শুঁয়োপোকার জন্ম রহস্য

প্রজাপতিছবি: রয়টার্স

শুঁয়োপোকা জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহ শুধু রাক্ষসের মতো খায় আর খায়। পেট পুরে খাওয়ার পর একদিন সে কোনো গাছের পাতা বা ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে পড়ে। নিজের শরীর থেকে খোলস ছেড়ে নিজেকে বন্দি করে ফেলে গুটির ভেতর। এর ভেতরেই ঘটে যায় এক আশ্চর্য ভাঙা-গড়ার খেলা।

বাইরে থেকে সব শান্ত মনে হলেও ভেতরে তখন চলছে মহাপ্রলয়। এনজাইমের প্রভাবে শুঁয়োপোকার শরীর গলে স্যুপের মতো তরল হয়ে যায়। সেখান থেকে ইমাজিনাল ডিস্ক নামে বিশেষ কোষগুলো জেগে ওঠে এবং নতুন করে প্রজাপতির ডানা, পা ও অ্যান্টেনা তৈরি করতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ পর সেই গুটি ফেটে বেরিয়ে আসে রঙিন এক প্রজাপতি। প্রকৃতির এই ঘটনাকে বলে মেটামরফোসিস বা রূপান্তর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকৃতির এই অদ্ভুত জীবনচক্র শুরু হলো কীভাবে?

শুঁয়োপোকার মেটামরফোসিস
ছবি: মাইকেল মুতিঙ্গি / রিসার্চ গেট

এর উত্তর খুঁজতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ৪৮ কোটি বছর আগে অর্ডোভিসিয়ান যুগ। তখন পৃথিবীতে ছিল আদিম সব পোকা। ফসিল বা জীবাশ্ম বলছে, এই পোকাদের জীবনে বড় কোনো রূপান্তর ঘটত না। ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চাগুলো দেখতে হুবহু বড়দের মতোই হতো, শুধু আকারে ছোট। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা কেবল খোলস বদলাত। আমাদের ঘরের পুরনো বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা সিলভার ফিশ পোকারা আজও এই আদিম নিয়ম মেনে চলে। বই বা কাপড়ের আলমারিতে এই পোকা দেখা যায়।

আরও পড়ুন
এনজাইমের প্রভাবে শুঁয়োপোকার শরীর গলে স্যুপের মতো তরল হয়ে যায়। সেখান থেকে ইমাজিনাল ডিস্ক নামে বিশেষ কোষগুলো জেগে ওঠে এবং নতুন করে প্রজাপতির ডানা, পা ও অ্যান্টেনা তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী জেমস ট্রুম্যান বলছেন, ‘প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে কিছু জিনের মিউটেশনের ফলে পোকাদের জীবনে এল এক নতুন অধ্যায়, অসম্পূর্ণ রূপান্তর। এই পোকাগুলো ডিম ফুটে বের হওয়ার সময় হুবহু বড়দের মতো দেখতে হতো না। এদের বলা হয় নিম্ফ।’

নিম্ফদের পিঠের ওপর ছোট ছোট ডানার কুঁড়ি থাকত। প্রতিবার খোলস বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ডানাগুলো একটু একটু করে বড় হতো। আর শেষবার খোলস ছাড়ার পর বেরিয়ে আসত পূর্ণাঙ্গ ডানা। এই ডানাই ছিল পোকাদের জন্য এক বিশাল পরিবর্তন। কারণ ডিম ফুটে সরাসরি ডানা নিয়ে বের হওয়া বেশ কঠিন। ফড়িং বা তেলাপোকা আজও এই নিয়ম মেনে বড় হয়।

দুটি নিম্ফের পাশে একটি প্রাপ্তবয়স্ক পঙ্গপাল
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

আরও প্রায় ৫ কোটি বছর পর আরেকবার জিনের খেলা শুরু হলো। কার্বনিফেরাস যুগে আবির্ভাব হলো সম্পূর্ণ রূপান্তরের। এবার ডিম ফুটে নিম্ফ নয়, বের হলো লার্ভা বা শুঁয়োপোকার মতো অদ্ভুত এক প্রাণী। লার্ভার সঙ্গে তার বাবা-মার চেহারার কোনো মিলই নেই। ল্যাটিন শব্দ লার্ভা মানে মুখোশ। অর্থাৎ লার্ভা অবস্থায় পোকাটি তার ভবিষ্যৎ রূপ লুকিয়ে রাখে। এই প্রক্রিয়ায় পোকাদের জীবনে চারটি ধাপ তৈরি হলো—ডিম, লার্ভা, পিউপা এবং পূর্ণাঙ্গ পোকা।

বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৫৫ লাখ প্রজাতির পোকা আছে, যার ৮০ শতাংশই এই সম্পূর্ণ রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু কেন এই জটিল প্রক্রিয়া এত সফল হলো? অসম্পূর্ণ রূপান্তরের মাধ্যমেই পোকারা প্রথম ওড়ার ক্ষমতা পায়। মেরুদণ্ডী প্রাণীদেরও বহু আগে পোকারা উড়তে শিখেছিল। প্রায় ১০ কোটি বছর ধরে এরা আকাশে রাজত্ব করেছে।

আরও পড়ুন
কার্বনিফেরাস যুগে আবির্ভাব হলো সম্পূর্ণ রূপান্তরের। এবার ডিম ফুটে নিম্ফ নয়, বের হলো লার্ভা বা শুঁয়োপোকার মতো অদ্ভুত এক প্রাণী। লার্ভার সঙ্গে তার বাবা-মার চেহারার কোনো মিলই নেই।

সম্পূর্ণ রূপান্তরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বাচ্চা ও বড়দের কাজ আলাদা। লার্ভাদের কাজ শুধুই খাওয়া আর বড় হওয়া। বড়দের কাজ সঙ্গী খোঁজা এবং বংশবৃদ্ধি করা। লুনা মথের তো মুখই থাকে না! তারা জীবনে আর খায় না, শুধু প্রজননের জন্য বাঁচে। লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ পোকা ভিন্ন খাবার খায়। লার্ভা হয়তো পচা পাতা বা ছোট পোকা খাচ্ছে, কিন্তু বড় হয়ে সে খাচ্ছে ফুলের মধু। ফলে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে খাবারের জন্য মারামারি করতে হয় না। এতে সবার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

কিন্তু এই প্রক্রিয়া ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক আছে। স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষক জেভিয়ার বেলেস রোস মনে করেন, নিম্ফ দশাটি ভেঙেই লার্ভা ও পিউপা দশার জন্ম হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী ট্রুম্যান ও তাঁর দল মনে করেন, লার্ভা দশাটি এসেছে প্রোনিম্ফ নামে এক ভ্রূণ দশা থেকে।

হারকিউলিস বিটলের লার্ভা (বামে) এবং প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায় (ডানে)
ছবি: কিত্তিকর্নফংওক / এম ডি আল-আমিন / গেটি ইমেজ

সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্রড-কমপ্লেক্স বা Br-C নামে একটি জিনের ভূমিকা পাওয়া গেছে। এই জিনটিই লার্ভা এবং পিউপা দশা নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই জিনটি সক্রিয় থাকলে পোকার লার্ভা দশা বজায় থাকে। অর্থাৎ এই জিনটিই ঠিক করে দেয়, পোকাকে কখন গুটি বাঁধতে হবে এবং কখন ডানা মেলতে হবে।

বেলেস রোস গত ৩০ বছর ধরে এই নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র কয়েকটি রহস্যের জট খুলতে পেরেছি। বাকিটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য তোলা রইল।’

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন