড়ুন
নিয়ান্ডারথালরা মোটেও বোকা ছিল না। তারা মৃতদেহ কবর দিত, আহত সঙ্গীদের সেবাযত্ন করত এবং বরফযুগের চরম বৈরী পরিবেশেও দারুণ সফলতার সঙ্গে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছিল।

ঘটনাটি শুরু ২০১৬ সালে। রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানী কেসনিয়া কোলোবোভা এবং তাঁর দল সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালার চাগিরস্কায়া গুহায় খননকাজ চালাচ্ছিলেন। সেখানে তাঁরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নিয়ান্ডারথালের মাড়ির দাঁত খুঁজে পান। দাঁতটির বয়স পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি আজ থেকে প্রায় ৫৯ হাজার বছর আগের! অন্যান্য প্রাচীন দাঁতের মতোই শক্ত ও বালুকাময় খাবার চিবানোর কারণে দাঁতটি বেশ ক্ষয়ে গিয়েছিল। ওই গুহায় দাঁতটির মালিকের শরীরের আর কোনো হাড়গোড় পাওয়া যায়নি। তবে দাঁতটির সবচেয়ে রহস্যময় দিকটি ছিল অন্যখানে। চিবানোর দিকটায় একটা বিশাল বড় গর্ত ছিল, যা দাঁতের একেবারে গভীরে নার্ভ এবং রক্তনালির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালার চাগিরস্কায়া গুহায় পাওয়া নিয়ান্ডারথালের মাড়ির দাঁত
ছবি: জুবোভা এট আল., ২০২৬, প্লস ওয়ান, সিসি-বাই ৪.০

প্রথম দেখায় যে কারও মনে হবে, এটি সাধারণ কোনো দাঁতের ইনফেকশন। এই ধরনের ভয়াবহ ইনফেকশন একসময় মানুষের মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। কিন্তু রুশ বিজ্ঞানী আলিসা জুবোভা এবং তাঁর দল যখন দাঁতটি মাইক্রোস্কোপ যন্ত্র এবং সিটি স্ক্যানের সাহায্যে আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করলেন, তখন তাঁরা অবাক হয়ে গেলেন! তাঁরা দেখলেন, দাঁতের গর্তের ভেতরের দেওয়ালে সূক্ষ্ম কিছু আঁচড় ও খাঁজকাটা দাগ রয়েছে। দাগগুলো দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, কোনো একটা তীক্ষ্ণ ও চোখা যন্ত্র বারবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গর্তটি তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, ইনফেকশনের অংশটি তুলে ফেলার জন্য কোনো এক আদিম ডেন্টিস্ট ইচ্ছে করেই দাঁতের ভেতর ড্রিলিং বা ছিদ্র করার কাজ করেছিল!

আরও পড়ুন
সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালার চাগিরস্কায়া গুহায় খুঁজে পাওয়া একজন প্রাপ্তবয়স্ক নিয়ান্ডারথালের মাড়ির দাঁতের পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি আজ থেকে প্রায় ৫৯ হাজার বছর আগের!

কিন্তু ওই আমলে পাথরের হাতিয়ার দিয়ে কি এত সূক্ষ্ম কাজ করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জুবোভা দ্বারস্থ হলেন পরীক্ষামূলক প্রত্নতত্ত্ববিদ লিডিয়া জটকিনার কাছে। কোন পাথর দিয়ে এই কাজ করা হতে পারে, তা বের করা খুব একটা কঠিন ছিল না। কারণ চাগিরস্কায়া গুহায় আগেই জ্যাসপার নামে একধরনের স্ফটিক জাতীয় পাথরের তৈরি ছোট ও ধারালো হাতিয়ার পাওয়া গিয়েছিল। জটকিনা তাঁর দল নিয়ে ওই জ্যাসপার পাথর দিয়ে প্রাচীন হাতিয়ারগুলোর হুবহু নকল বানালেন। তারপর সেগুলো দিয়ে সাধারণ কিছু দাঁতের ওপর ড্রিল করার পরীক্ষা চালালেন।

ফলাফল দেখে তাঁরা রীতিমতো চমকে উঠলেন! তাঁরা দেখলেন, জ্যাসপার পাথরের চোখা হাতিয়ার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ে দাঁতের ওপর চমৎকারভাবে গর্ত করা সম্ভব। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের তৈরি করা গর্তের ভেতরের দাগগুলোর সঙ্গে সেই ৫৯ হাজার বছর আগের নিয়ান্ডারথাল দাঁতের দাগগুলোর হুবহু মিল পাওয়া গেল! এই গবেষণাটি প্লোস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়। আধুনিক মানুষেরা এ ধরনের দাঁতের চিকিৎসার কৌশল আয়ত্ত করেছিল এমনটা প্রমাণ পাওয়া যায় এরও বহু পরে। অথচ এই আবিষ্কার প্রমাণ করে দিল, তারও প্রায় ৪৫ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালরা ডেন্টিস্টের কাজ করত!

আরও পড়ুন
জটকিনা তাঁর দল নিয়ে চাগিরস্কায়া গুহায় খুঁজে পাওয়া জ্যাসপার পাথর দিয়ে প্রাচীন হাতিয়ারগুলোর হুবহু নকল বানালেন। তারপর সেগুলো দিয়ে সাধারণ কিছু দাঁতের ওপর ড্রিল করার পরীক্ষা চালালেন।

গল্পটা কিন্তু শুধু দাঁত ছিদ্র করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গর্তের আশপাশের প্রান্তগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলো পরবর্তী সময়ে খাবার চিবানোর ফলে বেশ মসৃণ হয়ে গিয়েছিল। মানে ওই আদিম রোগী শুধু যে বিনা চেতনানাশকে এই ভয়ংকর কষ্টদায়ক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেঁচে ফিরেছিল তা-ই নয়, বরং এরপর দীর্ঘদিন ধরে সে ওই দাঁত দিয়ে খাবারও চিবিয়েছে! এ ছাড়া ওই মাড়ির দাঁতের দুপাশে চিকন কিছু দিয়ে বারবার খোঁচানোর দাগও পাওয়া গেছে। আমরা যেমন খাওয়ার পর টুথপিক বা খিলাল দিয়ে দাঁত খোঁচাই, ব্যাপারটা ঠিক তেমনই। মাড়ির অস্বস্তি দূর করার জন্যই হয়তো রোগীটি এমনটা করেছিল।

দাঁতের এই ছোট্ট আবিষ্কারটি নিয়ান্ডারথালদের জীবনযাপন সম্পর্কে এক বিশাল তথ্যভান্ডার খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই কাজ প্রমাণ করে যে নিয়ান্ডারথালদের হাত এবং আঙুলের ওপর চমৎকার নিয়ন্ত্রণ ছিল, যা দিয়ে তারা এত সূক্ষ্ম কাজ করতে পারত। তার চেয়েও বড় কথা, ভবিষ্যতের বড় কোনো বিপদ বা মৃত্যু এড়ানোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে চরম কষ্ট সহ্য করার যে মানসিকতা, তা তাদের ছিল। কারণ ও কার্যকারিতা বোঝার এই ক্ষমতা তাদের মধ্যে আদৌ ছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। এই আবিষ্কার সেই বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ড্যানিয়েল লিবারম্যান এই আবিষ্কার নিয়ে মজা করে বলেছেন, ‘এত প্রাচীন আমলে এমন জটিল একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়ার প্রমাণ দেখতে পাওয়াটা সত্যিই রোমাঞ্চকর! আমি যখন ক্লাসে পড়াই, তখন মাঝেমধ্যেই রসিকতা করে বলি, মানুষই হলো পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী, যারা ইচ্ছে করে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যায়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমাকে আমার এই জোকসটা একটু পাল্টাতে হবে!’

সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট

আরও পড়ুন