অ্যান্টম্যান মার্ভেল ইউনিভার্সের এক সুপারহিরোর নাম। অনেক সুপারহিরোর ভিড়ে আলাদা করে তাকে চোখে না–ও পড়তে পারে। বিশেষত ইনফিনিটি ওয়ারে যখন তার কোনো পাত্তাই মেলেনি! যা-ই হোক, অ্যান্টম্যান নিজের আয়তন যেমন ইচ্ছামতো কমাতে বা বাড়াতে পারে, তেমনি পারে পিঁপড়াদের বিরাট একটা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে। অ্যান্টম্যানের আয়তন বাড়ানো-কমানোর অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেখে পদার্থবিদেরা নাক সিটকালেও, পিঁপড়াদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা কিন্তু হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো না। পিঁপড়ারা দলবদ্ধভাবে অবিশ্বাস্য সব কাজ করে ফেলে। পিঁপড়া একা না। প্রকৃতিতে পোকামাকড়ের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি এবং ইকোসিস্টেমে তাদের প্রভাব প্রচণ্ড। পোকামাকড়কে ব্যবহার করে কোনো কিছু করা গেলে তা অনেক সফলই হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারিও তা জানে।
ডারপা (DARPA—Defense Advanced Research Projects Agency) যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটা সংস্থা, যাদের কাজ হলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ব্রেকথ্রু প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা। সহজ কথায়, ডারপা এমন সব গবেষণা ফান্ড করে যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই গবেষণাগুলোর অনেকগুলোর মধ্যেই সাইফাই একটা ভাব থাকে। উচ্চাভিলাষী এই প্রজেক্টগুলোর বেশির ভাগই সফলতার মুখ দেখে না। কিন্তু যেগুলো দেখে, সেগুলো প্রায়ই বদলে দেয় পুরো দুনিয়াকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইন্টারনেটের কথা। এটা ডারপার এক প্রজেক্টেরই আবিষ্কার।
পোকা যখন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার
ডারপা ২০১৬ সালের নভেম্বরে ইনসেক্ট অ্যালাইস নামের একটি প্রকল্পে ২৭ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। পোকাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে ২২৫ কোটি টাকা? অবাক করা ব্যাপার, তাই না? আসলে বন্ধুত্ব পাতানো এখানে মুখ্য বিষয় না। তিন প্রজাতির পোকা লিফহপার, হোয়াইটফ্লাই এবং এফিডকে ব্যবহার করে ভুট্টা ও টমেটোকে জেনেটিক্যালি মডিফাইড করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে এই প্রকল্পে।
এখন একটু কারিগরি কথা বলতে হবে। জিন প্রকৌশল করার একটি জনপ্রিয় উপায় হচ্ছে ভাইরাসকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জিন ঢুকিয়ে দেওয়া কোষের মধ্যে। এই বিশেষ ভাইরাসগুলোকে বলা হয় ইঞ্জিনিয়ারড ভাইরাল ভেক্টর। ভাইরাসের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তারা তাদের আক্রান্ত কোষগুলোর জিনোমে নিজের জিনোমটা ঢুকিয়ে দিতে পারে। ভাইরাসকে বলতে পারেন প্রাকৃতিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার।
ডারপা ২০১৬ সালের নভেম্বরে ইনসেক্ট অ্যালাইস নামের একটি প্রকল্পে ২৭ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। পোকাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে ২২৫ কোটি টাকা? অবাক করা ব্যাপার, তাই না?
ডারপার প্রজেক্টের পোকাগুলো ফসলের খেতে বসবাস করে। এদের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই সাধারণত অনেক রকমের ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে ভুট্টাখেতে। ভাইরাসরা সাধারণত পোকাগুলোর ক্ষতি করে না, অনেক সময় ফসলেরও তেমন ক্ষতি করে না। রোগ তৈরি করে এমন ভাইরাসও আছে, তবে সংখ্যা অনেক কম। প্রকৃতির বেশির ভাগ ভাইরাসই নেহাত নিরীহভাবে বংশবৃদ্ধি করে ও জীবনধারণ করে।
প্রকল্পটি সফল করতে হলে এমন ভাইরাল ভেক্টর বানাতে হবে যারা এই পোকাগুলোর মাধ্যমে ভুট্টা ও টমেটোগাছে ছড়াতে পারে। আর ভাইরাল ভেক্টরগুলোকে গাছগুলোর জিনোমে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে হবে। আমরা আমাদের পছন্দমতো জিন তাহলে এই পোকা ও ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারবে ফসলগুলোর মধ্যে।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার এখানেই। সাধারণত জিন প্রকৌশলের কাজ করা হয় ল্যাবরেটরিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে। ভাইরাল ভেক্টর প্রবেশ করানোর কাজ করে থাকে কোনো মানুষ। তাই জেনেটিক্যালি মডিফাইড উদ্ভিদ বিপুল সংখ্যায় তৈরি করতে লাগে যথেষ্ট সময় ও পরিশ্রম। ধরুন, যুক্তরাষ্ট্রের সব জায়গায় তাপমাত্রা বেড়ে গেল, প্রাকৃতিক কোনো ভুট্টার জাত টিকতে পারছে না আর। শুধু জেনেটিক্যালি মডিফাইড ভুট্টা টিকছে। বর্তমান প্রযুক্তিতে মার্কিন চাষিদের তখন নতুন করে এই জিএম জাতের ভুট্টার বীজ কিনতে ও চাষ করতে হবে।
কিন্তু ইনসেক্ট অ্যালাইস প্রজেক্ট সফল হলে ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। তখন মার্কিন সরকার তাপসহিষ্ণু জিন আছে এমন একটা ভাইরাল ভেক্টর তৈরি করবে। এরপর এই বিশেষ ভাইরাল ভেক্টর বহনকারী পোকাদের বিভিন্ন জায়গায় ছেড়ে দিলেই হলো। তারা আপনাআপনিই চারপাশের সব ভুট্টাগাছে তাপসহিষ্ণু জিন প্রবেশ করিয়ে দেবে। ফলে ভুট্টাচাষিরা ফলনজনিত কোনো ক্ষতির মুখোমুখি হবেন না। আর এই জেনেটিক পরিবর্তনটাও এমনভাবে করা হবে যে পরের প্রজন্মে তা যাবে না। সুতরাং চাষিরা সাধারণত যে জাত চাষ করেন, সেই জাতেরই বীজ পাবে পরের মৌসুমে।
এই প্রযুক্তি হাতে থাকলে খরা, বন্যা, অতিরিক্ত শীতল বা উষ্ম আবহাওয়ায়ও দেশব্যাপী ফসলের ফলন মার খাবে না। এটা হবে খাদ্যনিরাপত্তায় বিরাট এক অগ্রগতি। খাদ্যনিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডারপার ভাষ্যমতে, তারা এই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই প্রজেক্টটি ফান্ড করেছে।
দুমুখী তলোয়ার
এ পর্যন্ত তো প্রকল্পটাকে বেশ ভালোই লাগল। হঠাৎ কোনো মহামারি, খরা, বন্যা ইত্যাদি থেকে ফসল উৎপাদনকে রক্ষা করা তো বেশ মহৎ একটা উদ্দেশ্য। সমস্যা তাহলে কোথায়?
সমস্যা হলো আসলে ডারপার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হওয়া এক কোন্দলে। যেকোনো শক্তিশালী প্রযুক্তি ভালো ও মন্দ উভয় কাজে ব্যবহার করা যায়। এই প্রকল্পটা ডারপা এত দিন অনেকটা পর্দার আড়ালে রেখেছিল। ২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর সায়েন্স জার্নালে এ নিয়ে একটা গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত না হলে এটা হয়তো পর্দার আড়ালেই থাকত। এ প্রবন্ধটি লিখেছেন কয়েকজন বিজ্ঞানী ও আইনজীবী। তাঁদের প্রধান উদ্বেগ এই প্রকল্পটির বায়োওয়েপন হিসেবে সম্ভাব্য ব্যবহার ও এই মুহূর্তে প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে আছে, তা ঘিরে ধোঁয়াশা।
তাঁরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত কৃষিব্যবস্থার দেশে যেখানে কীটনাশক পর্যন্ত ছড়ানো হয় ড্রোন থেকে স্প্রের মাধ্যমে, সেখানে পোকা ব্যবহার করা অত্যাবশ্যক ছিল না। ভাইরাল ভেক্টর আলাদাভাবে তৈরি করে তা ফসলের খেতের ওপর স্প্রে করেই এই কাজটা করা যেত। পোকা ব্যবহার করা যুক্তিসংগত হয় যদি এই প্রযুক্তিটি অন্য কোনো দেশে প্রয়োগ করা হয়। অন্য দেশে কেন ব্যবহার করা হতে পারে? এ প্রযুক্তি সফল হলে শত্রুদেশের ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া যাবে এ পোকার সাহায্যে ক্ষতিকর জিন ছড়িয়ে। তারা আরও চিন্তিত ইকোসিস্টেমে প্রযুক্তিটির প্রভাব নিয়ে। একবার এই ভাইরাল ভেক্টর বহনকারী পোকা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে কে জানে তার কী হবে! এটা যদি মিউটেশনের মাধ্যমে ভয়াবহ কোনো রোগ ছড়ানোর বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, ইকোসিস্টেমে কোনো পরিবর্তন এনে ফেলে বা অন্য কোনো বিপর্যয় ডেকে আনে তাকে তো আর সামলানো যাবে না। আর অন্য কোনো দেশে প্রয়োগ করলেও ভাইরাস তো আর কোনো দেশের সীমানা বোঝে না।
জবাবে প্রকল্পটির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ব্লেক বেক্সটিন দাবি করেছেন এটি সম্পূর্ণরূপে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে আত্মরক্ষার জন্য পরিচালিত একটি প্রকল্প। এটি খুবই নিরাপদভাবে কড়াভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রকৃতিতে যেন এটা ছড়িয়ে না যায়, এমন অনেক ফেইলসেফ ডিজাইন করা হয়েছে। আর জরুরি মুহূর্তে ড্রোন বা প্লেন ব্যবহার করে দেশজুড়ে স্প্রে করার মতো অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রে নেই বলেন তিনি। একই সঙ্গে, কোনো অপশক্তি যদি আমেরিকার কৃষিব্যবস্থাকে বিপদে ফেলতে উদ্যোগ নেয়, তা থেকে রক্ষার জন্য খুবই কাজে আসবে ইনসেক্ট অ্যালাইস প্রোগ্রাম।
হয়তো আগে থেকেই কিছু দেশ আড়ালে এই ধরনের বায়োওয়েপন তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিল এবং সে খবর পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রোগ্রাম চালু করেছে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত, অন্য পরাশক্তিগুলো এত দিন এই রকম কিছু না করে থাকলে, এতক্ষণে তারা উঠেপড়ে লেগেছে এর পেছনে। পর্দার আড়ালে থেকে এই প্রতিযোগিতাটা এখন জনসমক্ষে বের হয়ে পড়েছে। আড়ালে আরও কত চমক আছে, কে জানে!