আপনার শরীরেই বাস করছে অন্য কারো কোষ
জানেন কি, আপনার শরীরে অন্য কারও কোষ বসবাস করছে? মায়ের গর্ভ থেকে সন্তানের দেহে কিংবা সন্তান থেকে মায়ের দেহে কোষের এই অদ্ভুত আদান-প্রদান ঘটে প্রতিনিয়ত। এই অতিথি কোষগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, আবার কখনো ডেকে আনে অটোইমিউন রোগ। মানুষের আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের বিস্তারিত…
গ্রিক পুরাণের কিমেরার গল্প আমরা অনেকেই জানি। কিমেরা ছিল এক অদ্ভুত ও অশুভ সত্তা। তার মাথাটা ছিল সিংহের, শরীরটা ছাগলের আর লেজটা সাপের। বিজ্ঞানবিষয়ক ফরাসি সাংবাদিক লিজ বার্নেউড তাঁর হিডেন গেস্টস বইয়ে লিখেছেন, মানুষও আসলে কিমেরার মতো। শুনতে অবাক লাগছে? আধুনিক জীববিজ্ঞানও কিন্তু এমনটাই বলছে।
মায়েরা নিজেদের শরীরে এমন কিছু কোষ বহন করেন, যেগুলো আসলে তাঁদের নয়। কোষগুলো আসে তাঁদের গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের কাছ থেকে। গর্ভাবস্থায় প্ল্যাসেন্টা বা অমরার মধ্য দিয়ে এই কোষগুলো সন্তানের দেহ থেকে মায়ের দেহে প্রবাহিত হয়।
একইভাবে সন্তানরাও তাদের শরীরে এমন কিছু কোষ বহন করে, যেগুলো তাদের নিজেদের নয়। সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের কিছু কোষ তাদের শরীরে ঢুকে পড়ে। শুধু মায়ের কাছ থেকেই নয়, সন্তানের শরীরে ঢুকে পড়া এই কোষগুলো তাদের নানি, বড় ভাইবোন কিংবা যমজ ভাইবোনদের কাছ থেকেও আসতে পারে।
এই কোষগুলোকে বলা হয় মাইক্রোকিমেরিক সেল। আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যতগুলো অঙ্গ নিয়ে গবেষণা করেছেন, তার সব কটিতেই এই কোষগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। মস্তিষ্ক, ফুসফুস, ত্বক, যকৃৎ সবখানেই। তবে এই কোষগুলো সংখ্যায় খুবই কম। আমাদের প্রতি ১০ হাজার থেকে ১০ লাখ কোষের মধ্যে মাত্র একটি মাইক্রোকিমেরিক কোষ পাওয়া যায়।
মায়েরা নিজেদের শরীরে কোষগুলো আসে তাঁদের গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের কাছ থেকে। গর্ভাবস্থায় প্ল্যাসেন্টা বা অমরার মধ্য দিয়ে এই কোষগুলো সন্তানের দেহ থেকে মায়ের দেহে প্রবাহিত হয়।
এক দৈব আবিষ্কার
বিজ্ঞানীরা পরিকল্পনা করে মাইক্রোকিমেরিক কোষ আবিষ্কার করেননি। ১৮০০ সালের শেষ দিকে জর্জ শমরল নামে এক চিকিৎসক প্রসবকালীন জটিলতায় মারা যাওয়া নারীদের ফুসফুসে অস্বাভাবিক একধরনের কোষ দেখতে পান। কোষগুলো অমরার কোষের মতো ছিল। তখনই বিজ্ঞানীরা প্রথম ধারণা করেন, ভ্রূণের কোষ মায়ের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
পরে ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানীদের একটি দল সন্তানসম্ভবা নারীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় কিছু নারীর শরীরে Y ক্রোমোজোমযুক্ত শ্বেত রক্তকণিকা দেখা যায়। উল্লেখ্য, Y ক্রোমোজোম হচ্ছে পুরুষদের সেক্স ক্রোমোজোম। ওই সব নারী পরে ছেলেসন্তান জন্ম দিয়েছেন।
দুই যুগ ধরে ভাবা হতো, এই কোষগুলো গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে মায়ের শরীরে থাকে। ১৯৯৩ সালে জিনবিজ্ঞানী ডায়ানা বিয়াঙ্কি প্রমাণ করেন, এই কোষগুলো সন্তান জন্মের ১ থেকে ২৭ বছর পরও মায়ের শরীরে থেকে যায়।
এই গবেষণাটি একটি বড় ধারণাগত পরিবর্তন আনে। আগে মনে করা হতো, শুধু মা-বাবার কাছ থেকে সন্তান জিন পায়। কিন্তু এই গবেষণা থেকে দেখা গেল, সন্তানের কোষ মায়ের শরীরে থেকে যাচ্ছে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পেছনের দিকে ভ্রমণ করছে।
বিয়াঙ্কি এবং অন্যদের গবেষণা থেকে আরও দেখা যায়, এই কোষগুলোর পুনরুৎপাদনক্ষমতা অনেক বেশি। এই কোষগুলো সহজেই রক্তনালি কিংবা ত্বকের কোষে পরিণত হয়। মায়ের দেহের ক্ষত পূরণে সহায়তা করে।
তাহলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রচলিত ধারণা কি ভুল? রোগ প্রতিরোধবিদ্যার একটি মূল নীতি হলো, আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দেহের এবং বাইরের কোষ আলাদা করে চেনে। এই নিয়ম অনুযায়ী, অন্যের কোষ শরীরে থাকলে তা ধ্বংস হওয়ার কথা। কিন্তু মাইক্রোকিমেরিক কোষ বছরের পর বছর টিকে থাকে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। এই বাস্তবতা ইমিউন সিস্টেমের প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আগে মনে করা হতো, শুধু মা-বাবার কাছ থেকে সন্তান জিন পায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, সন্তানের কোষ মায়ের শরীরে থেকে যাচ্ছে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পেছনের দিকে ভ্রমণ করছে।
অটোইমিউন রোগের সঙ্গে সম্পর্ক
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে শরীরের সুস্থ কোষ এবং টিস্যু আক্রমণ করে যেসব রোগ সৃষ্টি করে, সেগুলোকে বলা হয় অটোইমিউন ডিজিজ। যেমন স্ক্লেরোডার্মা, লুপাস, ডায়াবেটিস ইত্যাদি।
বাতজ্বর বিশেষজ্ঞ লি নেলসন অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত নারীদের নিয়ে একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীর বিভিন্ন অটোইমিউন রোগ আছে, তাঁদের শরীরে মাইক্রোকিমেরিক কোষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এই রোগগুলোর লক্ষণ অনেকটা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর হওয়া গ্রাফট ভার্সাস হোস্ট ডিজিজের মতো। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এই অতিথি কোষগুলো কখনো কখনো ইমিউন সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
অঙ্গ প্রতিস্থাপনে নতুন সম্ভাবনা
এক কিশোরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর বিজ্ঞানীরা খেয়াল করেন, মায়ের দেওয়া কিডনি তার শরীর কোনো ওষুধ ছাড়াই গ্রহণ করছে। পরে জানা গেছে, মায়ের কোষ আগে থেকেই সন্তানের শরীরে ছিল। এ কারণেই কোনো ওষুধ ছাড়াই ছেলের ইমিউন সিস্টেম মায়ের কিডনি গ্রহণ করেছিল। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে সফলভাবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে প্রয়োজনীয় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির পথ দেখাতে পারে।
অল্প কোষ, কিন্তু গভীর প্রভাব
মায়ের কিছু রোগ প্রতিরোধকারী কোষ সন্তানের শরীরে গিয়ে তার ইমিউন সিস্টেমকে আগেভাগেই প্রশিক্ষণ দেয়। ফলে শিশুরা জন্মের পরপরই কিছু সংক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ জীবনের প্রস্তুতি শুরু হয় গর্ভেই।
মাইক্রোকিমেরিক সেলের আবিষ্কার আমাদের আত্মপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যদি আমার কোষ অন্য কারও শরীরে থাকে, আমি কি পুরোপুরি আলাদা মানুষ? প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোষ টিকে থাকলে, সেটি কি একধরনের অমরত্ব?