কতদিন বাঁচবেন তার অর্ধেকটাই লেখা আছে আপনার জিনে
কতদিন বাঁচব? এই প্রশ্নটা মানুষের আদিমতম কৌতূহল। আমরা সাধারণত ভাবি, ভালো খাওয়া-দাওয়া, নিয়ম মেনে চলা এবং ব্যায়াম করলেই হয়তো শত বছরের আয়ু পাওয়া সম্ভব। মানে আমাদের আয়ু নির্ভর করে আমাদের জীবনযাপনের ওপর। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, জীবনের লাগামটা আসলে পুরোপুরি আপনার হাতে নেই। নতুন একটি গবেষণা জানাচ্ছে, একজন মানুষের আয়ুষ্কালের প্রায় ৫০ শতাংশই নির্ভর করে তার জীন বা বংশগতির ওপর।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মানুষের আয়ুর ওপর জিনের প্রভাব খুব সামান্য। কিন্তু গত ২৯ জানুয়ারি জনপ্রিয় বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্স-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
আগের হিসাব বনাম বর্তমান
আগে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হতো, মানুষের আয়ুর মাত্র ৬ থেকে ২৫ শতাংশ জিনের ওপর নির্ভর করে। বাকিটা পরিবেশ, জীবনযাপন ও ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের লেইডেন ইউনিভার্সিটির জেনেটিসিস্ট জোরিস ডিলেন এবং তাঁর দল বলছেন, আগের গবেষণায় কিছু ফাঁক ছিল।
আগে যখন মানুষের আয়ু নিয়ে গবেষণা করা হতো, তখন সব ধরনের মৃত্যুকে এক পাল্লায় মাপা হতো। ধরুন, একজন মানুষের জিনে লেখা আছে তিনি ৯০ বছর বাঁচবেন, কিন্তু ৩০ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় বা কোনো সংক্রামক রোগে মারা গেলেন। আগের গবেষণায় এই অকাল মৃত্যুগুলোকেও জিনের দুর্বলতা বা আয়ুর হিসাবের মধ্যে ধরা হতো। ফলে মনে হতো, জিনের প্রভাব বুঝি কম।
কিন্তু নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেছেন। এই মডেলে তাঁরা দুর্ঘটনা বা যুদ্ধের মতো বাহ্যিক কারণে মৃত্যু এবং হৃদরোগের মতো অভ্যন্তরীণ কারণে মৃত্যু আলাদা করেছেন। বাহ্যিক কারণগুলো বাদ দেওয়ার পর দেখা গেছে, মানুষের আয়ু নির্ধারণে জিনের ভূমিকা প্রায় ৫০ শতাংশ।
আগে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হতো, মানুষের আয়ুর মাত্র ৬ থেকে ২৫ শতাংশ জিনের ওপর নির্ভর করে। বাকিটা পরিবেশ, জীবনযাপন ও ভাগ্যের ব্যাপার।
আসল রহস্য অন্য জায়গায়
মানুষের কোনো বৈশিষ্ট্য জিনের কারণে হচ্ছে নাকি পরিবেশের কারণে, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের প্রিয় হাতিয়ার হলো যমজদের নিয়ে গবেষণা করা। যমজ দুই প্রকার, আইডেন্টিক্যাল ও ফ্ল্যাটারনাল। যাদের ডিএনএ প্রায় ১০০ শতাংশ একরকম, তাদের বলে আইডেন্টিক্যাল; আর যাদের ডিএনএ সাধারণ ভাইবোনের মতো ৫০ শতাংশ মেলে, তাদের বলে ফ্ল্যাটারনাল।
গবেষকরা সুইডেন, ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক হাজার যমজ যুগলের ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের জন্ম ১৮৭০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে। যদি আয়ুষ্কাল জিনের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে আইডেন্টিক্যাল যমজদের মৃত্যুর বয়স প্রায় কাছাকাছি হবে। অন্যদিকে ফ্ল্যাটারনাল যমজদের মৃত্যুর বয়সে পার্থক্য থাকবে বেশি।
গবেষণায় ঠিক তা-ই দেখা গেছে। বাহ্যিক কারণগুলো বাদ দেওয়ার পর দেখা গেছে, আইডেন্টিক্যাল যমজদের আয়ুষ্কাল একে অপরের সঙ্গে মিলে যাওয়ার হার অনেক বেশি। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এসেছেন, দীর্ঘায়ু হওয়ার পেছনে জিনের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ।
যমজ দুই প্রকার, আইডেন্টিক্যাল ও ফ্ল্যাটারনাল। যাদের ডিএনএ প্রায় ১০০ শতাংশ একরকম, তাদের বলে আইডেন্টিক্যাল এবং যাদের ডিএনএ প্রায় ৫০ শতাংশ মেলে, তাদের বলে ফ্ল্যাটারনাল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশা
যুক্তরাজ্যের এক্সিটার ইউনিভার্সিটির জেনেটিসিস্ট লুক পিলিং মনে করেন, এই ফলাফল বার্ধক্যজনিত চিকিৎসার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা শুধু মৃত্যুর বয়স দেখতাম, কারণ খুঁজতাম না। কিন্তু এই গবেষণা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।’
বিশ্বজুড়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এখন যদি আমরা বুঝতে পারি যে ঠিক কোন জিনগুলো মানুষকে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখে, তবে ভবিষ্যতে এমন ওষুধ বা থেরাপি আবিষ্কার করা সম্ভব হবে, যা মানুষকে শুধু বেশিদিন বাঁচাবে না বরং সুস্থভাবে বাঁচাবে। একে বলা হয় হেলথ স্প্যান বা সুস্থ জীবনের মেয়াদ বাড়ানো।
এখন প্রশ্ন হলো, আয়ুর ৫০ শতাংশ যদি জিনের হাতেই থাকে, তবে কি আমাদের আর কিছু করার নেই? যার পরিবারে সবাই কম বয়সে মারা গেছে, তার কি দীর্ঘায়ু পাওয়ার আর কোনো আশা নেই?
গবেষক জোরিস ডিলেনের মতে, উত্তরটা মোটেও তা নয়। ৫০ শতাংশ জিনের হাতে থাকার মানে, বাকি ৫০ শতাংশ এখনো আপনার হাতে! জিন হয়তো আপনাকে দীর্ঘায়ু হওয়ার একটা সম্ভাবনা দেয়, কিন্তু সেটা কাজে লাগাতে হবে আপনাকেই।
যদি আমরা বুঝতে পারি কোন জিনগুলো মানুষকে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখে, তবে ভবিষ্যতে এমন ওষুধ বা থেরাপি আবিষ্কার করা সম্ভব হবে, যা মানুষকে শুধু বেশিদিন বাঁচাবে না বরং সুস্থভাবে বাঁচাবে।
আপনার জিন যতই ভালো হোক, আপনি যদি ধূমপান করেন, অস্বাস্থ্যকর খাবার খান বা বেপরোয়া জীবন যাপন করেন, তবে জিনের সেই সুবিধা আপনি পাবেন না। আবার জিনে ঝুঁকি থাকলেও সঠিক জীবনযাপন আপনাকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ জিন হলো আপনার গাড়ির ইঞ্জিনের মতো। ইঞ্জিন ভালো হলে গাড়ি অনেক দূর যাবে ঠিকই, কিন্তু আপনি গাড়িটা কীভাবে চালাচ্ছেন এবং রাস্তার অবস্থা কেমন, তার ওপরই নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত আপনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না।