জ্বর বা পানিশূন্যতায় ইলেকট্রোলাইট পান করা কি জরুরি

জ্বর হলে বা পানিশূন্যতায় আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আবার অনেক ঘেমে গেলে আমাদের শরীর থেকে পানির সঙ্গে কিছু ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। আর সামনে এগোনোর আগে প্রথমেই জানা প্রয়োজন, ইলেকট্রোলাইট জিনিসটা কী? পানিতে দ্রবীভূত (পড়ুন, গোলানো) কিছু চার্জিত বা আয়নিত যৌগের সমাহার। আমরা বেশি ঘেমে গেলে কী হয়? ঘামের মধ্যে থাকে পানি আর লবণ। সঙ্গে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সামান্য পরিমাণে গ্লুকোজ, ইথানল, হরমোন এবং শরীরের অন্যান্য কিছু যৌগ। শরীরে থাকা পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামের মতো এই খনিজগুলোই সেই ইলেকট্রোলাইট। এগুলো আমাদের কোষ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এক কোষ আরেক কোষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই খনিজগুলোর সাহায্যে।

শরীর থেকে এসব ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে গেলে, অনেক ঘেমে গেলে, জ্বর বা পানিশূন্যতায় অনেকেই আমাদের ইলেকট্রোলাইট খাওয়ার (পড়ুন, পানের) পরামর্শ দেন। প্রশ্নটা ওটাই—এমন পরিস্থিতিতে ইলেকট্রোলাইট পান করা বা খাওয়া কি জরুরি? খেলে কী হবে? না খেলেই-বা কী হবে?

ইলেকট্রোলাইট কেন খেতে বলা হয়, আসলেই কি জরুরি

ইলেকট্রোলাইট খেতে হবে, এই ধারণাটা সম্ভবত বিজ্ঞাপন থেকে এত ছড়িয়েছে। অনেকের মধ্যে এই ধারণাই জন্মে গেছে যে দুর্বল লাগছে, তো ইলেকট্রোলাইট খাও। প্রচুর ঘেমে গেছ, ইলেকট্রোলাইট খেতে হবে। জ্বর হলে তো কথাই নেই! কেউ না কেউ ইলেকট্রোলাইট খাওয়ার পরামর্শ দেবেনই। এই যে অনেকে ইলেকট্রোলাইটকে জ্বর বা দুর্বলতার সমাধান মনে করছেন, এই সূত্র ধরে একটু খুঁজলেই দেখা যাবে, বাজারে ইলেকট্রোলাইট ড্রিংকের ছড়াছড়ি। টিভিতে বা পত্রিকায় ব্যাপক বিজ্ঞাপন দেখে মনে হতে পারে, এটি যেন এক ম্যাজিক পানীয়। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রোলাইট পানীয়ের বাজার ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার!

বিজ্ঞাপনের এসব প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়ার আগে সত্যটা জানা প্রয়োজন। আপনার যদি দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর ঘাম ঝরে, অথবা অসুস্থতার কারণে শরীর থেকে দ্রুত পানি বেরিয়ে যায়, তবু আপনার ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক আলাদা করে খাওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। বেশির ভাগ মানুষের জন্য কেবল স্বাভাবিক পানি পান করার পাশাপাশি ফল এবং সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়াই যথেষ্ট। কারণ, এই খনিজগুলো শরীরের খুব অল্প পরিমাণে প্রয়োজন হয়।

বিজ্ঞাপনের এসব প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়ার আগে সত্যটা জানা প্রয়োজন। আপনার যদি দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর ঘাম ঝরে, অথবা অসুস্থতার কারণে শরীর থেকে দ্রুত পানি বেরিয়ে যায়, তবু আপনার ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক আলাদা করে খাওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই
ছবি : এআই আর্ট
আরও পড়ুন

তাহলে পানিশূন্যতায় কী করব

শরীর থেকে পানি বেরিয়ে গেলে একবার ভালো খাবার খেলেই হবে। এই খাবারই প্রয়োজনীয় সব ইলেকট্রোলাইটের যোগান দিয়ে দেবে। এ ছাড়া আমাদের শরীর প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে। ইলেকট্রোলাইটের পরিমাণের সঙ্গে শরীর নিজেকে মানিয়ে নেয়। যেমন লবণের কথা ভাবা যাক। শরীরে লবণ নিয়ন্ত্রিত হয় কিডনি দিয়ে। যদি কারো শরীর থেকে প্রচুর লবণ বেরিয়ে যায়, তখন ‘অ্যাল্ডোস্টেরন’ নামে একটি হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ হরমোনের প্রভাবে বেশি পরিমাণ সোডিয়াম কিডনি থেকে রক্তপ্রবাহে ফিরে আসে।

বেশি বেশি বাদাম আর চিপস খেলে শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম চলে আসতে পারে। অতিরিক্ত সোডিয়াম এলেই এ হরমোনের মাত্রা কমে যায়। ফলে সোডিয়ামের রক্তে ফিরে আসাও কমে যাবে। তখন অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। আমাদের হাড়ে জমে থাকা ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামও ইলেকট্রোলাইটের অভাব পূরণ করতে পারে। প্রয়োজনের সময় হাড় থেকে এগুলো বেরিয়ে শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। যদি কারো প্রস্রাবের মাধ্যমে ইলেকট্রোলাইট বের হয়, এর মানে তার শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইলেকট্রোলাইট আছে।

মাত্রাতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইট পান করলে মাথাব্যথা, স্বাভাবিক হৃৎকম্পনে ব্যাঘ্যাত থেকে শুরু করে বমিভাব ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। তাই ইলেকট্রোলাইট পানের আগে লক্ষ রাখা প্রয়োজন, শরীরের আদৌ এই পানীয় প্রয়োজন আছে কি না, কিংবা দেহে কোনো কারণে চরম পানিশূন্যতা তৈরি হয়েছে কি না

রোদে ঘোরাফেরা করলে বা পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। আমাদের শরীর সাময়িকভাবে পানিশূন্য থাকলেও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বেশ ভালোভাবে কাজ করতে পারে। এ সময়ের মধ্যে মানুষ যেন খাবার সংগ্রহ করতে পারে, পানির জন্য যেন আটকে না যায়, তাই প্রাকৃতিকভাবে শরীরে এমন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

কীভাবে বুঝবেন পানিশূন্যতা হয়েছে?

শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ হলো তৃষ্ণা পাওয়া, ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা বা অস্থিরতা অনুভব করা। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় আমাদের অনেকের হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হয়। এর কারণ, পানিশূন্যতা রক্ত ​​সঞ্চালনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। যেকোনো তরলযুক্ত জিনিসই এই পানিশূন্যতা দূর করে। সবচেয়ে ভালো কাজ করে সাধারণ পানি। এ ছাড়াও দুধ, স্যুপ, চা বা তরলযুক্ত খাবার তো আছেই। পানিশূন্যতার জন্য তাই আলাদা ইলেকট্রোলাইট ড্রিংকস পানের প্রয়োজন নেই।

খেলার শুরু থেকেই যদি তাঁর শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরে, এক ঘণ্টা পরে একটা বিরতি নিয়ে তিনি একটি ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক গ্রহণ করতে পারেন
ছবি : এআই আর্ট

কখন ইলেকট্রোলাইট খাব

কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক দরকার হতে পারে। ধরা যাক, কেউ মাঠে নব্বুই মিনিট ধরে একটি ফুটবল ম্যাচ খেলছেন। পাশাপাশি তিনি পর্যাপ্ত খাবারও খাননি। খেলার শুরু থেকেই যদি তাঁর শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরে, এক ঘণ্টা পরে একটা বিরতি নিয়ে তিনি একটি ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক গ্রহণ করতে পারেন। খুব দ্রুত যদি ঘাটতি সামলাতে চান বা দরকার পড়ে, তবে।

আবার অসুস্থতার কারণে যদি কারো চরম পানিশূন্যতা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসা হিসেবে ইলেকট্রোলাইট কাজে লাগতে পারে। যেমন ডায়রিয়াজনিত রোগে স্যালাইন খুব ভালো কাজ করে। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে খাবার স্যালাইন। ইলেকট্রোলাইটও এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন

অতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইট কি ক্ষতিকর

হ্যাঁ, ক্ষতিকর। মাত্রাতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইট পান করলে মাথাব্যথা, স্বাভাবিক হৃৎকম্পনে ব্যাঘ্যাত থেকে শুরু করে বমিভাব ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। তাই ইলেকট্রোলাইট পানের আগে লক্ষ রাখা প্রয়োজন, শরীরের আদৌ এই পানীয় প্রয়োজন আছে কি না, কিংবা দেহে কোনো কারণে চরম পানিশূন্যতা তৈরি হয়েছে কি না।

কেউ যদি মোটামুটি সুষম খাদ্য গ্রহণ করে, তবে তার আলাদা ড্রিংকের দরকার নেই। তবে প্রথম শ্রেণির পেশাদার ক্রীড়াবিদ হলে তাঁর চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা আলাদা হতে পারে।

ইলেকট্রোলাইট ড্রিংকগুলো খেতে বেশ মজাদার। তাই অনেকের খেতে ভালো লাগতে পারে। খেতে মজা লাগলে সেটা খাওয়া যায়, তবে মাত্রাতিরিক্ত নয়। আর পানিশূন্যতার বিকল্প হিসেবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই পানীয় পানের কোনো প্রয়োজন আসলে নেই।

সূত্র: এনপিআর ও নিউইয়র্ক টাইমস

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো