দাঁত কেন হাড় নয়

পাঠকের লেখা

একনজরে দেখলে যে কেউ বলতে পারে, দাঁত হাড়ের মতোই দেখতে। এমনটা ভাবায় আসলে কোনো দোষ নেই। কারণ দুটোই সাদা, শক্ত এবং ক্যালসিয়ামে পরিপূর্ণ। কিন্তু এত মিল থাকা সত্ত্বেও দাঁতকে কেন কঙ্কালতন্ত্রের অংশ হিসেবে ধরা হয় না?

দাঁত ও হাড়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো এদের গাঠনিক উপাদান। দুটোই ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ফ্লোরাইড এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি কঠিন টিস্যু। আণবিক গঠনের সময় এই খনিজগুলো একটি কঠিন ক্রিস্টাল কাঠামো গঠন করে, যার দরুন দাঁত ও হাড় মানবদেহের অন্য যেকোনো অঙ্গের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দাঁত সাধারণত ৩২টি। তবে জন্মের সময় শিশু কোনো দৃশ্যমান দাঁত ছাড়াই জন্মগ্রহণ করে। আসলে দাঁত হলো একটি একটোডার্মাল অঙ্গ। দাঁত চার ধরনের—কর্তন, ছেদন, অগ্রপেষণ এবং পেষণ। সে আলোচনা আজ থাক। দাঁত যে কঙ্কালতন্ত্রের অংশ নয়, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দাঁত ও হাড়ের সম্পূর্ণ ভিন্ন কার্যক্রম।

দাঁত আমাদের গ্রহণ করা খাদ্যকে কেটে, পিষে ছোট ছোট টুকরো করে। এরপর আমাদের জিহ্বা ও গলবিল খাবারটিকে একটি ছোট বলের মতো আকার দেয়, যা গিলতে সহজ করে। এ জন্য দাঁতকে পরিপাকতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া আমাদের মুখের কথা স্পষ্ট করতেও দাঁতের ভূমিকা অনেক।

আরও পড়ুন
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দাঁত সাধারণত ৩২টি। তবে কেউ কেউ কম দাঁত নিয়ে জন্মায়। কম দাঁত নিয়ে জন্মানোকে বলে হাইপোডন্টিয়া। আবার অনেকে অতিরিক্ত দাঁত নিয়ে জন্মায়, একে বলে হাইপারডন্টিয়া।

অন্যদিকে হাড়ের কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। দেহে থাকা ২০৬টি হাড় আমাদের শরীরকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করে। পাশাপাশি হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসের মতো নাজুক ও অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গগুলোকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া হাড়ের ভেতরে থাকা অস্থিমজ্জা বা নরম চর্বিযুক্ত টিস্যু হলো লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা উৎপাদনের কারখানা। এগুলো দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চোয়ালের হাড়গুলো দাঁতকে ধরে রাখে এবং খাবার চিবানোর ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। অর্থাৎ, দাঁত ও হাড় আমাদের শরীরে একসঙ্গে কাজ করলেও এরা মোটেও এক জিনিস নয়।

যেহেতু এদের কার্যক্রম ভিন্ন, তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে এদের গঠনও আলাদা। একটি দাঁতের গঠনে প্রধানত দুটি অংশ থাকে। মুকুট এবং মূল। দাঁতের মুকুটের অংশেই রয়েছে দাঁতের বহিঃস্তর, যা এনামেল দিয়ে আবৃত। এই এনামেলই মানবদেহের সবচেয়ে শক্তিশালী ও শক্ত পদার্থ। এর মূল কারণ, হাইড্রোক্সাপাটাইট। এটা মূলত ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের একটি স্ফটিকাকার গঠন। এই এনামেলই আমাদের দাঁতকে ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে ও দাঁতের ক্ষয় রোধ করে।

এনামেলের নিচে থাকে ডেন্টিনের স্তর, যা একপ্রকার খনিজ টিস্যু। এই ডেন্টিনই দাঁতের সিংহভাগ গঠন করে। ডেন্টিনের ভেতরের ফাঁপা টিউবগুলো রক্তনালি ও স্নায়ুর প্রান্তভাগ বহন করে। আর দাঁতের একদম ভেতরের অংশ হলো পাল্প। ডেন্টিনের ভেতরে থাকা নরম, জেলির মতো বস্তুই পাল্প। এতে ধমনি, শিরা, স্নায়ু ও নরম কোষ থাকে, যা দাঁতকে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং দাঁতের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতাড়না মস্তিস্কে পৌঁছে দেয়।

আরও পড়ুন
একটি দাঁতের গঠনে প্রধানত দুটি অংশ থাকে। মুকুট এবং মূল। দাঁতের মুকুটের অংশেই রয়েছে দাঁতের বহিঃস্তর, যা এনামেল দিয়ে আবৃত। এই এনামেলই মানবদেহের সবচেয়ে শক্তিশালী ও শক্ত পদার্থ।

এবারে হাড় বা অস্থির কথায় আসা যাক। হাড় মূলত কোষ এবং কিছু প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এর দুটি প্রধান স্তর রয়েছে—করটেক্স ও ক্যান্সেলাস অস্থি। আমরা ছবিতে হাড়ের যে শক্ত ও পুরু খোলস দেখি, সেটাই হলো করটেক্স। করটেক্সের ভেতরটা বেশ স্পঞ্জের মতো নরম ও নমনীয়। এখানে অস্থিমজ্জা তৈরি হয় এবং জমা থাকে। এটাই হলো ক্যান্সেলাস বা স্পঞ্জি অস্থি।

হাড়গুলো মূলত একধরনের গতিশীল কাঠামো, যা প্রতিমুহূর্তে ক্রমাগত নিজেদের পরিবর্তন করে। এদের মধ্যে থাকা রক্তনালি, স্নায়ু এবং অস্টিওব্লাস্ট ও অস্টিওক্লাস্ট নামে সজীব কোষের অবিরাম ক্রিয়া হাড়ের যেকোনো গড়নে খাপ খাওয়াতে কিংবা ফ্র্যাকচার সারাতে সক্ষম। জীবনব্যাপী হাড়গুলো তাদের নিজেদের কোষ প্রতিস্থাপন করতে থাকে। অস্টিওব্লাস্ট নতুন টিস্যু গঠন করে এবং অস্টিওক্লাস্ট পুরোনো টিস্যু ভেঙে নতুন টিস্যুর জন্য জায়গা করে দেয়।

আপনার মনে হতে পারে, কেবল শিশুকালেই হাড় বিকশিত হয়। তবে জেনে রাখা ভালো, প্রায় সব পূর্ণবয়স্ক কঙ্কালতন্ত্রই প্রতি ১০ বছরে একবার নতুন কোষে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়! বলাই বাহুল্য, হাড়কে আবৃত করে রাখা পেরিঅস্টিয়াম নামে আবরণ হাড়ে রক্ত সরবরাহ করে এবং হাড়ের কোনো ক্ষতি হলে তা সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, হাড় একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত টিস্যু। অন্যদিকে দাঁত মৃত টিস্যু না হলেও সম্পূর্ণ জীবন্ত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, হাড় ভেঙে গেলে তারা নিজেদের আবার গঠন করে জোড়া লাগাতে পারে; কিন্তু দাঁত ভাঙলে সেটি আর প্রাকৃতিকভাবে নিজে নিজে জোড়া লাগতে পারে না। এসব কারণেই শক্ত ও সাদা হওয়া সত্ত্বেও দাঁত হাড় নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, বিজ্ঞান বিভাগ, রংপুর জিলা স্কুল, রংপুর।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স; ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক

আরও পড়ুন