মৌমাছি হুল ফোটালে এত ব্যথা লাগে কেন
বিকেলে বাগানে একটু হাঁটতে বেরিয়েছেন। হয়তো একটা ফুলের গন্ধ নিতে গেলেন, আর হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠলেন! মনে হলো যেন শরীরে আগুন লেগে গেল! হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ছোট্ট একটা মৌমাছি আপনাকে হুল ফুটিয়ে পালাচ্ছে। হাতের অবস্থা খারাপ। চামড়া লাল হয়ে ফুলে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতেই মাথায় একটা প্রশ্ন আসে—এতটুকু একটা পোকার সরু হুলে এত ব্যথা কেন? মশাও তো হুল ফোটায়, কই এত ব্যথা তো লাগে না!
মৌমাছি বা বোলতার হুল কী
প্রথমেই বলে রাখি, মৌমাছি বা বোলতার হুল কিন্তু সাধারণ কোনো আলপিন নয়। এটাকে আপনি একটি উন্নত মানের হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ ভাবতে পারেন। ডাক্তারের সুঁই মসৃণ হলেও মৌমাছির হুল করাত বা বড়শির মতো খাঁজকাটা। যখনই মৌমাছি হুল ফোটায়, তখন সেটা চামড়ার গভীরে ঢুকে যায়। হুল খাঁজকাটা হওয়ার কারণে মৌমাছি তা সহজে আমাদের শরীর থেকে বের করতে পারে না।
পড়িমরি করে মৌমাছিটা যখন পালানোর চেষ্টা করে, তখন হুলসহ শরীরের পেছনের অংশের বিষের থলিটা ছিঁড়ে আপনার শরীরেই থেকে যায়। বেচারা মৌমাছি মারা যায়, কিন্তু যাওয়ার আগে আপনার শরীরে মরণকামড় বসিয়ে দিয়ে যায়।
তবে বোলতা বা বল্লা আরও ধুরন্ধর। ওদের হুল হয় একদম মসৃণ। তাই বোলতারা হুল ফুটিয়ে সেটা বের করে নিতে পারে এবং ইচ্ছেমতো বারবার হুল ফোটাতে পারে।
যখনই মৌমাছি হুল ফোটায়, তখন সেটা চামড়ার গভীরে ঢুকে যায়। হুল খাঁজকাটা হওয়ার কারণে মৌমাছি তা সহজে আমাদের শরীর থেকে বের করতে পারে না।
এত ব্যথা লাগে কেন
মৌমাছি হুল ফোটানোর সময় শুধু চামড়া ফুটো করে না, সঙ্গে সঙ্গে পাম্প করে এক ফোঁটা বিষ ঢুকিয়ে দেয়। এই বিষ হলো জটিল রাসায়নিক মিশ্রণ। বিজ্ঞানীরা একে বলেন বিষাক্ত ককটেল। ব্যথা পাওয়ার আসল কারণ এই রাসায়নিকগুলো। মৌমাছির বিষের প্রধান উপাদান হলো মেলিটিন। এই শক্তিশালী প্রোটিন আমাদের দেহের কোষের পর্দা ভেঙে ফেলে। যখনই কোষগুলো ভেঙে যায়, আমাদের মস্তিষ্ক বুঝতে পারে শরীরে বড় কোনো ক্ষতি হচ্ছে। মস্তিষ্ক তখন ব্যথার তীব্র সিগন্যাল পাঠায়। মনে হয় যেন ওই জায়গাটা পুড়ে যাচ্ছে।
এর পরেই আসে হিস্টামিনের পালা। ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা যে ফুলে লাল হয়ে যায় এবং চুলকায়, তার জন্য দায়ী এই রাসায়নিক। বিষ শরীরে ঢুকলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সতর্ক হয়ে যায় এবং হিস্টামিন নিঃসরণ করে। এটি রক্তনালিগুলোকে প্রসারিত করে দেয়। ফলে জায়গাটা ফুলে যায়। এ ছাড়া বিষে থাকে ফসফোলাইপেজ এ-২। এটি কোষের ক্ষতি করে এবং ব্যথার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দেয়। আর সবশেষে কাজ করে হায়ালুরোনিডেস। একে বলে অনুঘটক। এই এনজাইমটি আপনার কোষের ভেতরের তরলকে পাতলা করে দেয়। ফলে বিষ খুব দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিষ শরীরে ঢুকলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সতর্ক হয়ে যায় এবং হিস্টামিন নিঃসরণ করে। এটি রক্তনালিগুলোকে প্রসারিত করে দেয়। ফলে জায়গাটা ফুলে যায়।
ব্যাথা মাপার স্কেল
ব্যথা নিয়ে কথা হবে আর বিজ্ঞানী জাস্টিন শ্মিডটের কথা আসবে না, তা কি হয়? যুক্তরাষ্ট্রের এই পতঙ্গবিজ্ঞানী নিজের শরীরে প্রায় ১৫০ রকম পোকার কামড় খেয়েছেন শুধু এটা দেখার জন্য যে, কোনটার কামড়ে কত ব্যথা! তিনি একটি স্কেল তৈরি করেছেন, যার নাম ‘শ্মিডট স্টিং পেইন ইনডেক্স’। এই স্কেলে মৌমাছির হুল ফোটানোর ব্যথাকে তিনি ২.০ পয়েন্ট দিয়েছেন (সর্বোচ্চ ৪.০)। তিনি এই ব্যথার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘মনে হবে যেন একটা জ্বলন্ত দিয়াশলাই কাঠি আপনার চামড়ার ওপর ধরে রাখা হয়েছে। আর বোলতার কামড়ে আরেকটু বেশি ব্যথা।’
আসল ব্যাপার হলো, এই বিষ আমাদের স্নায়ুগুলোকে ধোঁকা দেয়। বিষের রাসায়নিকগুলো স্নায়ুকোষকে এমনভাবে উত্তেজিত করে যে, স্নায়ুগুলো মস্তিষ্ককে ভুল তথ্য পাঠায়। যেমন, মৌমাছি হুল ফোটালে মস্তিষ্ক সংকেত পায়, এখানে অনেক বেশি গরম, যেন পুড়ে যাচ্ছে! অথচ সেখানে কোনো আগুন নেই। এই ফলস অ্যালার্মের কারণেই আমরা ওই তীব্র জ্বালাপোড়া অনুভব করি।
তবে মনে রাখবেন, মৌমাছিরা কিন্তু ইচ্ছে করে আমাদের কামড়াতে আসে না। ভয় পেলে বা আত্মরক্ষার জন্যই তারা এই চরম পথ বেছে নেয়। তাই মৌমাছির কামড়ে অনেক ব্যথা বলে ওদের মেরে ফেললে চলবে না। ওরাও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই মৌমাছি বা বোলতা দেখলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ!