গ্রহাণু আঘাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়েছিল ডাইনোসর যুগ, নতুন গবেষণা
৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের কথা। পৃথিবীর বুকে তখন ডাইনোসরদের একচ্ছত্র আধিপত্য। হঠাৎ একদিন মেক্সিকোর বর্তমান ইউকাটান উপদ্বীপে আকাশ থেকে ধেয়ে এল ৬ মাইল চওড়া এক দানবীয় গ্রহাণু। এরপর কী হয়েছিল, তা আমরা সবাই কমবেশি জানি। পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল ডাইনোসরদের নাম। কিন্তু এই বিলুপ্তির আসল গল্পটা ঠিক কেমন ছিল?
বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক চলছে। ডাইনোসররা কি ধীরে ধীরে, তিলে তিলে মারা গিয়েছিল? গ্রহাণুর আঘাতে ধুলোর মেঘে সূর্য ঢেকে গিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী শীত নেমেছিল, তাতে কি তারা অনাহারে ভুগে মারা পড়ে? নাকি আকাশ থেকে ঝরে পড়া ফুটন্ত পাথরের টুকরোর কারণে বিশ্বজুড়ে যে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতেই মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল সব?
জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: বায়োজিওসায়েন্সেস-এ প্রকাশিত নতুন একটি গবেষণা বলছে, দ্বিতীয় আশঙ্কাই হয়তো সত্যি। অর্থাৎ, ডাইনোসরদের মৃত্যু খুব সম্ভবত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটেছিল, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ফ্ল্যাশ-কুকড বা এক নিমিষেই ঝলসে যাওয়ার ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের পারডু ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার অন্যতম লেখক ব্র্যানডন জনসনের মতে, ‘আমরা এমন একটি পরিস্থিতির কথা বলছি, যেখানে গ্রহাণু আঘাত হানার প্রথম এক বা দুই ঘণ্টার মধ্যেই হয়তো পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণীর মৃত্যু হয়েছিল।’
গ্রহাণুর আঘাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি মেট্রিক টন ধ্বংসাবশেষ বায়ুমণ্ডলে ছিটকে ওঠে। এরপর সেগুলো জ্বলন্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পৃথিবীতে ফিরে আসতে থাকে, যার নাম দেওয়া হয়েছে স্ফিয়ারুল।
প্রলয়ংকরী সেই আঘাত
গ্রহাণুটি যখন পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তখন তার গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ১২ মাইল! এর আঘাতের শক্তি ছিল ১০০ টেরাটন টিএনটির সমান, যা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও ১০০ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী। এই এক আঘাতেই তৈরি হয়েছিল ৬২ মাইল চওড়া এবং ১৯ মাইল গভীর এক বিশাল গর্ত। এর প্রভাবে ২ মাইল উঁচু সুনামির ঢেউ এবং ঘণ্টায় ৬২০ মাইল বেগে প্রলয়ংকরী ঝড় আছড়ে পড়েছিল চারদিকে।
গ্রহাণুর আঘাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি মেট্রিক টন ধ্বংসাবশেষ বায়ুমণ্ডলে ছিটকে ওঠে। এরপর সেগুলো জ্বলন্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পৃথিবীতে ফিরে আসতে থাকে, যার নাম দেওয়া হয়েছে স্ফিয়ারুল। এগুলো যেখানেই পড়েছে, সেখানেই বনাঞ্চলে আগুন ধরে গেছে।
গ্রহাণুর এক আঘাতেই তৈরি হয়েছিল ৬২ মাইল চওড়া এবং ১৯ মাইল গভীর এক গর্ত। এর প্রভাবে ২ মাইল উঁচু সুনামির ঢেউ এবং ঘণ্টায় ৬২০ মাইল বেগে প্রলয়ংকরী ঝড় আছড়ে পড়েছিল চারদিকে।
আকাশে ভাসমান পাথরের বাষ্প
শুধু পাথর নয়, আঘাতের প্রচণ্ড তাপে বিপুল পরিমাণ পাথর একেবারে বাষ্পে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে উঠে যায়। ২০২৩ সালে বিজ্ঞানীরা উত্তর আমেরিকায় একধরনের মিহি ধুলোর স্তর খুঁজে পান, যা মূলত ওই পাথরের বাষ্প থেকেই তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
ব্র্যানডন জনসন ও তাঁর দল এই পাথরের বাষ্প নিয়েই একটি কম্পিউটার সিমুলেশন তৈরি করেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর তথ্য। আকাশে ছড়িয়ে পড়া এই পাথরের বাষ্প একধরনের পুরু কম্বলের মতো কাজ করেছিল। এই ‘কম্বল’ পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রাকে সাধারণ ধ্বংসাবশেষের চেয়ে অন্তত সাড়ে তিন গুণ বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই প্রচণ্ড তাপ মুহূর্তের মধ্যে বিপুলসংখ্যক প্রাণীকে ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এমনকি এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আপনাআপনিই দাবানল জ্বলে ওঠে।
২০২৩ সালে বিজ্ঞানীরা উত্তর আমেরিকায় একধরনের মিহি ধুলোর স্তর খুঁজে পান, যা মূলত ওই পাথরের বাষ্প থেকেই তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
থার্মোফ্লাস্কের অদ্ভুত প্রভাব
মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীদের এই নতুন গবেষণা কিন্তু ডাইনোসরদের ধীরে ধীরে অনাহারে মারা যাওয়ার পুরোনো তত্ত্বটিকে একেবারে বাতিল করে দিচ্ছে না। ব্র্যানডন জনসনের মতে, ঘটনাটি কিছুটা থার্মোফ্লাস্কের মতো কাজ করেছিল। অর্থাৎ পৃথিবির তরল দীর্ঘক্ষণ প্রচণ্ড গরম বা কনকনে ঠান্ডা অবস্থায় ছিল।
প্রথমে আকাশ থেকে পড়া জ্বলন্ত পাথর ও বাষ্পের কারণে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড তাপে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণীরা মারা যায়। এরপর সেই আগুন যখন নিভে আসে, তখন আকাশে ভাসমান ওই ধুলোর মেঘই বছরের পর বছর, বা হয়তো দশকের পর দশক সূর্যের আলোকে আটকে রাখে। ফলে পৃথিবীতে নেমে আসে এক হিমশীতল অন্ধকার।
অবশ্য এই তত্ত্বকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীদের আরও কিছু তথ্যের প্রয়োজন। কারণ, ডাইনোসর আমলের দাবানলের বেশির ভাগ প্রমাণ এখনো শুধু উত্তর আমেরিকাতেই পাওয়া গেছে। গ্রহাণু পড়ার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক দূরের এলাকাগুলোতে দাবানলের বড় কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জীবাশ্মবিদ আলেসান্দ্রো চিয়ারেঞ্জা মনে করেন, হয়তো ভবিষ্যতে আমরা পুরো বিশ্বজুড়ে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণও পেয়ে যাব, যা এখনো আমাদের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে।
তবে মৃত্যুর ধরন যেমনই হোক না কেন, ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের সেই গ্রহাণুর আঘাত যে ডাইনোসরদের চূড়ান্ত সমাপ্তি ডেকে এনেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই!