লইট্যা মাছ কেন মাথা উঁচু করে সাঁতার কাটে

লইট্যা মাছটি লিজার্ডফিশ গোত্রেরছবি: রাশি অরোরা ফর হোমগ্রোন

বাজারে লইট্যা মাছ চিনতে কারও ভুল হয় না। নরম, প্রায় জেলির মতো শরীর, চোখ দুটো অদ্ভুত রকম ছোট ও মুখটা যেন শরীরের মাপে মানায়ই না, এত বড়! রান্নাঘরে এই মাছের কদর অনেক, সস্তা বলে হোক বা স্বাদের জন্যই হোক। কিন্তু সমুদ্রের নিচে গেলে এই একই মাছের দেখা মেলে একেবারে অন্য চরিত্রে। সেখানে সে আস্ত এক শিকারি, আর শিকার ধরার ভঙ্গিটা এমন যে দেখলে অবাকই লাগে। শরীর প্রায় খাড়া, মাথা ওপরের দিকে, যেন পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে কেউ!

এই দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো অভ্যাসগত ব্যাপার নয়। বেঁচে থাকার জন্যই তাকে এভাবে থাকতে হয়। লইট্যার বৈজ্ঞানিক নাম হার্পাডন নেহেরিয়াস (Harpadon nehereus)। তবে এটি ইংরেজিতে বম্বে ডাক নামেই বেশি পরিচিত। মাছটি লিজার্ডফিশ গোত্রের, অলোপিফর্মস বর্গের সিনোডনটিডি পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের মাছগুলোর প্রায় সবই শিকারি। এদের শরীরের গড়নটাও সেরকমই।

লইট্যা মাছের চোখ খুব ছোট, চর্বির আবরণে ঢাকা; নাকটাও বেশ খাটো
ছবি: আইন্যাচারালিস্ট

চোখের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। লইট্যার চোখ এত ছোট যে প্রথম দেখায় মনে হয়, চোখ নেই বললেই চলে। তার ওপর থাকে পাতলা একধরনের চর্বি-আবরণ। চোখ খুব ছোট, চর্বির আবরণে ঢাকা; নাকটাও বেশ খাটো। এমন চোখ দিয়ে দূরের কিছু স্পষ্ট দেখা মুশকিল, অবশ্য দেখার দরকারও নেই আসলে। গভীর, ঘোলাটে পানিতে তার কাজ একটাই; ওপর থেকে আসা ক্ষীণ আলোর বিপরীতে কোনো ছায়া নড়ছে কি না, সেটা ধরা। মাথা উঁচু করে থাকলে এই কাজটা সহজ হয়ে যায়। ওপরের আলোর পটভূমিতে চিংড়ি বা ছোট মাছের সিল্যুয়েট এমনিতেই ফুটে ওঠে, অনেকটা মেঘলা আকাশে উড়ন্ত পাখির ছায়া চেনার মতো।

আরও পড়ুন
লইট্যার চোখ এত ছোট যে প্রথম দেখায় মনে হয়, চোখ নেই বললেই চলে। তার ওপর থাকে পাতলা একধরনের চর্বি-আবরণ। চোখ খুব ছোট, চর্বির আবরণে ঢাকা; নাকটাও বেশ খাটো।

মুখটাও গল্পের বড় একটি অংশ। শরীরের তুলনায় অস্বাভাবিক চওড়া মুখ, ভেতরে আছে সরু, পেছন দিকে বাঁকানো ও ভাঁজযোগ্য দাঁতের সারি। দাঁতগুলো আকারে অসমান এবং নিচের চোয়াল ওপরের চোয়ালের চেয়ে বেশ লম্বা। এমন মুখে একবার কিছু ঢুকলে বেরোনোর উপায় থাকে না। এমনকি নামটার মধ্যেও এই স্বভাবের ছাপ আছে। গ্রিক শব্দ হার্পাডন থেকে এর বৈজ্ঞানিক নামের প্রথম অংশের উৎপত্তি, যার অর্থ ছোঁ মেরে ধরা বা শিকারি দাঁত।

বিজ্ঞানে এ ধরনের শিকারকৌশলের একটি নাম আছে, সিট-অ্যান্ড-ওয়েট। মানে ওঁত পেতে থাকা। বাঘ যেভাবে ঝোপের আড়ালে চুপচাপ বসে থেকে হরিণের অপেক্ষা করে, লইট্যার কৌশলটাও অনেকটা সে রকম। খুব একটা ছোটাছুটি না করে এরা পানির একটি নির্দিষ্ট স্তরে দাঁড়িয়ে থাকে, ওপরের দিকে চোখ রাখে আর মাথার ওপর দিয়ে কিছু গেলেই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

লইট্যা মাছের মুখ শরীরের তুলনায় অস্বাভাবিক চওড়া
ছবি: আইন্যাচারালিস্ট

শক্তি বাঁচানোর একটি হিসাবও এর পেছনে কাজ করে বলে ধারণা করা হয়। সারাক্ষণ সাঁতরে শিকার খুঁজলে যে শক্তি খরচ হতো, দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলে তা লাগে না।

এই দাঁড়িয়ে থাকাটা সম্ভব হয় এদের শরীরের গড়নের কারণেই। লইট্যার শরীর প্রায় স্বচ্ছ, নরম, হাড়ও খুব হালকা। ভারী শরীর নিয়ে এতক্ষণ খাড়া হয়ে ভেসে থাকা কষ্টকর হতো; হালকা গড়ন বলেই এটি তার জন্য সহজ আর শিকার ধরার মুহূর্তে দ্রুত বাঁক নেওয়াও সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন
দিনের বেলা লইট্যা সমুদ্রতলের কাছাকাছি বালি-কাদার মধ্যে থাকে। বছরের বেশির ভাগ সময় এরা গভীর সমুদ্রের তলদেশেই কাটায়, তবে বর্ষায় নদীর মোহনায় ঝাঁক বেঁধে খাবারের খোঁজে উঠে আসে।

বয়সের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস বদলানোরও একটি যোগসূত্র আছে এই আচরণে। ছোট অবস্থায় লইট্যা মূলত প্ল্যাঙ্কটন ও মাছের লার্ভা খায়, আকারে বড় হতে হতে ধীরে ধীরে মাছ শিকারের দিকে ঝোঁকে। প্ল্যাঙ্কটন যেহেতু পানির ওপরের স্তরের কাছেই বেশি জমে, তাই ছোট অবস্থায় ঊর্ধ্বমুখী থাকাটা এদের স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। বড় হয়ে শিকার বদলালেও এই ভঙ্গিটা থেকে যায়, কারণ এটি তখনো দারুণ কাজে দেয়।

জেলেদের মুখে প্রায়শই একটি কথা শোনা যায়, রাতে জালে ধরা পড়া লইট্যার গা থেকে নাকি হালকা আলোর মতো একধরনের ছটা বেরোয়! বিজ্ঞানীরা জানান, এই মাছটি বেশ ফসফরেসেন্ট বা দ্যুতিময়। এটাও তার গভীর পানির জীবনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

দিনের বেলা লইট্যা সাধারণত সমুদ্রতলের কাছাকাছি বালি-কাদার মধ্যে থাকে। বছরের বেশির ভাগ সময় এরা গভীর সমুদ্রের তলদেশেই কাটায়, তবে বর্ষায় নদীর মোহনায় ঝাঁক বেঁধে খাবারের খোঁজে উঠে আসে। এই সময়টাতেই জেলেদের জালে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে এরা আর বাজারেও তখন দামটা একটু কমতির দিকে থাকে।

আরও পড়ুন
প্ল্যাঙ্কটন যেহেতু পানির ওপরের স্তরের কাছেই বেশি জমে, তাই ছোট অবস্থায় ঊর্ধ্বমুখী থাকাটা এদের স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। বড় হয়ে শিকার বদলালেও এই ভঙ্গিটা থেকে যায়।

সব মিলিয়ে দেখলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এ রকম—ছোট চোখ দিয়ে দূরে দেখতে না পারার ঘাটতি আছে লইট্যার, কিন্তু সেই ঘাটতিটাকেই সে সুবিধায় পরিণত করে নিয়েছে। হালকা শরীর, ধারালো মুখ ও ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস—এই তিনটি মিলিয়েই তৈরি হয়েছে শিকারের সেই পরিচিত দৃশ্য, যা হয়তো কোনো জেলে বা ডুবুরি ছাড়া কেউ কখনো চোখেই দেখেননি!

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: মেরিন বায়োডাইভারসিটি, ফিশ বেজ

আরও পড়ুন