আলু কতটা পুষ্টিকর
বাজারে কত রকমের আলুই তো পাওয়া যায়! আমরা নিয়মিত আলু খাই। বহু খাবারে এমনিতেই সহকারী উপাদান হিসেবে আলু ঢুকে পড়ে। মুরগির মাংসের রান্নায় যেমন আলু চলে, আবার শুধু আলুভর্তা ও ডালও আমাদের রসনায় বেশ জনপ্রিয়। অনেকেই কাচ্চি বিরিয়ানি খেতে গেলে মাংসের চেয়ে আলু বেশি খোঁজেন! পুষ্টির দিক দিয়ে অবশ্য সাধারণ আলুর চেয়ে মিষ্টি আলু কিছুটা এগিয়ে। কিন্তু আমাদের চেনা সাধারণ আলুগুলো কি পুষ্টিকর নয়? বাজারে পাওয়া ডায়মন্ড বা গোল্ডেন জাতের আলুগুলোতে কি কার্বোহাইড্রেট ছাড়া আর কিছুই নেই?
পুষ্টিবিদদের মতে, সাধারণ আলুও আসলে পুষ্টিগুণে মোটেও পিছিয়ে নেই। সঠিকভাবে রান্না করা হলে আলু হতে পারে পুষ্টির দারুণ উৎস। কারণ, আলু শরীরকে শক্তি জোগায়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং নানা শারীরিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
আলু পুষ্টিকর নয়, এমনটা মনে করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, বেশির ভাগ জাংক ফুডেই আলু থাকে। যেমন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা পটেটো চিপস আলুর খুব পরিচিত ও মুখরোচক দুটি রূপ। কিন্তু সমস্যা আসলে আলুতে নয়; আলুকে কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়া হচ্ছে, সেটাই আসল কথা। একটি মাঝারি আকারের খোসা ছাড়ানো আলুতে প্রায় ৩৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে। কার্বোহাইড্রেটের নাম শুনলেই অনেকে আজকাল দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, মনে করেন এটি বুঝি হু হু করে শরীরের ওজন বাড়িয়ে দেবে!
পুষ্টিবিদদের মতে, সাধারণ আলুও আসলে পুষ্টিগুণে মোটেও পিছিয়ে নেই। সঠিকভাবে রান্না করা হলে আলু হতে পারে পুষ্টির দারুণ উৎস। কারণ, আলু শরীরকে শক্তি জোগায়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।
কিন্তু আলুর শর্করা হলো জটিল শর্করা বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট। এগুলো শরীরে ধীরে ধীরে ভাঙে এবং হজম হতে সময় নেয়। ফলে এটি খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে না। আলু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে শক্তি জোগায়। তাই আলু খেলে পেট ভরা অনুভূতিও থাকে অনেকক্ষণ।
তবে সব ধরনের আলু থেকে একই রকম উপকার পাওয়া যায় না। কিছু আলুর গ্লাইসেমিক সূচক অনেক বেশি। গ্লাইসেমিক সূচক হলো ০ থেকে ১০০ স্কেলে মাপা এমন একটি পরিমাপক, যা নির্দেশ করে কোনো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়ার পর কত দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। লাল খোসাযুক্ত আলুর গ্লাইসেমিক সূচক তুলনামূলক কম থাকে, অন্যদিকে ডায়মন্ড জাতের আলুর গ্লাইসেমিক সূচক তুলনামূলক বেশি। আবার সেদ্ধ করা আলুর গ্লাইসেমিক সূচক ভাজা বা অতিরিক্ত মাখন মেশানো ম্যাশড আলুর চেয়ে বেশ কম হয়। তাই আলু খাওয়ার সময় তার সঙ্গে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং আঁশযুক্ত সবজি পাতে রাখলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
আমরা সাধারণত ভিটামিন সি-এর কথা বললেই কমলালেবুর কথা ভাবি। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, একটি মাঝারি আকারের আলু প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি-এর প্রায় ২৫ শতাংশই সরবরাহ করতে পারে! ভিটামিন সি আমাদের টিস্যু গঠন ও মেরামতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
গ্লাইসেমিক সূচক হলো ০ থেকে ১০০ স্কেলে মাপা এমন একটি পরিমাপক, যা নির্দেশ করে কোনো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়ার পর কত দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
আলুতে আরও রয়েছে ফেনলিক যৌগ। ফেনলিক যৌগ হলো একধরনের পলিফেনল, যা শরীরে প্রদাহ কমায়, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ঠিক রাখে এবং শরীরের কোষকে যেকোনো ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া আলুতে মাঝারি মাত্রায় ভিটামিন বি-৬ থাকে, যা হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় দারুণ কাজে লাগে।
পটাশিয়াম এমন এক খনিজ পদার্থ, যা স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কাজের জন্য খুব জরুরি এবং এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ অনেকেই দৈনন্দিন খাদ্যে পর্যাপ্ত পটাশিয়াম পান না। একটি মাঝারি আকারের আলুতে প্রায় ৯০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে, যেখানে সমপরিমাণ কলায় থাকে প্রায় ৬৫০ মিলিগ্রাম। মানে কলার চেয়ে আলু আপনাকে বেশি পটাশিয়াম দিতে পারে! এককথায়, প্রতিদিনের পটাশিয়াম চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশই পূরণ হতে পারে একটি আলু থেকে।
আলুর এই পুষ্টিগুণ পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইলে রান্নার ধরন নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ওভেনে বেক করা, হালকা রোস্ট করা বা সেদ্ধ করা আলুতে প্রায় কোনো চর্বি থাকে না। কিন্তু এর সঙ্গে যদি অতিরিক্ত মাখন, টক দই বা চিজ ঢেলে দেওয়া হয় কিংবা এটি ডুবো তেলে ভাজা হয়, তাহলে এর পুষ্টির ধরন দ্রুতই বদলে গিয়ে এটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে।
একটি মাঝারি আকারের আলুতে প্রায় ৯০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে, যেখানে সমপরিমাণ কলায় থাকে প্রায় ৬৫০ মিলিগ্রাম। মানে কলার চেয়ে আলু আপনাকে বেশি পটাশিয়াম দিতে পারে!
তাই পুষ্টিবিদেরা পরামর্শ দেন, সামান্য তেল ছিটিয়ে, সঙ্গে মসলা দিয়ে কিংবা একটু ঝাল মিশিয়ে আলু খাওয়া যেতে পারে। এতে আলুর আসল স্বাদ ঠিক থাকে এবং আমাদের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। আমাদের দেশি সাধারণ পদ্ধতিতে আলুভর্তা করে খেলেও পুষ্টিবিদদের এই স্বাস্থ্যকর পরামর্শটি মেনে চলা সম্ভব।
অন্যদিকে, পালিশ করা সাদা চালের ভাতের চেয়ে আলু বেশি পুষ্টিকর। প্রক্রিয়াজাত করা সাদা শর্করাযুক্ত ভাতে আলুর চেয়ে কম পুষ্টি থাকে। তাই আমরা নিয়মিত যে পালিশ করা সাদা চালের ভাত খাই, তার একটি চমৎকার ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে আলু। তাই আলু খাব কি খাব না, সেটা মূল কথা নয়; আলু কীভাবে খাব, সেটাই হলো আসল প্রশ্ন।
ভাত যদি শুধুই কার্বোহাইড্রেট হয়, তবে সঠিকভাবে রান্না করা আলু হতে পারে একটি পুষ্টিযুক্ত কার্বোহাইড্রেট। কারণ, আলু থেকে আমরা একই সঙ্গে পেতে পারি শক্তি, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। আর দামে যেহেতু সস্তা, তাই আলুকে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সহজলভ্য এক সুপারফুড বলতেই পারি!