ক্যান্সারের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নতুন অণু, প্যাটেন্ট পেলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী

ড. হেমায়েত উল্লাহছবি: সংগৃহীত

ক্যান্সারের নাম শুনলেই আমাদের মনে যে আতঙ্কটা সবার আগে ভর করে, তা হলো শরীরের অন্য কোথাও ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়বে না তো? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মেটাস্ট্যাসিস। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর একটি বড় কারণ কিন্তু এই মেটাস্ট্যাসিসই। তবে আশার কথা হলো, এই মরণব্যাধির ছড়িয়ে পড়া রুখে দেওয়ার এক দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে এসেছেন একদল গবেষক, যার নেতৃত্বে রয়েছেন একজন বাংলাদেশি গবেষক। তিনি ড. হেমায়েত উল্লাহ।

দীর্ঘদিনের গবেষণার পর ক্যান্সার কোষের বিস্তার রোধে সক্ষম কিছু ক্ষুদ্র অণু উদ্ভাবনের জন্য ড. হেমায়েত উল্লাহ ও তাঁর দল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে একটি প্যাটেন্টের অনুমোদন পেয়েছেন।

হেমায়াত উল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। এই গবেষণায় তাঁর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের লম্বার্ডি কমপ্রিহেনসিভ ক্যান্সার সেন্টারের অনকোলজি বিভাগের গবেষক ড. শিবানেসান দক্ষিণামূর্তি।

আরও পড়ুন
হেমায়াত উল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করছেন।

গবেষণা দলের তথ্য অনুযায়ী, ক্যান্সার কোষের বিস্তার রোধে সক্ষম এই ক্ষুদ্র অণুগুলোর প্যাটেন্টের জন্য ২০১৯ সালে প্রোভিশনাল প্যাটেন্ট আবেদন করা হয়। দীর্ঘ মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার পর ২০২৬ সালে প্যাটেন্টটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। উদ্ভিদের পরিবেশগত চাপ মোকাবিলা এবং ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরির ক্ষমতা থামিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়ে কাজ করতে গিয়েই গবেষকেরা এই পথ খুঁজে পান। তাঁরা খেয়াল করেন, উদ্ভিদ ও মানুষের কোষে থাকা RACK1 নামে একটি প্রোটিনের গঠন প্রায় একই রকম। অথচ এই প্রোটিনটিই আবার ক্যান্সারের কোষগুলোকে শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে সাহায্য করে।

এরপরই গবেষকদের মাথায় এল এক নতুন বুদ্ধি। SD29 এবং SD29-14 নামে কিছু বাধা প্রদানকারী অণু তৈরি করলেন তাঁরা। এগুলো সরাসরি RACK1 প্রোটিনকে টার্গেট করে। পরীক্ষাগারে স্তন ক্যান্সারের কোষগুলোর ওপর প্রয়োগ করে দেখা গেল, এই অণুগুলো ফোকাল অ্যাডেসন কাইনেজ নামে সিগন্যালিং পথকে আটকে দিচ্ছে। ফলে স্তন ক্যান্সারের কোষগুলোর বিস্তার নাটকীয়ভাবে কমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
SD29 এবং SD29-14 নামে কিছু বাধা প্রদানকারী অণু তৈরি করলেন গবেষকেরা। এগুলো সরাসরি RACK1 প্রোটিনকে টার্গেট করে।

বর্তমানে পৃথিবীতে ক্যান্সারের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ওষুধ নেই বললেই চলে। সেই হিসেবে ড. হেমায়েত উল্লাহর এই কৌশল চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে। শুধু স্তন ক্যান্সার নয়, ভবিষ্যতে সব ধরনের ক্যান্সারের বিস্তার রোধে এটি কার্যকর হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বিজ্ঞান সব সময়ই চলে নিখুঁত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। এখনই এই ওষুধ বাজারে মিলছে না। গবেষণাটি বর্তমানে bioRxiv-এ প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ এটি এখনো আনুষ্ঠানিক পিয়ার রিভিউ সম্পন্ন করেনি। তবে প্যাটেন্টটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত হয়েছে। এরপর ল্যাবরেটরি থেকে প্রাণী এবং সবশেষে মানুষের শরীরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হলেই এটিকে চূড়ান্ত ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞানবিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন