দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যে ৫ খাবার থাকা উচিত

কাঠবাদাম ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করেছবি: গেটি ইমেজ

বাজারে আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য হাজারো খাবার রয়েছে। কিন্তু এর ভিড়ে সেরা পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবারটি বেছে নেওয়া বেশ কঠিন। সম্প্রতি গবেষকেরা এক হাজারের বেশি খাবার বিশ্লেষণ করে আমাদের শরীরের জন্য সেরা কিছু খাবারের তালিকা তৈরি করেছেন। আমরা প্রতিদিন মাছ-মাংস ও শর্করা নিয়ে যতটা ভাবি, ছোটখাটো কিছু উপাদানের কথা ততটাই ভুলে যাই। অথচ এই অবহেলিত খাবারগুলোই হতে পারে আপনার দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি। চলুন দেখে নেওয়া যাক, দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় কোন ৫টি খাদ্য উপাদান অবশ্যই থাকা উচিত।

১. কাঠবাদাম

কাঠবাদাম কেবল মগজের ধার বাড়ায় না, এটি ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতেও ওস্তাদ। এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ৭৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে ১২ সপ্তাহ ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের প্রতিদিন ৩২০ ক্যালরি সমপরিমাণ কাঠবাদাম খেতে দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকেরই টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ছিল।

কাঠবাদামে থাকা বিউটারেট আমাদের কোলনের আস্তরণের কোষগুলোকে জ্বালানি দেয়
ছবি: ব্রিটানিকা

১২ সপ্তাহ পর দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত বাদাম খেয়েছেন, তাঁদের শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শুধু তা-ই নয়, বাদাম খাওয়ার ফলে তাঁদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি কমেছে শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহও। বাদামে থাকা বিউটারেট আমাদের কোলনের আস্তরণের কোষগুলোকে জ্বালানি দেয়। এই কোষগুলো অন্ত্রের উপকারী জীবাণুগুলোর বিকাশে এবং অন্ত্রের প্রাচীরকে শক্তিশালী ও সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই প্রতিদিন একমুঠো কাঠবাদাম খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।

আরও পড়ুন
বাদামে থাকা বিউটারেট আমাদের কোলনের আস্তরণের কোষগুলোকে জ্বালানি দেয়। এই কোষগুলো অন্ত্রের প্রাচীরকে শক্তিশালী ও সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২. বিটরুট শাক

আমরা বিটরুট বা বিট খাই ঠিকই, কিন্তু এর পাতাগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিই। অথচ এই পাতাগুলো ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন কে এবং বি গ্রুপের ভিটামিন দিয়ে ভরপুর। এমনকি ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিট পাতার নির্যাস ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। তাই বাজার থেকে বিট কিনলে পাতাগুলো যত্ন করে রেখে দিন; ভাজি বা স্যুপে দারুণ লাগবে!

৩. চিয়া সিড

দেখতে ক্ষুদ্র ও কালো হলেও চিয়া সিড পুষ্টির পাওয়ার হাউস। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, প্রোটিন, আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড এবং ফেনোলিক অ্যাসিড। বিশেষ করে এতে বি-ভিটামিনের উপস্থিতি বেশ বেশি। শুধু তা-ই নয়, এই বীজে থাকা ফাইটোকেমিক্যাল আমাদের হৃৎপিণ্ড ও লিভারকে সুরক্ষা দেয় এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে করে শক্তিশালী।

বিশেষজ্ঞরা চিয়া সিড পিষে বা গুঁড়ো করে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন
ছবি: গেটি ইমেজ

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত চিয়া সিড খেলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত হয়। এমনকি টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু মজার তথ্য হলো, আপনি যদি চিয়া সিড আস্ত গিলে ফেলেন, তবে তা আপনার অন্ত্রের ভেতর দিয়ে পর্যটকের মতো ঘুরে আসবে কিন্তু শরীর এর পুষ্টি শোষণ করতে পারবে না! তাই পুরো সুবিধা পেতে চিয়া সিড পিষে বা গুঁড়ো করে খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তিসি বীজের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে।

আরও পড়ুন
চিয়া সিডের বীজে থাকা ফাইটোকেমিক্যাল আমাদের হৃৎপিণ্ড ও লিভারকে সুরক্ষা দেয় এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে করে শক্তিশালী।

৪. কুমড়োর বীজ

আমরা বেশির ভাগ সময় কুমড়ো খেয়ে বীজগুলো ফেলে দিই। অথচ এই বীজগুলো পুষ্টিগুণে ভরপুর। কুমড়োর বীজে লিনোলিক অ্যাসিড, ওলিক অ্যাসিড এবং পামিটিক অ্যাসিড থাকে। এগুলো হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই বীজ উদ্বেগ কমাতে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

কুমড়ো একটি জনপ্রিয় খাবার, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এর বীজ পুষ্টিতে ভরপুর
ছবি: গেটি ইমেজ

তবে একটা ছোট্ট টিপস, কাঁচা বীজের চেয়ে হালকা ভাজা কুমড়োর বীজ বেশি পুষ্টিকর। কারণ তাপ দিলে এর কোষের দেয়াল ভেঙে যায় এবং পুষ্টিগুলো শরীরের শোষণ করা সহজ হয়।

৫. সুইস চার্ড

আমাদের দেশে এখন সুপারশপগুলোতে সুইস চার্ড নামে একধরনের শাক পাওয়া যায়। এটি নাইট্রেটের দারুণ উৎস। এটা রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং রক্তচাপ কমায়। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে বার্ধক্যজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। তবে এই শাক বেশি সেদ্ধ করবেন না, তাহলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যাবে।

শরীরকে সুস্থ রাখতে দামি ওষুধের চেয়ে সঠিক খাবার নির্বাচন করা বেশি জরুরি। বিট পাতা বা কুমড়োর বীজের মতো ছোটখাটো জিনিসই আপনার শরীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

টীকা:

১. খারাপ কোলেস্টেরল বলতে লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা এলডিএলকে বোঝায়। এটি হলো একধরনের চর্বি, যা রক্তে বেড়ে গেলে ধমনির দেয়ালে জমাট বেঁধে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

আরও পড়ুন