অন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর নতুন গবেষণা

আহমেদ আয়েদুর রহমানছবি: আব্দুর রাজ্জাক সরকার

আমাদের পাকস্থলী ও অন্ত্রের ভেতর কোটি কোটি স্নায়ুকোষের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় এন্টারিক নার্ভাস সিস্টেম। বিজ্ঞানীরা একে মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্কও বলেন। এই জটিল স্নায়ুতন্ত্র আমাদের পরিপাকতন্ত্রের চলাচল, খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে জন্মগত কারণে বা অন্য কোনো সমস্যায় এই স্নায়ুতন্ত্র ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে মারাত্মক সব রোগ দেখা দেয়। বিশেষ করে হির্শস্প্রুং নামে রোগে শিশুদের অন্ত্রের স্নায়ু অকেজো হয়ে যায়। এর একমাত্র চিকিৎসা এখন পর্যন্ত শুধু অপারেশন। এই অপারেশনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলা হয়। কিন্তু এতে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হন না। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা থেকেই যায়।

এই সমস্যার এক অভিনব সমাধান খুঁজে পেয়েছেন যুক্তরাষ্টের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশি বিজ্ঞানী আহমেদ আয়েদুর রহমান। তাঁর নতুন গবেষণা অটোলোগাস এন্টারিক নিউরাল স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্ত্রের স্বাভাবিক গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। প্রচলিত অস্ত্রোপচারনির্ভর চিকিৎসার বাইরে একটি জৈবিক সমাধানের ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ডিন জর্জ ডেলির কাছ থেকে এলিনর অ্যান্ড মাইলস শোর ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ডস নিচ্ছেন আহমেদ আয়েদুর রহমান। সঙ্গে স্ত্রী ইশরাত শহীদ এবং দুই সন্তান আদিয়ান ও আফফান
ছবি: সংগৃহীত

আহমেদ আয়েদুর রহমান অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্ত্রের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের একটি অভিনব পদ্ধতিও দেখিয়েছেন। সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কোলিনার্জিক নিউরনকে নীল আলো দিয়ে উদ্দীপিত করলে কোলাইটিসের প্রদাহ কমে। এটি ওষুধনির্ভর চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ভবিষ্যতে বায়োইলেকট্রনিক থেরাপির পথ তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশি বিজ্ঞানী আহমেদ আয়েদুর রহমান তাঁর নতুন গবেষণা অটোলোগাস এন্টারিক নিউরাল স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখিয়েছেন।

এ বিষয়ে আহমেদ আয়েদুর রহমান জানান, ‘বিশ্বজুড়ে অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নত চিকিৎসা এখনও সীমিত। তাই এই গবেষণাগুলো যদি ভবিষ্যতে ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে সফল হয়, তবে তা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।’

আহমেদ আয়েদুর রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনায়। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজে উৎসাহ দিতেন। একাডেমিক ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতার কারণে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০২৪ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী ড. গ্যারি রুভকুনের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করেন বিজ্ঞানী আহমেদ আয়েদুর রহমান
ছবি: সংগৃহীত

পিএইচডি শেষ করার পর ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সিডনির ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেছেন। এরপর ২০২০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে গবেষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সহকারী অধ্যাপক। তাঁর গবেষণাপত্রগুলো ন্যাচার কমিউনিকেশনস, নিউরন এবং জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

সেল থেরাপির পাশাপাশি আহমেদ আয়েদুর রহমানের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জিনগত কারণে তৈরি পেশির রোগ নিয়ে কাজ করা। সম্প্রতি তিনি এমএসএমডিএস নামে একটি বিরল জিনগত রোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেছেন। এই রোগটি মূলত একটি নির্দিষ্ট জিনের ত্রুটির কারণে হয়।

আরও পড়ুন
আহমেদ আয়েদুর রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনায়। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন।

আহমেদ আয়েদুর রহমান জানান, ‘এই জিনগত পরিবর্তন মানুষের অন্ত্রের গঠন ও কাজ করার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাঁর এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে প্রিসিশন মেডিসিন বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা তৈরির পথ তৈরি করেছে। যেহেতু এই রোগের সুনির্দিষ্ট জিনগত কারণ এখন জানা গেছে, তাই ভবিষ্যতে জিন থেরাপির মাধ্যমে সরাসরি এই জিনের ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব হতে পারে।’

যদিও এই গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর বৈজ্ঞানিক সাফল্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

আহমেদ আয়েদুর রহমান আরও জানান, ‘হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে গবেষণার পরিবেশ খুবই উন্নত। এখানে ল্যাবরেটরির মৌলিক গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও রোগীদের সরাসরি চিকিৎসা সেবা সবই একসঙ্গে যুক্ত। ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে বিরল জিনগত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ল্যাবে কোনো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হলে সেটি দ্রুত রোগীদের ওপর পরীক্ষা করার সুযোগ থাকে। তাদের লক্ষ্য কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশ করা নয়, বরং এমন বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করা যা সরাসরি মানুষের উপকারে আসবে।’

আরও পড়ুন
আহমেদ আয়েদুর রহমান

বর্তমানে আহমেদ আয়েদুর রহমানের এই গবেষণা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ থেকে পাওয়া একটি বিশেষ গবেষণা অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গবেষণার জন্য এই অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি আমেরিকান নিউরোগ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড মোটিলিটি সোসাইটি থেকে ডিসকভারি গ্রান্ট পেয়েছেন, যা অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ নিয়ে তাঁর গবেষণায় সাহায্য করছে। পাশাপাশি তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মর্যাদাপূর্ণ এলিনর অ্যান্ড মাইলস শোর ফেলোশিপ লাভ করেছেন। এই সম্মাননাটি কেবল অত্যন্ত দক্ষ ও সম্ভাবনাময় গবেষকদেরই দেওয়া হয়।

সূত্র: প্রথম আলো

আরও পড়ুন