রোদ কি শরীরের বন্ধু নাকি শত্রু

রোদ শরীরের জন্য কতটা উপকারী?ছবি: মেডিকেল নিউজ টুডে

রোদ অনেকের কাছে ভালো আবার অনেকের কাছে খারাপ। যাদের ত্বক একটু ফর্সা বা সংবেদনশীল, তাদের ছোটবেলার রোদে পোড়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হওয়ার কথা নয়। একটু বেশি সময় কড়া রোদে থাকলেই ত্বক লাল হয়ে যায়, চামড়া জ্বালাপোড়া করে। অনেকেই এর জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার করে।

কিন্তু নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়েও সানস্ক্রিন মাখার বিষয়টা হয়তো অনেক মানুষের কাছে একটু অদ্ভুত বা আদিখ্যেতা মনে হতো। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। আগে মানুষ যেখানে রোদে পুড়ে ত্বক বাদামি করার জন্য লোশন বা বেবি অয়েল মাখত, সেখানে এখন বাজার ছেয়ে গেছে অত্যাধুনিক সব সানস্ক্রিনে। প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য এখন নানা ধরনের সানস্ক্রিন পাওয়া যায়। অর্থাৎ, রোদের ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচার জন্য আমরা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য এখন নানা ধরনের সানস্ক্রিন পাওয়া যায়
ছবি: পন্ডস ইন্ডিয়া

কিন্তু সবকিছুরই তো একটা উল্টো দিক থাকে। রোদ থেকে বেঁচে থাকার এই অতিরিক্ত সতর্কতার বিপরীতে একদল মানুষ আবার উল্টো কথাও বলা শুরু করেছেন। খোদ হোয়াইট হাউসের একাংশ থেকেও কিশোর-কিশোরীদের ট্যানিং বেড বা কৃত্রিমভাবে ত্বক বাদামি করার যন্ত্র ব্যবহারের পক্ষে অদ্ভুত সব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞান অবশ্য কোনোভাবেই এই ট্যানিং বেড বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুরক্ষাহীনভাবে রোদে পুড়ে থাকার বিষয়টিকে সমর্থন করে না। তবে, রোদ থেকে ঠিক কতটা দূরে থাকা উচিত, এই প্রশ্নের উত্তরে এমন কিছু সূক্ষ্ম বিষয় লুকিয়ে আছে, যা হয়তো আপনাকে কখনোই পরিষ্কার করে জানানো হয়নি।

আরও পড়ুন
১৯২০ থেকে ১৯৪০-এর দশকের দিকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, সৌরবর্ণালির অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।

ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই লিখেছেন রোয়ান জ্যাকবসেন। তার ইন ডিফেন্স অব সানলাইট: দ্য সারপ্রাইজিং সায়েন্স অব সান এক্সপোজার বইয়ে তিনি রোদের আলো নিয়ে সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণার নানা দিক তুলে ধরেছেন। তবে শুরুতেই একটা ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া ভালো। জ্যাকবসেন কিন্তু কোনো অ্যান্টি-সানস্ক্রিন ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। তিনি এমন কথাও বলছেন না যে, আপনি আজই সব সানস্ক্রিন ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রখর রোদে পুড়ে বসে থাকুন। বরং তিনি রোদ আর আমাদের শরীরের মধ্যকার এক অজানা বন্ধুত্বের গল্প শুনিয়েছেন।

আমাদের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোদ থেকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলার এই যে কঠোর পরামর্শ, তার পেছনে একটা বড় ইতিহাস আছে। প্রায় ১০০ বছর ধরে আমরা শুধু একটাই কথা জেনে এসেছি, রোদের আলো ত্বকে পড়লে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। কিন্তু ১৯২০ থেকে ১৯৪০-এর দশকের দিকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, সৌরবর্ণালির অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ত্বকের ক্যানসারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

রোয়ান জ্যাকবসেনের লেখা বই ইন ডিফেন্স অব সানলাইট: দ্য সারপ্রাইজিং সায়েন্স অব সান এক্সপোজার
ছবি: হার্ভার্ড গেজেট

কিন্তু রোদ থেকে দূরে থাকলে তো শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা দেবে। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান সহজ একটি সমাধান বের করল—ভিটামিন ডি-এর বড়ি! চিকিৎসকেরা ধরে নিলেন, রোদ এড়িয়ে চললেও মানুষ বড়ি খেয়ে সেই ঘাটতি অনায়াসেই পুষিয়ে নিতে পারবে। তাই রোদ পুরোপুরি এড়িয়ে চলার বর্তমান নির্দেশিকাগুলো মূলত এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল যে, রোদের কাজটা তো একটা ছোট্ট পিল দিয়েই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জ্যাকবসেন বলছেন, এই হিসাব-নিকাশটা পুরোটাই ভুল ছিল!

আরও পড়ুন
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন, যেসব মানুষ নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসেন, তাদের নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার কম।

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের আলো আমাদের শরীরে যে জাদুকরী কাজ করে, ভিটামিন ডি-এর বড়ি তার ধারেকাছেও যেতে পারে না। ভিটামিন ডি আসলে রোদের উপকারের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। গত ১০ বছরে এমন কিছু গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের সব ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। বড় বড় পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন, যেসব মানুষ নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসেন, তাদের নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক কম। শুধু তাই নয়, যারা রোদ সবসময় এড়িয়ে চলেন, তাদের চেয়ে পরিমিত রোদ পোহানো মানুষদের আয়ুও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের আলো আমাদের শরীরে যে জাদুকরী কাজ করে, ভিটামিন ডি-এর বড়ি তার ধারেকাছেও যেতে পারে না
ছবি: বাজার ডটএলকে

অর্থাৎ, ব্যাপারটা এমন নয় যে রোদ মানেই ক্যানসার বা রোদ আমাদের চরম শত্রু। বরং আমাদের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই এই সূর্যের আলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য হাজার হাজার বছর ধরে তৈরি হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত রোদ যেমন ত্বকের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি রোদকে পুরোপুরি জীবন থেকে ছেঁটে ফেলাটাও বড় ধরনের বোকামি। তাই বিজ্ঞান এখন রোদকে ভয় পাওয়ার বদলে, এর সঙ্গে একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলারই পরামর্শ দিচ্ছে।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন