ছুরি মাছ কি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে
মাছ বাজারে ছুরি মাছ কিনতে গিয়ে একবার বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই মাছের গায়ে এত চকচকে রুপালি রং কেন?’ ঠিকঠাক কোনো উত্তর পাইনি। তবে নামটা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল—ছুরি! ধারালো, চ্যাপটা ও লম্বা। পরে যখন জানলাম, দক্ষিণ আমেরিকার নদীতে এমন এক মাছ আছে, যে কি না বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে, তখন প্রশ্নটি নিজে থেকেই মাথায় এসেছিল। আমাদের দেশের ছুরি মাছও কি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে?
উত্তরটি খুব সোজা—না। ছুরি মাছ বাংলাদেশের উপকূলে পাওয়া যায় এমন একটি সামুদ্রিক মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম লেপ্টুরাক্যান্থাস স্যাভালা (Lepturacanthus savala)। এটি ট্রাইচিউরিডি পরিবারের সদস্য। ইংরেজিতে একে হেয়ারটেইল বা রিবনফিশ বলা হয়। মাছটির শরীরের গঠন থেকেই এমন নাম এসেছে। দেখতে ছুরির ফলার মতো চ্যাপটা, ধারালো ও লম্বা ফিতার মতো। এর শরীরে কোনো বৈদ্যুতিক অঙ্গ নেই, কোনো ইলেকট্রোসাইটও নেই। বিদ্যুৎ তৈরির কোনো জৈবিক যন্ত্রপাতিই নেই এই মাছের শরীরে। কিন্তু এই প্রশ্নটা ধরে এগোলে আলাদা এক জগতের দরজা খুলে যায়। এই জগতে সত্যিই কিছু মাছ নিজের শরীরকেই আস্ত ব্যাটারি বানিয়ে ফেলেছে!
দক্ষিণ আমেরিকার নদীতে সাঁতরে বেড়ানো ইলেকট্রিক ইল সেই জগতের সবচেয়ে চেনা মুখ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ইলেকট্রোফোরাস ইলেকট্রিকাস (Electrophorus electricus)। মজার ব্যাপার হলো, এই ইলেকট্রিক ইল আসলে কোনো ইল বা বাইনজাতীয় মাছ নয়। জীববিজ্ঞানীদের ভাষায় এটি একধরনের নাইফফিশ বা ছুরি মাছ। এটি জিমনোটিফর্মেস বর্গের সদস্য। শরীরের গঠনের দিক থেকে আমাদের দেশীয় ছুরি মাছের সঙ্গে এর দূরসম্পর্কের একটি মিল আছে বটে—দুটোই বেশ লম্বা ও সরু। কিন্তু এদের ভেতরের বেশিরভাগ জিনিসই আলাদা।
ইলেকট্রোফোরাস ভোল্টাই প্রজাতিটি সবচেয়ে শক্তিশালী। এটি প্রায় ৮৬০ ভোল্ট পর্যন্ত বৈদ্যুতিক শক দিতে পারে, যা আমাদের বাসাবাড়ির সাধারণ বৈদ্যুতিক প্লাগের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি শক্তিশালী!
এদের আসল গল্পটা শুরু হয় পেশিকোষের অদ্ভুত এক রূপান্তরের মাধ্যমে। ইলের শরীরের প্রায় ৮০ ভাগ জায়গাজুড়ে তিনটি বৈদ্যুতিক অঙ্গ থাকে। এগুলো হলো মেইন অর্গান, হান্টারস অর্গান ও স্যাকস অর্গান। এগুলো মূলত বদলে যাওয়া পেশিকোষ, বিজ্ঞানের ভাষায় যাদের নাম ইলেকট্রোসাইট। একটি কোষ একা তেমন কিছু করতে পারে না। এটি মাত্র ০.১ থেকে ১.৫ ভোল্টের মতো সামান্য শক্তি উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু এদের শরীরে হাজার হাজার কোষ সারি সারি স্তম্ভের মতো সাজানো থাকে। স্নায়ুতন্ত্র থেকে নির্দেশ এলেই সোডিয়াম ও পটাশিয়াম আয়নের চলাচলের কারণে কোষের ভেতরে-বাইরের বৈদ্যুতিক পার্থক্য মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। তখন হাজার হাজার ছোট ব্যাটারি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশাল এক বৈদ্যুতিক শকের সৃষ্টি করে।
ইলেকট্রিক ইল আসলে তিনটি আলাদা প্রজাতির হয়ে থাকে—ইলেকট্রোফোরাস ইলেকট্রিকাস, ইলেকট্রোফোরাস ভোল্টাই এবং ইলেকট্রোফোরাস ভ্যারি। এর মধ্যে ইলেকট্রোফোরাস ভোল্টাই প্রজাতিটি সবচেয়ে শক্তিশালী। এটি প্রায় ৮৬০ ভোল্ট পর্যন্ত বৈদ্যুতিক শক দিতে পারে, যা আমাদের বাসাবাড়ির সাধারণ বৈদ্যুতিক প্লাগের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি শক্তিশালী!
নিজের শরীরে এত বেশি বিদ্যুৎ বইয়ে দিয়েও ইল নিজে কীভাবে অক্ষত থাকে? কারণ এর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো মাথার কাছে গুচ্ছাকারে থাকে। আর বৈদ্যুতিক অঙ্গগুলোর বিন্যাস এমন যে শকের বড় অংশ শরীরের বাইরে পানির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে হৃদ্যন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে তুলনামূলক কম বৈদ্যুতিক পার্থক্য তৈরি হয়।
একটি কোষ একা তেমন কিছু করতে পারে না। এটি মাত্র ০.১ থেকে ১.৫ ভোল্টের মতো সামান্য শক্তি উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু ইলের শরীরে হাজার হাজার কোষ সারি সারি স্তম্ভের মতো সাজানো থাকে।
শক্তিশালী বৈদ্যুতিক শক দেওয়া মাছেদের পাশাপাশি আরও একটি জগৎ রয়েছে, যা বেশ নিঃশব্দ। এরা হলো দুর্বল বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী মাছ। এদের লেজের কাছে থাকা একটি ছোট অঙ্গ থেকে ক্রমাগত মিলিভোল্ট মাপের দুর্বল তরঙ্গ বের হয়। ফলে চারপাশে অদৃশ্য এক বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়। রাতের অন্ধকার পানিতে চোখ যখন অচল হয়ে পড়ে, তখন এই ক্ষেত্রই তাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হয়ে ওঠে। কাছাকাছি কোনো পাথর, শিকার বা শত্রু এলে সেই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে সামান্য বিকৃতি ঘটে। তখন ত্বকের হাজারো বৈদ্যুতিক-সংবেদী কোষ সেই বিকৃতি ধরে ফেলতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ইলেকট্রোলোকেশন।
একই তরঙ্গ দিয়ে এরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারে। প্রতিটি প্রজাতির, এমনকি প্রতিটি মাছেরও নিজস্ব বৈদ্যুতিক স্বাক্ষর থাকে। এদের তরঙ্গের কম্পাঙ্ক, ছন্দ ও বিরতির ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়। এর সাহায্যে প্রজাতি চেনা যায়, লিঙ্গ বোঝা যায়, এমনকি দলের মধ্যে কার অবস্থান কোথায় ধরা পড়ে তা-ও। দুটো মাছের তরঙ্গ কাছাকাছি কম্পাঙ্কে চলে এলে সংকেত গুলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মাছগুলো তখন নিজেদের কম্পাঙ্ক বদলে নেয়। ভিড়ের মধ্যে দুজন মানুষ একসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গলা মিলে গেলে যেমন একজন হঠাৎ স্বর বদলে ফেলে, বিষয়টি ঠিক তেমন।
আঠারো শতকের শেষ ভাগে আলেসান্দ্রো ভোল্টা যখন গ্যালভানির ব্যাঙের পায়ের পরীক্ষা নিয়ে তর্কে জড়ালেন, তখন তাঁর মাথায় ঘুরছিল ইলেকট্রিক ইলের শরীরের গঠন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী মাছেদের এই জগৎ মানুষের কাছে নতুন নয়; শুধু বোঝার ভাষাটাই নতুন। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে নীল নদের পাড়ে মিসরীয়রা ইলেকট্রিক ক্যাটফিশ চিনত। সমাধিচিত্রে তারা এই মাছের ছবিও এঁকে গেছে। ব্যথা কমাতে তারা এর বৈদ্যুতিক শক ব্যবহার করত। যতক্ষণ না হাত-পায়ে অসাড়তা নামত, ততক্ষণ তারা মাছটিকে চেপে ধরে রাখত। প্রাচীন গ্রিসেও একই ধরনের গল্প শোনা যায়, তবে তা ভিন্ন মাছ নিয়ে। বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস টর্পেডো মাছের কথা লিখে গেছেন, যার স্পর্শে হঠাৎ করেই অঙ্গ অবশ হয়ে যেত। টর্পেডো শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ টর্পেরে থেকে, যার অর্থ অসাড় হওয়া। রোমান চিকিৎসকেরা বাত ও মাথাব্যথার চিকিৎসায় এই মাছ ব্যবহার করতেন। বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনও এর কার্যকারিতার সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।
তবে এই মাছেদের সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো চিকিৎসশাস্ত্রে নয়, বরং অন্য জায়গায়। আঠারো শতকের শেষ ভাগে আলেসান্দ্রো ভোল্টা যখন গ্যালভানির ব্যাঙের পায়ের পরীক্ষা নিয়ে তর্কে জড়ালেন, তখন তাঁর মাথায় ঘুরছিল ইলেকট্রিক ইলের শরীরের গঠন। ইলের শরীরে হাজারো পাতলা ও চ্যাপটা ইলেকট্রোসাইট কোষ একটার পর একটা সাজানো থাকে এবং মাঝখানে থাকে তরল ভরা ফাঁকা স্থান। এটি দেখতে অনেকটা প্যানকেকের স্তূপের মতো। ইলেকট্রিক ইলের বৈদ্যুতিক অঙ্গের গঠন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ভোল্টা ধাতু ও নোনাজলে ভেজানো কাপড়ের স্তর সাজিয়ে তৈরি করলেন ভোল্টাইক পাইল। এভাবে তৈরি হলো পৃথিবীর প্রথম ব্যাটারি, যা একটানা বিদ্যুৎপ্রবাহ দিতে পারত!