মানুষের শরীর কি ৭ বছর পর পর বদলে যায়

মানবদেহপ্রতীকী ছবি

মানুষের শরীর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। পুরোনো ত্বক ঝরে পড়ে, নতুন কোষ তৈরি হয়, আবার মৃত কোষ শরীর থেকে বিদায় নেয়। এই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই অনেকে মনে করেন, মানবদেহ হয়তো প্রতি ৭ বছরে পুরোপুরি নতুন হয়ে যায়। যদিও এই কথার মধ্যে কিছুটা সত্য লুকিয়ে আছে, তবে বিষয়টিকে এতটা সরলীকরণ করে এক বাক্যে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাস্তবতা আসলে এর চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

আমাদের শরীরে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ আছে। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন কোষ নবায়ন হয়, যা শরীরের মোট কোষের প্রায় ১ শতাংশ। পরিপাকতন্ত্রের মতো কিছু অংশের কোষ তো প্রতি সপ্তাহেই বদলে যায়। এই দ্রুত পরিবর্তন দেখে মনে হতেই পারে যে পুরো শরীরই নিয়মিত নতুন হয়ে উঠছে। কিন্তু আসল কথা হলো, শরীরের সব কোষ একই গতিতে বদলায় না।

মানবদেহে পরিপাকতন্ত্রের মতো কিছু অংশের কোষ প্রতি সপ্তাহে বদলে যায়
ছবি: সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি/ পিক্সোলজিকস্টুডিও /ব্র্যান্ড এক্স পিকচার্স /গেটি ইমেজ

২০০০-এর দশকে সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা কোষের বয়স নির্ধারণের জন্য এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে বায়ুমণ্ডলে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার ফলে বাতাসে কার্বন-১৪-এর মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। গাছপালা সেই কার্বন শোষণ করে এবং খাদ্যের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডিএনএর অংশ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
আমাদের শরীরে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ আছে। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন কোষ নবায়ন হয়, যা শরীরের মোট কোষের প্রায় ১ শতাংশ।

কোনো কোষ জন্মের সময় তার ডিএনএতে যে পরিমাণ কার্বন-১৪ থাকে, তা আর বদলায় না। গবেষকেরা এই কার্বনের স্তর মেপেই কোষের বয়স নির্ণয় করেন। গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের শরীরের কোষগুলোর গড় বয়স ৭ থেকে ১০ বছর। তবে এর মানে এই নয় যে পুরো শরীর ওই সময় পর নতুন হয়ে যায়। কারণ প্রতিটি কোষের নবায়নের হার ভিন্ন।

শরীরের বিভিন্ন অংশের কোষ আলাদা আলাদা গতিতে বদলায়। যেমন আমাদের ত্বক বাইরের স্তরে থাকায় তা দ্রুত ক্ষয় হয় এবং মাত্র ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যেই নতুন হয়ে যায়। নারীদের চুল গড়ে ৬ বছরে ও পুরুষদের চুল ৩ বছরে বদলায়। লিভার শরীরের বিষাক্ত উপাদান শোষণ করলেও এর কোষ ১৫০ থেকে ৫০০ দিনের মধ্যে নতুন হয়ে যায়।

অন্ত্রের ক্ষয় বেশি হওয়ায় সেখানকার কোষ বেশি দিন টিকে না
ছবি: মাইবক্সপ্রা /আইস্টক /গেটি ইমেজ

আবার পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্ষয় বেশি হওয়ায় সেখানকার কোষ টেকে মাত্র ৫ দিন। লাল রক্তকণিকা বাঁচে প্রায় ১২০ দিন। হাড়ের সার্বিক নবায়নে সময় লাগে প্রায় ১০ বছর, তবে বয়স বাড়লে এই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে মাংসপেশি ও চর্বি নবায়ন হতে ৭০ বছর পর্যন্ত সময়ও লেগে যেতে পারে!

আরও পড়ুন
নারীদের চুল গড়ে ৬ বছরে ও পুরুষদের চুল ৩ বছরে বদলায়। লিভার শরীরের বিষাক্ত উপাদান শোষণ করলেও এর কোষ ১৫০ থেকে ৫০০ দিনের মধ্যে নতুন হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, শরীর যদি নিয়মিত নতুন কোষ পায়, তবে আমরা বুড়িয়ে যাই কেন? কারণ, কোষ যখন বারবার বিভাজিত হয়, তখন তাদের ডিএনএতে অতি ক্ষুদ্র মিউটেশন জমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মিউটেশনগুলো শরীরের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এটাই ক্রমাগত শরীর বুড়িয়ে যাওয়ার মূল কারণ।এ ছাড়া কয়েক ধরনের কোষ সারা জীবন বদলায় না। যেমন চোখের লেন্স এবং মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সের নিউরন। এই কোষগুলো নবায়ন না হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। ফলে শেষ বয়সে ডিমেনশিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশে কোষ পুনরায় তৈরি হয়
ছবি: ফ্লিন্ট রিহ্যাব

তবে মস্তিষ্কের কিছু ব্যতিক্রমও আছে। মস্তিষ্কের কিছু অংশে কোষ পুনরায় তৈরি হয়। যেমন, অলফ্যাক্টরি বাল্ব এবং হিপোক্যাম্পাস। এই নতুন কোষগুলো শরীরের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

শেষ কথা হলো, কোষ নবায়নের হার ব্যক্তিভেদেও আলাদা হয়। কিছু কোষ আজীবন অপরিবর্তিত থাকে, আবার শরীরের বিভিন্ন অংশের কোষ বিভিন্ন হারে পরিবর্তিত হতে থাকে। সেগুলোর ডিএনএতে জমা হওয়া ত্রুটি আমাদের বয়স বাড়াতে থাকে। তাই শরীর প্রতি সাত বছরে পুরোপুরি নতুন হয়, কথাটির কিছু ভিত্তি থাকলেও এটি পুরোপুরি সত্য নয়। বাস্তবতা হলো শরীর নিয়মিত নতুন হতে থাকে, আবার একই সঙ্গে ধীরে ধীরে বয়সও বাড়ে।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: হাউ স্টাফ ওয়ার্কস

আরও পড়ুন